সংবাদদাতা, ঝাড়গ্রাম: স্মার্ট ফোনের যুগেও রেডিওতে মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ শোনার রীতি ধরে রেখেছে ঝাড়গ্রামের গ্রামীণ এলাকার প্রবীণ মানুষজন। সাঁকরাইলের সাতভাণ্ডারি গ্রামের মথুর মাহাতর পরিবার রেডিওতেই মহালয়ার চণ্ডীপাঠ শোনেন। মহালয়ার ভোরে তাঁর ঘরের দাওয়ায় জড়ো হয় প্রতিবেশীরা। রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়ার চণ্ডীপাঠ শুনতে শুনতে সবার সকাল হয়। ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মথুরবাবু তাঁর বহু বছরের পুরনো রেডিওটি যত্ন করে রেখেছেন। একই ভাবে জামবনীর বড়ঘোং গ্রামের বাসিন্দা ৯৮ বছরের বৃদ্ধ সন্তোষ মাহাত ও তাঁর পরিবার রেডিওতে মহালয়া শোনার রীতি ধরে রেখেছেন। বহু বছর আগে ঝাড়গ্রামের গ্রামীণ এলাকায় দুর্গাপুজোর প্রচলন না থাকায় পুজোর বলতে ছিল একমাত্র মহালয়ার দিন ভোরে উঠে রেডিওতে চণ্ডীপাঠ শোনা। প্রায় দেড়শ-দু’শো বছর আগের চলে আসা এই রীতি এখনও বিক্ষিপ্তভাবে ঝাড়গ্রামের কয়েকটি গ্রামে চালু রয়েছে। সে সময় ঝাড়গ্রাম গ্রামীণ এলাকায় দুর্গাপুজো চালু ছিল না বললেই চলে। মহালয়ার ভোরে আকাশবাণী কলকাতা সেন্টারের বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শোনাই ছিল গ্রামাঞ্চলের ‘দুর্গাপুজো’। এই প্রজন্ম স্মার্টফোনে মহালয়ার চণ্ডীপাঠ, মহিষাসুরমর্দিনী দেখলেও প্রবীণ ব্যক্তিরা রেডিওর চণ্ডীপাঠকেই আঁকড়ে রেখেছেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে ঝাড়গ্রাম এলাকায় দুর্গাপুজোর প্রচলন খুব জোর দেড়শ-দু’শো বছরের পুরনো। শহরের আশেপাশের বেশিরভাগ গ্রামগুলি গঠন হয়েছে দেড়শ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে। অনেকেই ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন পুজোকে ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরনো বলে দাবি করলেও তার কোন নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শন বা তথ্য সামনে আসেননি। জানা যায়, ১৯২২ সালে ঝাড়গ্রাম মহকুমা গঠিত হয়। ১৯৫১ সালের জনগণের ঝাড়গ্রাম শহরের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৭ হাজার। সে সময় ঝাড়গ্রাম শহরে একমাত্র পরব বা উৎসব বলতে ছিল ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির ইঁদ ডাল পুজা। ফলে দুর্গাপুজোর উপভোগ বলতে একমাত্র ছিল রেডিওতে মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ। এই নিয়ে ৯৮ বছরের বৃদ্ধ সন্তোষ বাবু বলেন, এখনও আমরা রেডিও চালিয়ে সপরিবারে মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ শুনি। আগে গ্রামের লোকজন চণ্ডীপাঠ শোনার ফাঁকে ওই রেডিওর সামনেই ধনুচিতে ধুপধুনো জ্বালিয়ে অনেকেই প্রণাম করত। রেডিওর চণ্ডীপাঠকেই একমাত্র পুজা বলে মানতো সবাই। পরে দু’-চারটি গ্রামে মাইক আসার পর গ্রামবাসীরা মহালয়ার ভোরে রেডিওর সামনে মাইকের স্পিকার দিয়ে চণ্ডীপাঠ পুরো গ্রামজুড়ে শোনাত। এই নিয়ে মথুরবাবু বলেন, পরিবারের সবাই ও পাড়ার লোকজন আমাদের ঘরে জড়ো হয়ে রেডিওতেই মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ শুনি। আমার রেডিও বহু পুরনো। তার কাঠের কভার উইপোকা নষ্ট করে দিয়েছিল। নিজেরাই কাঠের কভার তৈরি করে রেডিওটি মেরামত করছি।



