সংবাদদাতা, কাটোয়া: কাটোয়ায় কড়ুই অঞ্চলে বহু ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে ১০০ দিনের কাজের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে পূর্ব বর্ধমান জেলা তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক দিগন্ত পাল ও বিশ্বনাথ সাহাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রবিবার ধৃত দুই নেতাকে আদালতে আনতেই গণবিক্ষোভের চেহারা নেয় গোটা কোর্ট চত্বর। ওঠে চোর চোর স্লোগান। ছোড়া হয় ডিমও। ধৃতদের দুই অনুগামীকে বেধড়ক মারধর করতেও দেখা যায় ক্ষিপ্ত জনতাকে। ধৃত দুই নেতাকে ৪ দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক।
কাটোয়া-২ ব্লকের কড়ুই অঞ্চলের নতুনগ্রামের বাসিন্দা ওমর আলি শেখ শনিবার কাটোয়া থানায় লিখিত অভিযোগ জানান। পেশায় তিনি ট্রাক চালক। বেশির ভাগ দিন বাড়ির বাইরে থাকেন৷ পুলিশের কাছে তাঁর অভিযোগ, ক’দিন আগে তিনি জানতে পারেন তাঁর নামে পশ্চিমবঙ্গ গ্রামীণ ব্যাঙ্কে কৈথন শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। গ্রামের আরও অনেকেরও সেখানে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তাঁরা কেউই ওইসব অ্যাকাউণ্ট সম্পর্কে জানতেনই না৷ অভিযোগ, ওইসব অ্যাকাউন্টগুলিতে ২০১৬ সালের পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত লাগাতার ১০০ দিনের কাজের টাকা ঢোকানো হয়েছে৷ আবার তোলাও হয়েছে। তৃণমূলের কয়েকজন নেতা ওই টাকা আত্মসাৎ করেছে। তৃণমূলের জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, তাঁর আপ্ত সহায়ক দিগন্ত পাল, বিশ্বনাথ সাহা, কড়ুই অঞ্চলের তৃণমূলের সভাপতি সুকেশ চট্টোপাধ্যায়ের নামে অভিযোগ আনা হয়েছে।
দিগন্ত পাল কাটোয়ার প্রাক্তন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক ছিলেন। আর প্রাক্তন শিক্ষক বিশ্বনাথ সাহা রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ডান হাত ছিলেন। কাটোয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল এই দুই নেতার উপরে। তৃণমূলে ভরাডুবির জন্য এই দুই নেতার আচরণই মূলত দায়ী ছিল। এদিন বহু মানুষ আদালত চত্বরে এসে দুই নেতার নানান কীর্তি ফাঁস করেন৷ দিগন্ত পাল কাটোয়া শহরে ‘ডিপি’ নামে পরিচিত। তিনি কাটোয়ার কার্যত ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন। পুরসভার সামান্য কর্মী হয়ে কয়কশো কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছিলেন দিগন্ত। পুরসভা থেকে ডেভলপমেন্ট ফি এর নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকার কাটমানি আদায়ের অভিযোগ তুলছেন বাসিন্দারা৷ শুধু তাই নয়, বহু মানুষকে বিরোধী দল করার অপরাধে মিথ্যা মামলায় জেলও খাটিয়েছিলেন দিগন্ত।
কাটোয়ার কুখ্যাত দুষ্কৃতী জঙ্গলের ধাঁচে দিগন্তও একটি গ্যাং গড়েছিলেন। শহর লাগোয়া হরিপুর, খাজুরডিহি গ্রামের দুষ্কৃতী মন্টু শেখ, টুটুল শেখ, হানিফ শেখরা সেই গ্যাংয়ে ছিল। আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে তোলাবাজি চালাত। হুমকি দেওয়া হতো। শহরে কেউ বহুতল গড়লে দিগন্তকে প্রণামী না দিয়ে কেউ কাজ করতে পারতেন না৷ সব মিলিয়ে তৃণমূলের জমানায় দিগন্ত কাটোয়ার ‘মসীহা’ হয়ে উঠেছিল বেতাজ বাদশা। তাঁর কথায় পুলিশেরও একটা অংশ উঠত বসত। একটা সময় বাসিন্দারা জঙ্গলকে যতটা না ভয় পেতেন, তার চেয়ে বেশি ভয় পেতেন দিগন্তের নাম শুনলে। রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক হওয়ার সুবাদে দিগন্ত পূর্ব বর্ধমান জেলাজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতেন। শহর ছাড়াও গ্রামীন এলাকায় ঠিকাদারিতেও তাঁর নজর ছিল। বাসিন্দাদের কাছ থেকে প্রাক্তন বিধায়ককে দূরে রেখেছিল এই দিগন্ত৷ কলকাতা, কাটোয়ায় একাধিক এলাকায় ফ্ল্যাট, বর্ধমান, কলকাতায় একাধিক জমি—কি নেই তাঁর।
ধৃত বিশ্বনাথ সাহার বিরুদ্ধে গত পঞ্চায়েত ভোটে পানুহাটে প্রকাশ্যে ছাপ্পা মারার অভিযোগ ওঠে। ‘মাস্টার’ বলে অনেকেই কটাক্ষ করত তাঁকে৷ তিনি বাহিনী নিয়ে গিয়ে পানুহাটে ছাপ্পা মেরে এসেছিলেন৷ শহরের বাসিন্দাদের দাবি, দিগন্তের আয়ের সঙ্গে সম্পত্তির খতিয়ান খতিয়ে দেখুক পুলিশ।