নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলি সংক্রান্ত বিলের বিরুদ্ধে একযোগে প্রতিবাদে নামলেন রাজ্যের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। শনিবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে ওয়েবকুটা এবং অ্যাবুটার মতো অধ্যাপক সংগঠনের পাশাপাশি জুটা, কুটা, আরবুটার মতো বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক অধ্যাপক সমিতির নেতারা হাজির ছিলেন। সেখানে এই বিলকে ‘কালা কানুন’ আখ্যা দিয়ে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। তবে তার আগে রাজ্যপালের কাছে দরবার এবং পথে নেমে প্রতিবাদ জানাবেন তাঁরা।
ওয়েবকুটার তরফে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি শুভোদয় দাশগুপ্ত, নিলয় সাহা, অ্যাবুটার তরফে গৌতম মাইতি। সার্বিকভাবে তাঁদের বক্তব্য, নিয়োগের সময় যে সার্ভিস রুল ছিল, এই বাধ্যতামূলক বদলি নীতি তার পরিপন্থী। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষকদের নিয়োগকারী সংস্থা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ। তাই সরকার এই বদলি কার্যকর করতে পারে না। এটি আসলে বিরোধী মনোভাবাপন্ন অধ্যাপকদের শায়েস্তা করার অস্ত্র।
বিজেপি সরকারের ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বক্তারা তৃণমূল সরকারের তৈরি ২০১৭ সালের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। সেখানে বলা হয়েছিল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে সরকার। তবে, সেই আইনের বিতর্কিত বিষয়গুলিতে আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। ওয়াকফ সম্পত্তিতে তৈরি কলেজকে আওতার বাইরে রাখতে ওয়াকফ বোর্ডও মামলা করেছিল। সেই আইনি লড়াইও চলছে। আর বিজেপি সরকার সেই আইন বাতিল না করে আরও বেশি করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের মুঠোয় আনতে বিলটি পাশ করিয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
অধ্যাপকরা আরও জানান, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ অধ্যাপকের পদ ফাঁকা। শিক্ষাকর্মীর পদ প্রায় ৭০ শতাংশ ফাঁকা। দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী উপাচার্যও নেই। কলেজের অবস্থাও করুণ। সেই শূন্যপদ পূরণ না করে অন্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মী আনা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যার সঙ্গে যেভাবে গৌড়বঙ্গ বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির তুলনা উচ্চশিক্ষামন্ত্রী করেছেন, তারও প্রতিবাদ করেন বক্তারা। তাঁদের মতে, যাদবপুর বা কলকাতায় পড়ুয়া সংখ্যাও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। সেই অনুযায়ী শিক্ষক রয়েছে। তারপরেও এক-একজন শিক্ষক পিছু ২০০ জন পড়ুয়া রয়েছেন বিভিন্ন বিভাগে। শূন্যপদ বেশি থাকায় ন্যাকের গ্রেড বা বিভিন্ন র্যাঙ্কিংয়েও পিছিয়ে পড়ছেন অধ্যাপকরা। এর দায় তাঁদের নয়, সরকারকেই নিতে হবে বলে তাঁদের দাবি।
এই বদলির ফলে যে গবেষণা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেই আশঙ্কাক কথাও তুলে ধরেছেন অধ্যাপকরা। তাঁদের বক্তব্য, একজন সুপারভাইজার বদলি হয়ে গেলে বিপাকে পড়বেন গবেষকরা। একজন অধ্যাপক রিসার্চ গ্রান্ট পেয়ে যন্ত্রপাতি কেনার পরে বদলি হয়ে গেলে পুরো বিষয়টিই জটিল হয়ে পড়বে। কারণ, এ ধরনের গ্রান্টের সঙ্গে অধ্যাপক এবং প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারিত্ব থাকে। জর্জ জনসন নামে এক অধ্যাপকের ২০০৩ সালে কেরল হাইকোর্টে করা মামলার একটি রায় নিয়েও কাঁটাছেড়া চলছে বলে সূত্রের খবর। সেই মামলার রায়ে আদালত বলেছিল, কোনো বদলি যদি অধ্যাপকের অসুবিধা বা কষ্টের কারণ হয়, তবে সেটি কার্যকর করা যাবে না। এখানকার অধ্যাপকরা চাইছেন আইনি পথে হাঁটার আগে সরকারই বিলটি তুলে নিক। যেভাবে ‘বোর্ড অব স্টাডি’ এবং অন্যান্য অ্যাকাডেমিক কাজে এক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে অন্যত্র ব্যবহার করে মেধার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়, সেই ধারা বজায় থাক।