বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, উলুবেড়িয়া: বিকেল সাড়ে ৫টা। ভোটের দামামা বাজার পর থেকে পার্টির নেতা-কর্মীদের কাছে এই সময়টা বড়ো ব্যস্ততার। জনসভা বা কর্মিসভা নিয়ে মেতে থাকতে হয় তাঁদের। বক্তৃতার প্রস্তুতি নেন প্রার্থীরাও। অথচ উলুবেড়িয়া দক্ষিণ কেন্দ্রের তৃণমূলের প্রার্থীর মধ্যে এসব নিয়ে মেতে থাকার ন্যূনতম প্রচেষ্টাও দেখা গেল না। তিনি পুলক রায়। এর আগে পাঁচবার বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়েছেন। প্রথম দুবার ব্যর্থ হলেও ২০১১ সালে বাংলায় তৃণমূলের জোয়ার আসার পর থেকেই তিনি তিনবারের বিধায়ক। ২০২১ সাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী। তাঁকে পাওয়া গেল কুলগাছিয়া রেল স্টেশন লাগোয়া সুপার মার্কেটের মধ্যে। সন্ধ্যার মুখে একটা ছোটো হার্ডওয়্যারের দোকানের সামনে টুলে বসেছিলেন তিনি। ক্যাজুয়াল মুড। সঙ্গে সঙ্গী জনাতিনেক। পথচলতি মানুষ তাঁকে দেখে এগিয়ে আসছিল। শুভেচ্ছা বিনিময় চলছিল হালকা মেজাজেই।
মন্ত্রী কাউকে শুধালেন, ‘বাবার শরীর ভালো তো?’ কারো প্রতি তাঁর জিজ্ঞাসা, ‘কাজ কেমন চলছে?’ ভোট নিয়ে কোনো কথা হল না কারো সঙ্গে। প্রশ্ন করলাম, কোনো কর্মিসভা নেই? পুলক রায় বললেন, ‘আছে তো। ওরা সামলে নেবে।’ ওরা মানে, পার্টির কর্মীরা। বোঝালেন, তিনি রাজনীতির বাধ্য ছাত্র। পরীক্ষার আগে রাতদিন পড়াশোনা নয়। বছরভর সংগঠন আর জনসংযোগে মন দেন তিনি। তাই ভোটপরীক্ষায় তিনি টেনশনমুক্ত, ক্যাজুয়াল। এক সঙ্গী বললেন, ‘দাদা তো আজ সকালেই উলুবেড়িয়া উত্তরে গিয়েছিলেন কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে। আসলে, দাদাকে জেলার (গ্রামীণ) দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে আটটা বিধানসভা এলাকায়। তাই বাইরেই সময় দিতে হচ্ছে বেশি।’ নিচু গলায় পুলক রায়ের স্বগতোক্তি, ‘আটটাতেই কিন্তু এবারো জিতছি।’ সন্ধ্যা নামতেই পুলকবাবুর ডাক পড়ল স্থানীয় পার্টি অফিসে। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন আশপাশের পঞ্চায়েতের প্রধান-উপ প্রধানরা। তাঁরাই শুনিয়ে গেলেন সারাদিনের কর্মসূচির ফিরিস্তি। চা আর থিন অ্যারারুট বিস্কুটে তখনও স্থিতধী জোড়ফুলের প্রার্থী। তাঁর নিজের কেন্দ্র দক্ষিণ উলুবেড়িয়ায় মার্জিন কত থাকবে? জবাবে মন্ত্রী বললেন, ‘কোনো টার্গেট নেই। সেটা তো ঠিক করবেন ভোটাররা। আমার কাজ আমি করেছি। তাঁদের কাজ তাঁরা করবেন। এটুকু বলতে পারি, সামাজিকভাবে সবরকমের পরিষেবা পেয়েছেন মানুষ। আবার ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা উপকৃত হয়েছেন সরকারের জন্যই। ভোটবাক্সে তার সুফল মিলতে বাধ্য। বিরোধীরা কূলকিনারা পাবে না।’
সামাজিক পরিষেবা কি সত্যিই নিখুঁত? কথা হচ্ছিল এলাকার এক বাসিন্দার সঙ্গে। উলুবেড়িয়া-১ ব্লকে হাটগাছা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে বোয়ালিয়া ঘাট দেখিয়ে বললেন, ‘বছরের পর বছর ধরে শুনে আসছি, এখানে নাকি ব্রিজ হবে। কবে হবে কেউ জানে না। তবে প্রতিশ্রুতি দেয় সবাই। ব্রিজ হলে শ্যামপুরের সঙ্গে বীরশিবপুর রেল স্টেশন, বম্বে রোডের সঙ্গে যোগাযোগ হবে সরাসরি। গাড়ি নিয়ে মহকুমা শহরে সরাসরি পোঁছানো যাবে রাতবিরেতে, খেয়ার উপর ভরসা করা ছাড়াই। কিন্তু সে আর হল কই?’ তবে উন্নয়ন যে হয়েছে অনেকটাই, মানছেন সবাই। কৈজুড়ি শীতলা মন্দিরের সামনের চাতালে বসে এক ভদ্রলোক বলছিলেন, ‘এই চত্বরে অন্ধকার ছিল একসময়। এখন আলো ঝলমল করে চারদিকে। মহেশপুর এলাকায় দীর্ঘ পথে বসেছে নজরকাড়া সৌরআলো, মোড়ে মোড়ে হাইমাস্ট। ৫৮ গেট থেকে মাতাপাড়া পর্যন্ত রাস্তাও এখন আলো ঝলমলে।’ মহেশপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বারাগোয়ালের বাসিন্দা রুহুল আমিন মোল্লার সোজাসাপটা কথা, ‘বামফ্রন্টের সময় সিপিএম মেম্বার ছিলাম। কিন্তু কোনো কাজ দেখতে পাইনি। বলরামপুর শিবতলায় বাম আমলে দুবার রাস্তা হবে বলে ইট পড়েছিল। রাস্তা কিন্তু হয়নি। ২০১৫ সালে তৃণমূলে আসি। উলুবেড়িয়া জেটি, বাইপাসের রাস্তা, পলিটেকনিক, মেডিকেল কলেজ—সবই তো হতে দেখলাম এই কবছরে।’ আর চাই? ৫৮ গেট, গড়চুমুকে যে সৌন্দর্যায়ন হয়েছে, মিনি চিড়িয়াখানা হয়েছে, তা যেকোনো মেট্রো শহরের সৌন্দর্যকে লজ্জা দেবে! গর্ব করে বলছেন এলাকার বাসিন্দারাই।
তবে তৃণমূলের উনয়ন্নের ফিরিস্তি নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী আমিরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় হাসপাতাল নেই। কলেজ নেই। মানুষকে এর জন্য উলুবেড়িয়া শহরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। মানুষকে আমরা এসব গড়ার কথা জানাচ্ছি। সবচেয়ে বড়ো কথা, দেড় হাজার টাকার বিনিময়ে বেকারত্ব জিইয়ে রাখায় আমরা বিশ্বাসী নই। প্রতি পরিবারে অন্তত একজনের চাকরি নিশ্চিত করা, ন্যূনতম আমাদের লক্ষ্য।’ কী বলছেন বিজেপি প্রার্থী স্বামী মঙ্গলানন্দ পুরী মহারাজ? তিনি কে? এলাকার কয়েকজনকে প্রশ্ন করতে, তেমন জুতসই জবাব মিলল না। কোনো এক আশ্রমের মহারাজ হবেন হয়তো, এমন দায়সারা জবাবই মিলল। মহারাজও যে ইতিমধ্যে প্রচারে বড়ো ছাপ ফেলতে পেরেছেন, তা নয়। বরং তাঁকে জেতাতে যাতে পুরানো বিজেপি কর্মীরাও অভিমান ভুলে এগিয়ে আসেন, সেই বার্তা জনসমক্ষে দিচ্ছেন তিনি। এবার পদ্মফুলের সরকার গড়ে, সবাইকে সুশাসনের আনন্দযজ্ঞে শামিল হতে ডাক দিচ্ছেন মঙ্গলানন্দ মহারাজ। গেরুয়া পাগড়ি-পরিধানেই পাড়ায় পাড়ায় ছুটছেন তিনি। এবার ফিনিশিং পয়েন্ট স্পর্শ করবেন সবার আগে কে?