Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / বিনোদন

প্রয়াত শ্যাম বেনেগাল

প্রয়াত শ্যাম বেনেগাল
  • ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
ছোটবেলায় কলকাতায় সাঁতার কম্পিটিশন এসে প্রথম ‘পথের পাঁচালী’ দেখা। সেটাও প্রায় ১২ বার। কতই বা বয়স তখন.. বছর কুড়ি। তার অনেক আগেই মাথায় সিনেমার পোকাটা নড়ে উঠেছে। বাবা চিত্রগ্রাহক। দূরসম্পর্কের আত্মীয় অভিনেতা-পরিচালক গুরু দত্ত স্বয়ং। কিন্তু সেই যে ‘পথের পাঁচালী’ দেখলেন, সেই থেকে তাঁর ভাবনায় রয়ে গেল সত্যজিৎ রায়ের প্রভাবই। ‘নায়ক’ সিনেমার সময় তো জুড়েই গেলেন কিংবদন্তি পরিচালকের ইউনিটে, ভারত সরকারের হয়ে তথ্যচিত্র তৈরির জন্য। বাংলার সঙ্গে সেই যোগ ছিন্ন হয়নি আজীবন। শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটিও বাংলা ভাষাতেই, একজন কিংবদন্তি বাঙালিকে নিয়ে। তিনি ভারতীয় সিনেমার নিউ ওয়েভের অন্যতম কৃতী পরিচালক, শ্যাম বেনেগাল। সপ্তাহখানেক আগেই ৯০ বছরে পা দিয়েছিলেন। সোমবার সন্ধ্যায় আচমকাই জানা গেল তাঁর মৃত্যুসংবাদ। অবসান হল একটি যুগের। না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন ‘অঙ্কুর’, ‘মন্থন’, ‘নিশান্ত’-এর মতো কালজয়ী ছবির পরিচালক।
Advertisement
দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায়। কিডনি সংক্রান্ত সমস্যা ছিল। গত বছর তাঁর ‘গুরুতর’ অসুস্থতার খবরে বিচলিত হয়েছিল গোটা দেশ। তখন পরিচালকের মেয়ে পিয়া বেনেগাল বলেছিলেন, ‘বাবা এতটাই অসুস্থ যে বাড়ি থেকে বেরতে পারছেন না, এমন খবর ভুয়ো।’ পিয়া জানিয়েছিলেন, সবসময় কাজে মগ্ন থাকেন শ্যাম। ২০২৩ সালে মুক্তি পায় তাঁর শেষ ছবি ‘মুজিব: দ্য মেকিং অব আ নেশন’। আরও অনেক ছবি তৈরির পরিকল্পনা ছিল তাঁর। যাবতীয় পরিকল্পনা অসমাপ্ত রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। সন্ধ্যায় বাবার মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করেছেন পিয়া। 
১৯৩৪ সালে হায়দরাবাদে কোঙ্কনি পরিবারে জন্ম শ্যামের। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি, জমিদার ও শ্রমজীবী নিচুজাতের মানুষের মধ্যে যে ফারাক, ছুঁৎমার্গ তা দেখে বড় হয়েছিলেন। দেখেছিলেন শোষক ও শোষিতের লড়াই। সেই কাহিনিই তুলে ধরলেন প্রথম ছবি ‘অঙ্কুর’-এ। সালটা ১৯৭৪। সেই ছবিটিও প্রথমবার দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎকেই। গোবিন্দ নিহালনির ক্যামেরা ও শ্যামের গল্প বলার ধরন— দুইয়ের মেলবন্ধনে দর্শকের সামনে নতুন রূপে ধরা দিলেন শাবানা আজমি। বার্লিনে প্রশংসিত হয়েছিল শাবানার কাজ। প্রথম ছবিতেই জাতীয় পুরস্কার পান শ্যাম। তবে শুধু প্রশংসা নয়, জরুরি অবস্থার সময় প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অভিযোগও উঠেছিল তাঁর সিনেমার বিরুদ্ধে। নিষিদ্ধ হয়েছিল ‘নিশান্ত’। যদিও শেষপর্যন্ত স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীর হস্তক্ষেপে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। সমান্তরাল চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমার্থক হয়ে ওঠেন শ্যাম।
ক্যামেরার সঙ্গে তাঁর ‘বন্ধুত্ব’ শৈশবেই। বাবা পেশায় ছিলেন চিত্রগ্রাহক। হায়দরাবাদে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। যোগ দেন হায়দরাবাদ ফিল্ম সোসাইটিতে। তারপরই শুরু চলচ্চিত্র সফর। তাঁর ‘মন্থন’ ছবির জন্য অনুদান দিয়েছিলেন পাঁচ লক্ষ গোয়ালা। তা এক ইতিহাস। ‘নিশান্ত’, ‘জুনুন’, ‘আরোহণ’, ‘ওয়েল ডান আব্বা’, ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু: দ্য ফরগটন হিরো’-র মতো বহু ছবি দর্শককে উপহার দিয়েছেন তিনি। ‘পদ্মশ্রী’, ‘পদ্মভূষণ’, ‘দাদা সাহেব ফালকে’র মতো একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন প্রখ্যাত এই পরিচালক। 

শোক প্রতিক্রিয়া
শ্যাম বেনেগালজির প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। ওঁর গল্প বলা ভারতীয় চলচ্চিত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কাজগুলি বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে প্রশংসিত হতে থাকবে। 
নরেন্দ্র মোদি, প্রধানমন্ত্রী

প্রবাদপ্রতিম পরিচালক শ্যাম বেনেগালের প্রয়াণে মর্মাহত। ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্রের এক স্তম্ভ ছিলেন। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্যমন্ত্রী 

বহু দিনের সম্পর্ক। বাবার উপরে একটি প্রামাণ্য তথ্যচিত্র করেছিলেন। বাবা খুবই পছন্দ করতেন ওঁর ছবি। যখনই কলকাতায় আসতেন, দেখা হতো। চলে আসতেন আমাদের বাড়িতে। সবসময় যোগাযোগ রেখেছেন। যখন রায় সোসাইটি গঠন করি, প্রতি বছর সত্যজিৎ রায় মেমোরিয়াল লেকচার আয়োজন করা হয়, সেখানে এক বছর বাবার সম্পর্কে বলেছিলেন। যখনই প্রয়োজন হয়েছে, ওঁর সাহায্য পেয়েছি। অনেক দিনের সম্পর্ক, ভীষণ খারাপ লাগছে। 
সন্দীপ রায়, পরিচালক 

ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া করেছি। পার্লামেন্টের উপর ‘সংবিধান’-এও কাজ করেছি। শ্যামজি আমাদের থিয়েটার দেখতে আসতেন। উনি যা আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকে দিয়ে গিয়েছেন, তা তুলনাহীন। উনি ভারতীয় ছবির জগতের একজন লেজেন্ড। ইন্ডাস্ট্রি তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হারাল। আজ ডিজিটাল মাধ্যমে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তা বহু আগেই করেছেন শ্যাম বেনেগাল। 
অঞ্জন শ্রীবাস্তব, অভিনেতা

আমার কাছে শ্যাম বেনেগালের গুরুত্ব কতটা, তা কয়েকটা শব্দে বর্ণনা করা অসম্ভব। উনি যদি আমার উপর বিশ্বাস না রাখতেন, তাহলে আমি আজ কোথায় থাকতাম, ভেবে অবাক হই। 
নাসিরুদ্দিন শাহ, অভিনেতা

শ্যাম বেনেগাল কেবল কিংবদন্তি নন, তিনি এমন একজন পরিচালক যিনি গল্প বলার ধরন পাল্টে দিয়েছিলেন। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করা সৌভাগ্যের।  
মনোজ বাজপেয়ি, অভিনেতা

সাধারণ মানুষ ও সাধারণ জীবনের কবিতা বলতেন। বড্ড তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেললাম। 
সুধীর মিশ্র, পরিচালক

বাস্তবতা ও গভীরতা দিয়ে ভারতীয় সিনেমাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। 
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অভিনেতা

 
সম্পর্কিত সংবাদ