নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি ও সংবাদদাতা, বোলপুর: একসময় ধানের ব্যবসা করতেন। কিন্তু জামাইবাবুর ‘সান্নিধ্য’ পেতেই বদলে গেল জীবন। রাতারাতি আঙুল ফুলে রীতিমতো কলাগাছ। অভিযোগ, গত দশ বছরে প্রায় ৪০টি ডাম্পার, একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি, তিনটি দোতলা বাড়ি আর বিস্তীর্ণ জমির মালিক হয়ে গিয়েছেন বীরভূমের পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলের দুই শ্যালক। টুলুর বেআইনি কারবারের কোটি কোটি কালো টাকা কি বেনামে বিনিয়োগ হয়েছে শ্বশুরবাড়ির লোকেদের নামে? এমনই সন্দেহে বুধবার সকাল থেকে পাড়ুইয়ে টুলুর শ্বশুর মহম্মদ নুরুল হকের প্রাসাদোপম বাড়িতে ম্যারাথন তল্লাশি চালাল এসটিএফ ও জেলা পুলিশ।
টুলু-ঘনিষ্ঠ মিনারের বাড়ি থেকে বিপুল নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধারের পর থেকেই তদন্তকারীদের নজরে ছিল মাফিয়ার আত্মীয়-পরিজনরা। এদিন সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ পাড়ুই বাজারে সিউড়ি-বোলপুর রাস্তার ধারেই টুলুর শ্বশুরের বাড়িতে হানা দেয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। বোলপুরের এসডিপিও অর্পিত আর পারাখের নেতৃত্বে চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়। মেটাল ডিটেক্টর, সার্চলাইট, এমনকী ড্রিল মেশিন নিয়ে রীতিমতো খুঁড়ে দেখা হয় বাড়ির প্রতিটি কোণ। ছাদ, বারান্দা, গ্যারেজ, জলের ট্যাঙ্ক, চিলেকোঠার ঘর, বাদ যায়নি কিছুই। সদ্য তৈরি হওয়া একটি শৌচাগারের বালির স্তরের নীচে টুলুর বিপুল সম্পদ লুকানো থাকতে পারে বলে সন্দেহে সেখানেও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করেন তদন্তকারীরা। খোঁড়াখুঁড়িও করা হয়।
শ্বশুরবাড়িতে টানা ছ’ঘণ্টা রুদ্ধশ্বাস তল্লাশির পরও কার্যত খালি হাতেই ফিরতে হয় পুলিশকে। টুলুর শ্বশুর নুরুল হক অবশ্য বলেন, বাড়ির প্রতিটি ঘর, আলমারি থেকে শুরু করে শৌচাগার পর্যন্ত খোঁজা হয়েছে। কিন্তু কিছুই মেলেনি। সার্চ লিস্টে পুলিশ লিখে দিয়েছে, কিছু উদ্ধার হয়নি। এদিন টুলুর শ্বশুরের দাদার ছেলে পেশায় ধান ব্যবসায়ী মহম্মদ নজরুল ইসলামের বাড়িতেও হানা দেয় পুলিশ। প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে তাঁর ধানের গোডাউন ও আলমারি তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়। নজরুল বলেন, টুলু মণ্ডলের সঙ্গে আমার কোনো আর্থিক লেনদেন নেই। সন্দেহের বশে পুলিশ এলেও কিছুই না পেয়ে ফিরে গিয়েছে। অনেকে বলছেন, মিনারের বাড়িতে টাকার খনি উদ্ধারের পর বাকিরা হয়তো সতর্ক হয়ে গিয়েছেন। আর কি কেউ বাড়িতে টাকা রাখার ঝুঁকি নেয়!
এদিন বাড়িতে পুলিশের পা পড়তেই টুলুর শ্বশুর অবশ্য সাফ বলেন, ‘জামাই বা মেয়ের সঙ্গে আমাদের কোনও যোগাযোগ নেই।’ শ্বশুর যতই দূরত্বের কথা বলুন, স্থানীয়দের চোখে ধরা পড়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। পড়শিদের কথায়, টুলুর দুই শ্যালক সামসুল আলম ওরফে মিন্টু এবং নুর আলম ওরফে মিঠু একসময় বাবার ধানের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু গত এক দশকে টুলুর বেআইনি সাম্রাজ্যের উল্কার গতির উত্থানের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছেন তাঁর দুই শ্যালক। স্থানীয় গাড়িচালক শেখ শামিম বলেন, একসময় এদের জন্য আমরা ব্যবসা করতে পারতাম না। ওদের গাড়ি ডিসিআর ছাড়াই পাথর নিয়ে আসত। সেই পাথর বাজারে কম দামে বিক্রি করত। এর ফলে বহু সাধারণ ব্যবসায়ী পথে বসেছিল।
সিউড়ি আদালতে বিচারকের উপস্থিতিতে ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে টুলুর নানা ডেরা থেকে উদ্ধার হওয়া নথিপত্রের স্ক্যানিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। টুলুর সাম্রাজ্যের শিকড় ঠিক কতটা গভীরে তারই চুলচেরা বিশ্লেষণে নেমেছেন তদন্তকারীরা।-নিজস্ব চিত্র