নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: একদিকে ভেজাল ওষুধ। অন্যদিকে ৭৪৮টি জরুরি ওষুধের দাম বৃদ্ধি। আম জনতা পড়েছে উভয় সঙ্কটে। বাঙালি গৃহস্থের পরিবারে মাসে কমপক্ষে তিন থেকে চার হাজার টাকার ওষুধ লাগে এখন। কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভেজাল ওষুধের কারবার সামনে আসার পর রোগী ও তাঁদের পরিবার-পরিজন রীতিমতো উদ্বিগ্ন। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে ওষুধ কিনেও তো শান্তি নেই! যদি ভেজাল হয়? যদি কাজ না করে? হিতে বিপরীত হবে না তো? দুশ্চিন্তা আর উৎকন্ঠাভরা গলায় রোগীরা ফোন করছেন পরিচিত চিকিৎসকদের—‘স্যর, ক’দিন আগেই তো দেখলাম, যে প্রেশারের ওষুধটা খাই, ওটা জাল। আর কি খাব ওই ওষুধ? আপনি প্লিজ অন্য ব্র্যান্ডের ওষুধ বলে দিন। মনে শান্তি পাচ্ছি না।’
জোড়া বিপদের মধ্যে রাজ্যবাসী যখন জেরবার, তখন আবারও দ্ব্যর্থহীনভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওষুধের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বুধবার কেন্দ্রকে একহাত নেন তিনি। নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। হার্টের ওষুধের দাম বাড়িয়েছে ৩১.৮ শতাংশ। এক ধরনের কোলেস্টেরলের ওষুধের দাম বাড়িয়েছে ১১৫.৮ শতাংশ। ডাক্তার যখন এসব ওষুধ প্রেসক্রাইব করবেন, তখন তো বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আর কত টাকা পেলে কেন্দ্র এই জুমলাবাজি বন্ধ করবে? নির্বাচনের সময় শুধু বড় বড় কথা। এই দাম বৃদ্ধি কাদের জন্য? এক শ্রেণির কোটিপতির জন্য?’ ওষুধের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে তৃণমূল পথে নামছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আগামী ৪ ও ৫ এপ্রিল বিকেল ৪টে থেকে ৫টা পর্যন্ত রাজ্যের প্রত্যেক ব্লকে মিছিল ও প্রতিবাদ সভা হবে। তারপরও কেন্দ্র দাবি না মানলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রীর চাঁচাছোলা প্রশ্ন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার আছে কী করতে! ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রক সংস্থা) কী করছে? ৭৪৮টি সিডিউলড ওষুধ এবং ৮০টি নন-সিডিউলড ওষুধের দাম ১ এপ্রিল থেকে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রেশার, কোলেস্টেরল, হার্টের ওষুধের দাম বাড়িয়েছে। এমনকী প্যারাসিটামলের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে! ...আমি শঙ্কিত, দুঃখিত এবং মর্মাহত। সোসাইটি ফর ইকনমিক প্যারামিটারের মূল কথাই হল গরিব মানুষ যাতে ন্যায্য মূল্যে সঠিক জিনিসটি পায়, তা নিশ্চিত করা। আমরা সেই কবে স্বাস্থ্যসাথী করেছি। মানুষ যাতে জেনেরিক ওষুধ পায়, তার ব্যবস্থাও করেছি। সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিই। বেশ কিছু বাচ্চার হার্ট অপারেশন করেছি। কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করছি, স্বাস্থ্যবিমাতেও জিএসটি চালু হয়েছে। এ বিষয়ে আমি নিজে প্রধানমন্ত্রীকে বারবার বলেছি। কারণ, এটি আপামর সাধারণ মানুষের একটি বড় সমস্যা। এদিকে, জিএসটি’র প্রাপ্যটুকুও আমরা পাচ্ছি না।’
ওষুধে ভেজাল নিয়ে রাজ্যজুড়ে যে শোরগোল চলছে, তার কতটা প্রভাব পড়েছে কেনাবেচায়? কী বলছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং ওষুধের ব্যবসায়ীরা? কলকাতায় ওষুধের অন্যতম বড় স্টকিস্ট সোমনাথ ঘোষ বলেন, ‘ভেজাল ধরা পড়ার পর একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রেশারের ওষুধের বিক্রি অন্তত ৩০ শতাংশ কমে গিয়েছে।’ প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারি মাসে আইকিউভিআইএ’র ‘মার্কেট ফিডব্যাক রিপোর্ট’ অনুযায়ী ভারতে শুধু এই ব্র্যান্ডের ওষুধের বিক্রিই বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এই অবস্থায় মানুষের আস্থা ফেরাতে ওই ওষুধ উৎপাদক সংস্থা শুক্রবার তাদের সমস্ত পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চলেছে বলে খবর। শহরের নামকরা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ সৌমিত্র ঘোষ বলেন, ‘বহু রোগী ওষুধের গুণগত মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। নানা প্রশ্ন করছেন। প্রেশারের একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ অনেক ক্ষেত্রে পাল্টেও দিতে হচ্ছে।’ তবে বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অরূপ দাশবিশ্বাস বলেন, ‘ওই ওষুধটি অত্যন্ত কার্যকরী। খেতে বারণ করার প্রশ্নই আসে না। পুলিস, ড্রাগ কন্ট্রোল তাদের কাজ করবে। আমরা ডাক্তারি করব।’