বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: সাধারণত আমরা যে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দেবী দুর্গার পুজো করি, তার একেবারে ভিন্ন রূপে হুশেন ও মামুদ শাহের আমল থেকে দুর্গা আরাধনা হয়ে আসছে পাইকরের প্রত্যন্ত পঞ্চহর গ্রামে। এখানে দেবী দ্বিভূজা। এক হাতে সাপ, ডান হাতে ত্রিশূল, পদতলে মহিষাসুর। সিংহের মুখটি অশ্বের মতো, রং সাদা। সন্ধিপুজোয় দেবী নিজেই তাঁর উপস্থিতি জানান দেন। এটাই এই পুজোর বিশেষ মাহাত্ম্য।
জেলার বনেদি বাড়ির পুজোগুলোর মধ্যে অন্যতম পঞ্চহরের রাইজিবাড়ির পুজো। কথিত আছে, হুশেন ও মামুদ শাহের আমল ও চৈতন্য দেবের ধর্ম প্রচারকালে কোনও এক রাজা পঞ্চহর গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবারের হাতে তাম্রফলক তুলে দিয়ে দুর্গা, কালী ও শিব পুজো দান করেন। সেই সঙ্গে রায় উপাধি লাভ করেন। তখন থেকেই মুখোপাধ্যায় পরিবার রায়জি পরিবার নামে পরিচিতি লাভ করেন। প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের এই দুর্গাপুজোর জৌলুস বর্তমানে আগের চেয়ে কমলেও, ঐতিহ্যে আজও অমলিন। গ্রামে আরও দু’টি দুর্গাপুজো হয়, কিন্তু প্রাচীন এই পুজোকে ঘিরেই মানুষের উন্মাদনা বেশি। আগে লাগোয়া পাগলা নদী থেকে সপ্তমীর দিন নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে নিয়ে আসা হতো মাটির খড়ের ছাউনির মন্দিরে। যেহেতু এখানকার পাগলা নদীতে সেভাবে জল থাকে না। তাছাড়া পাড় অত্যন্ত উঁচু। তাই গ্রামের পুকুর থেকে ঘট ও নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে মাথায় করে মন্দিরে আনা হয়। যদিও গত ২৯ বছর আগে গ্রামবাসীদের আর্থিক সহযোগিতায় পাকা মন্দির হয়েছে। শ্রমিকরাও কোনও পারিশ্রমিক নেননি। তবে বেদী এখনও সেই মাটির রয়েছে। শুধু মাত্র চারদিক ইট দিয়ে গেঁথে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। জনশ্রুতি, বেদীতে পঞ্চমুণ্ডির আসন রয়েছে। তবে পুজো করতে কারোর সাহায্য নেন না মুখোপাধ্যায় পরিবার। আগে ১৫ দিন আগে বোধনে একটি ছাগ বলিদান হতো। এখন অবশ্য বোধনে বলিদান হয় না।
পুজোর শরিকদের মধ্যে অজিত রায় বলেন, অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে মাকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়। কোনও একটি ফুল না পড়া পর্যন্ত সন্ধিপুজো শুরু হয় না। সেই সময় মন্দিরে প্রচুর মানুষ ভিড় জমান। কারও যেন চোখের পলখ না পড়ে। সবাই এক দৃষ্টিতে দেবীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। যদি ফুল পড়া দেখতে না পান। ফুল পড়তে দেরি হলে ভক্তরা কান্না শুরু করে দেন। চলে চণ্ডপাঠ। অবশেষে দেবীর কৃপায় ফুল পড়ার পর সন্ধিপুজো শুরু হয় এবং শেষে পাঁঠা বলিদান ও অন্নভোগ নিবেদন করা হয়।
গ্রামের বাসিন্দা প্রাক্তন সরকারি অফিসার মিহিরকুমার সাহা বলেন, ২৯ বছর আগে যখন আমরা গ্রামবাসীরা মিলে মাটির মন্দির ভেঙে পাকা করার কাজ শুরু করি, তখন কয়েকটি রূপোর কয়েন পেয়েছিলাম। তখন আমি জেলাশাসকের অফিসে কর্মরত। কয়েনে উর্দু ও আরবি ভাষায় লেখা ছিল। কলকাতার বড় মসজিদে সেই কয়েন নিয়ে যায়। তাঁরা দেখে বলেন, এগুলি হুশেন ও তাঁর ছেলে মামুদ শাহের আমলের। সেই হিসেব ধরেই একটা ধারণা হয় প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরনো এই পুজো। আগে দশমীর বিকেলে দেবীকে কাঁধে চাপিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণের পর নিরঞ্জন করা হতো। এখন অবশ্য ভ্যানে চাপিয়ে নিরঞ্জনের পথে নিয়ে যাওয়া হয় দেবী মূর্তিকে। -নিজস্ব চিত্র