ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ শেষ হয়নি। তার আগেই ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলতে শুরু করে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতি। ফলত, দিনে তারা দেখছিল বিশ্ব অর্থনীতি। সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ ভারত তার বাইরে থাকে কী করে? অশনিসংকেত ছিল পদে পদে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে ছিল কেন্দ্রের মোদি সরকার। ছিল ভোটের বালাই—পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। ভোটগ্রহণ এবং সরকার গঠনের ঝক্কি পেরোতেই মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। ১০ মে পেট্রল-ডিজেলের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে আরজি রাখলেন। বললেন, ভারতের কাছে বড়ো বড়ো তেলের ভাণ্ডার নেই। আমাদের পেট্রল-ডিজেলের ব্যবহার কমাতে হবে। এরপরই ১৫ মে দাম বাড়ানো হয় পেট্রলে ৩.২৯ টাকা, ডিজেলে ৩.১১ টাকা। তারপর চারদিন যেতে না যেতে ফের বাড়ে জ্বালানির দাম। আরো একদফা বাড়ল শনিবার। সব মিলিয়ে নয়দিনে তিনবার! শনিবার সাতসকালে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম বাড়ল ৮৭ পয়সা এবং ডিজেলের ক্ষেত্রে ৯১ পয়সা। আশঙ্কার শেষ এখানেই নয়। কারণ, ধাপে ধাপে পেট্রল-ডিজেলের দাম যথাক্রমে ৫.১৯ টাকা এবং ৫ টাকা বৃদ্ধির পরও দুপুরে কেন্দ্রের তরফে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বলা হচ্ছে, এতকিছুর পরও সরকারি তেল সংস্থাগুলিকে বিপুল লোকসান বইতে হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের খতিয়ান জানিয়ে সরকারের আরো সাফাই, ভারতেই পেট্রপণ্য সস্তা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দাম কি আরো বৃদ্ধির অশনিসংকেত দিয়ে রাখল সরকার বাহাদুর?
ডিজেলের দাম বাড়লে স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়বে পরিবহণ খরচ। দামি হবে প্রতিটি পণ্য ও পরিষেবা। আর মহার্ঘ হবে ডিজেলজাত উপকরণগুলিও। শনিবারের দামবৃদ্ধির পর পণ্য পরিবহণের মাশুল ফের বেড়ে যাচ্ছে লিটার-প্রতি ৫৫ পয়সা। কয়েকদিন আগেই পণ্য পরিবহণ সংগঠনগুলি জানিয়েছে, ৪ শতাংশ বাড়ছে পণ্য মাশুল। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেই মাশুল আরো বাড়ানো হল। পেট্রল-ডিজেলের মূল্য লাগাতার বৃদ্ধির পর কি রান্নার গ্যাসের পালা? এলপিজি কি আরো দামি হতে যাচ্ছে অচিরেই? এই প্রশ্ন ও আশঙ্কা এখন স্বাভাবিক। অর্থাৎ লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির চাপই এখন ভবিতব্য! তবে পেট্রল-ডিজেলে মূল্যবৃদ্ধির হ্যাটট্রিকের পর একেবারে হাত গুটিয়ে বসে নেই মোদি সরকার। বরং সাফাই দিতে শনিবার তারা পরিসংখ্যানসহ দাবি করেছে, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে ভ্যাট অনেক কম। তাই পেট্রপণ্যের দামও কম সেখানে। যেমন দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাত, অসম—সর্বত্র পেট্রলের লিটারপিছু দর ৯৯ থেকে ১০১ টাকার মধ্যে। অন্যত্র ভ্যাট ৩০ শতাংশের অধিক। তাই পেট্রল-ডিজেলের দাম সেসব রাজ্যে নাগালের বাইরে। আর এসব রাজ্যের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে তৃতীয় স্থানে ডবল ইঞ্জিন পশ্চিমবঙ্গ! কারণ, বাংলাকে এখনো তৃণমূল-শাসিত দেখানো হয়েছে। সেই সূত্রেই ভ্যাট কমাতে বলা হয়েছে বাংলাকেও। দিল্লির নির্দেশ মেনে পশ্চিমবঙ্গের নয়া বিজেপি সরকার পেট্রল-ডিজেলের উপর ভ্যাট কমালে এরাজ্যেও পেট্রপণ্যের দাম কিছুটা কমবে। তার সুফল পাবেন বাংলার মানুষ।
বাংলায় ভ্যাট কমানোর দাবি পুরানো। সে-সময় রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার এই ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের উপর বারবার চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু রাজ্যের আয় কমে যাওয়ার অজুহাতে পূর্ববর্তী সরকার তাতে কান দেয়নি। কারণ পেট্রপণ্যের কর-রাজস্ব শুধু কেন্দ্রের কোষাগারে জমা হয় না, রাজ্য সরকারেরও মস্ত আয়ের উৎস সেটি। ভ্যাট কমাবার ব্যাপারে এতদিন কেন্দ্রের নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলি। এবার পরীক্ষা অধিকারী সরকারের। জনতার দাবি মেনে বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারও কি ভ্যাট কমাবে? নতুন বাংলা দলছুট হলে বিরূপ প্রশ্ন উঠবেই। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতিতে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ শতাংশের অধিক বেড়েছে। যুদ্ধ থামবে কবে? ইতিবাচক লক্ষণ কই? এই পরিস্থিতিতে তেল এবং গ্যাসের দাম হ্রাসের আশা কোথায়? আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রতিকূলতার দায় সবটা নাগরিকের ঘাড়ে চাপানো কোনো কাজের কথা নয়। তাহলে সরকার থাকার দরকার কী? এখন তো ডবল ইঞ্জিন সরকার বাংলাতেও। তার ডবল সুবিধা বাংলা পাবে না কেন? রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা, কেন্দ্র-রাজ্য সুসমন্বয়ের ভিত্তিতেই তাদের প্রাপ্য সুরাহা দেবে। দামবৃদ্ধির অনাবশ্যক চাপ থেকে মুক্তি পাবে তারা।