সায়নদীপ ঘোষ, কলকাতা: দেখতে দেখতে পঁচাত্তরে পা দিল বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন। প্ল্যাটিনাম জুবিলি বলে কথা। তাই আয়োজনও নজরকাড়া। এত কিছুর মধ্যেও পুজোর রীতিনীতিতে কোনও বদল ঘটেনি। ঐতিহ্যের সেই পরম্পরা বহমান ধারার মতো বয়ে চলেছে। সেখানে কোনও পরিবর্তন নেই। তাই তো এবারের ভাবনা ‘প্রথা’। শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল। শিল্পী জানান, ‘আজকের দুর্গাপুজো অনেকটাই বিবর্তিত। তবে এই পরিচিত রূপের থেকে বালিগঞ্জ কালচারালের ধারা সম্পূর্ণ আলাদা। আজও প্রথা মেনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে এই পুজো।’ আজকের দিনে এমন একটা উৎসব কীভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়? নিজের মতো করে সেই চেষ্টাই করেছেন সুশান্ত। তাঁর বক্তব্য, ‘লেক ভিউ রোড দিয়ে মূল মণ্ডপে প্রবেশ করলেই কিছুক্ষণের জন্য এক অনন্য অনুভূতির সাক্ষী থাকবেন মানুষ। ৭৫ বছর নেহাত কম সময় নয়। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে এসেছে নানান চড়াই-উতরাই।’ সাধারণ সম্পাদক ডাঃ সপ্তর্ষি বসু বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এই পুজো দেখে আসছি। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। তবে সাবেকিয়ানা নয়। এবারেও প্রথা মেনেই পুজো এবং সিঁদুর খেলা।’
কিছুটা এগিয়ে বাঁদিকে ঢুকলেই স্বাধীনতা পূর্ববর্তী যুগে পৌঁছে যাবেন মানুষ। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট। সংঘর্ষের ক্ষত তখনও দগদগে। তারইমধ্যে পাড়ায় সমাজসেবামূলক কাজ শুরু করলেন স্থানীয় যুবকরা। রাতে টহলদারি। সেনার বুটের শব্দে গমগম করছে এলাকা। ঘন ঘন সেনার ট্রাক যাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিরা ঘুরে যাচ্ছেন। এসবের মাঝেই চলতে থাকল কাজ। পাড়ায় মাঝেমধ্যে গোপনে বৈঠক করতেন স্বাধীনতা সংগ্ৰামীরা। থাকতেন লীলা রায়, শরৎচন্দ্র বসু, অনিল রায় প্রমুখ। যুবকদের উৎসাহ দিতেন তাঁরা। লীলা রায়ের কথায় তৈরি হল ‘সমাজসেবী সংঘ’। এরপর একজোট হয়ে আরও জোরকদমে চলতে থাকল কাজ। লীলা রায় বললেন, সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের বার্তা দিতে দুর্গাপুজো শুরু হোক। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সেই বছরেই শুরু হল দেবী দুর্গার আরাধনা। তারপর দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে অনেকগুলি দশক। ৮০তম বর্ষে শুরুর সেই দিনগুলোকে ফিরে দেখাচ্ছে সমাজসেবী সংঘ। এবারের বিষয় ‘পথের পাঁচালী ১৯৪৬’। ভাবনায় শিল্পী প্রদীপ দাস। মণ্ডপে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সেই এলাকার তৎকালীন মানচিত্র। থাকছে টাইপরাইটার, খবরের কাগজের ছাপাখানা, সেনার ট্রাক। দেবী প্রতিমার মধ্যেও সেই আমলের ছাপ স্পষ্ট। তিনিই যেন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুজোর পাশাপাশি আজও সমাজসেবার কাজ সমান তালে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন উদ্যোক্তারা। এবারও পুজো শেষে মণ্ডপে থাকা ইনস্টলেশন বিভিন্ন জায়গায় বসানো হবে। সাজিয়ে তোলা হবে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের বাড়ি। আরও সুন্দর হয়ে উঠবে পাড়ার রাস্তা, বাগান। এভাবেই যেন পূর্ণতা পাচ্ছে ‘পথের পাঁচালী’।