নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: হাসপাতালে কয়েদখানা! এমনও হয় নাকি? হ্যাঁ, আইডি হাসপাতালে একটি ওয়ার্ড রয়েছে, যেখানে গেলে এবং যার ইতিহাস জানলে হিম হয়ে যেতে পারে রক্তস্রোত! ওয়ার্ডের একেবারে শেষ মাথায় রয়েছে সেই কয়েদখানা! মোটা লোহার শিক দিয়ে তৈরি ঘর। বেশ কিছুটা দূর থেকেই চোখে পড়বে, ভিতরে রয়েছে একজন! ভয়ঙ্কর রোগ জলাতঙ্কের রোগীদের রাখা হয় এই খাঁচায়। কিন্তু কেন? একবার জলাতঙ্ক বা র্যাবিস হলে মৃত্যু নিশ্চিত এবং সেই মৃত্যু ভয়ঙ্করতর মৃত্যুগুলির একটি। আইডি’র কর্মীরাই জানালেন, রোগীর জ্বর, আচ্ছন্নভাব, পক্ষাঘাত, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি তো হয়ই, তার সঙ্গে অতিরিক্ত লালা বেরতে থাকে। এমনকী, তীব্র যন্ত্রণার ঘোরে কাউকে আক্রমণও করতে পারেন রোগী। জল দেখলে ভয় তো আছেই, যার শেষ পরিণতি কোমাচ্ছন্ন হয়ে মৃত্যু।
২০২৪ সাল এহেন মারাত্মক অসুখে রাজ্যে ঝরে গিয়েছে ৩৯টি প্রাণ। রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বছর রাজ্যজুড়ে পশুর কামড়ের শিকার হয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই ৩৯ জনের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে জলাতঙ্কের টিকা নেওয়ার পরও মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তি ‘ক্যাটিগরি সি’ বা রক্তপাতযুক্ত ভয়ঙ্কর কামড়ের শিকার হওয়া সত্ত্বেও ‘ইমিউনোগ্লোবিউলিন’ নেননি। শুধুমাত্র জলাতঙ্কের চার ডোজের টিকা নিয়েছিলেন। গত কয়েক বছর ধরে জলাতঙ্কে মৃত্যুর নিরিখে দেশের শীর্ষে থাকা রাজ্যগুলির অন্যতম পশ্চিমবঙ্গ। দিল্লি, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ইত্যাদি রাজ্যও রয়েছে উপরের দিকে। ২০২৩ সালে বাংলায় জলাতঙ্কে মারা গিয়েছিলেন ৩৮ জন। সেবার দেশের মধ্যে বাংলা ছিল দিল্লির (৪৮) পরেই। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, বাড়িতে যে ইঁদুর বা ছুঁচোর উপদ্রব হয়, সেগুলি বাদে যে কোনও উষ্ণ রক্তের স্তন্যপ্রায়ী প্রাণীর কামড়ে হতে পারে এই ভয়াবহ রোগ। সঠিক সময়ে টিকা বা অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন না নিলেই বিপদ। কুকুর তো বটেই, বিড়াল, বাঁদর থেকে শুরু করে বাঘ, চিতাবাঘ এমনকী, ঘোড়া বা উটের কামড়েও হতে পারে জলাতঙ্ক। উত্তরবঙ্গের চা বাগানে চিতাবাঘের আঁচড়কামড় খাওয়ার ঘটনা আকছার ঘটে। বাঘের কামড়ও সুন্দরবনে বিরল নয়। এমনকী ঘোড়া বা উট যাঁরা পোষেন, খাওয়াতে গিয়ে কামড় খাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ক্ষেত্রে জলাতঙ্কের ভয় থাকে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চারডোজের অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিনের কোর্সটি হল—জিরো মানে প্রথমদিন, তিন অর্থাৎ তৃতীয় দিন, সাত বা সপ্তম দিন এবং ২৮ মানে ২৮তম দিন। পাঁচ ডোজের কোর্সে সময় একই থাকবে। শুধু যুক্ত হবে ১৪তম দিনটি। র্যাবিসের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ সুমিত পোদ্দার বলেন, ‘দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই কামড় খাওয়া ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। ক্যাটিগরি ৩ বাইটে অর্থাৎ জোরালো কামড় ও প্রচুর রক্তপাতের ক্ষেত্রে যাতে শুরুতেই জলাতঙ্কের আশঙ্কা নির্মূল করা যায়, সেজন্য ক্ষতস্থানে ইমিউনোগ্লোবিউলিন নেওয়া উচিত।’