নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: শিবঠাকুরের আপন দেশে নিয়মকানুন সর্বনেশে ছিলই। কিন্তু এবার নিয়মের জায়গা নিয়েছে ভাঙন। গ্রামের নাম মহেশটোলা। মহেশ অর্থাৎ শিব। সেই শিবভূমেই গঙ্গার ভাঙন সর্বনাশ ডেকে এনেছে। সেখানে আমজনতা যেমন গৃহহীন, তেমনই টান পড়েছে শিবজায়া উমার ভবন নিয়েও। আর তাতেই মুখ ব্যাজার হয়েছে সামশেরগঞ্জের মহেশটোলার। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত গোটা গ্রাম গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় গ্রামের একমাত্র দুর্গাপুজোর আয়োজন করা যেন একেবারে যুদ্ধ। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্গাদালানে একত্রিত হন আট থেকে আশি। সেই মিলনের মহালগ্নে এবার ভাঙনের কালো ছায়া পড়েছে। মহেশটোলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পুজো এবার ৩৪বছরে পা দিল। উমার আরাধনায় গ্রামবাসীদের এখন একটাই প্রার্থনা, ‘ভাঙন রুখে দাও মা’। গত কয়েক বছর ধরেই গঙ্গা সর্বগ্রাসী হয়েছে। গিলে নিয়েছে গ্রামের একের পর এক বাড়ি, জমি, পুজোর থানও। গঙ্গার কিনারায় কার্যত ঝুলছে একটা আস্ত গ্রামের বড় অংশ। বাসিন্দারা প্রতিদিন নিজেদের বাসস্থান জলে পড়তে দেখছেন। গঙ্গা এখনও যাঁদের বাড়ি গ্রাস করেনি, তাঁরাও প্রতিদিন দুরুদুরু বুকে আশঙ্কায় থাকেন। সাজানো বাগান থেকে মন্দির, কিছুই রক্ষা পায়নি। যে দুর্গাদালানে বছরের পর বছর পুজো হতো, তাও তলিয়েছে কয়েক বছর আগে। উমারও বেদি এখন অন্যত্র সরাতে হয়েছে। তাতেও উদ্বেগ কমেনি। বিগত কয়েক বছর ধরে হাটের মধ্যে এক জায়গায় পুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। হাটের পাশে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে ভাঙন কবলিত মানুষদের জন্য ক্যাম্প করা হয়েছে। পুজো করতে হলে তাঁদের অন্যত্র সরাতে হবে। তাতে পুজোর আনন্দ কমে যাবে। তাহলে পুজো হবে কোথায়? ভাঙনপীড়িত মানুষদের সামনেই ছোট করে পুজোর আয়োজন হচ্ছে।
একদিকে উদ্বাস্ত মানুষ, অন্যদিকে ভাঙনের তাণ্ডব। এই দুইয়ের মাঝখানে উৎসবের ‘আনন্দ আস্বাদন’ করবে মহেশটোলা। গ্রামবাসীদের কাছে পুজোর চাঁদার জন্য কোনও জুলুম নেই। পুজো কমিটির হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্যরা যে যার মতো টাকা দিয়ে পুজোর আয়োজন করছেন।
পুজো কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল সরকার বলেন, নামে মাত্র কেবল পুজো হচ্ছে। গোটা এলাকা ভাঙনে তলিয়ে যাওয়ায় এই হাটের মধ্যে পুজো শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেখানে ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষদের অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গেই পুজোর আনন্দ ভাগ করব আমরা। আমাদের পুজো কমিটিতে বুবাই সরকার, তরুণ সাহারা যেমন আছেন, তেমনই আছেন আলম শেখ, আলকেশ বিশ্বাসরা।
পুজো উদ্যোক্তা বুবাই সরকার বলেন, গঙ্গার পাশেই আমরা বড় হয়েছি। নদীর এই ভয়াবহ রূপ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। বছরে উমা একবার আসেন। তাই মায়ের জন্য সমস্ত আয়োজন করা হচ্ছে। আমাদের পুজোয় আড়ম্বর না থাকলেও ভরপুর আন্তরিকতা আছে।
গোধূলিতে পাড়ভাঙা গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক প্রবীণ। দূর গঙ্গার দিকে আঙুল তুলে বললেন, ওইখানে বাড়ি ছিল। আমার বাড়িও গিয়েছে, উমারও। তাই আর আসনপিঁড়ি করে ‘মেয়ে’কে ডাকি না। সর্বগ্রাসী গঙ্গায় তখন মন কেমন করা উদাসী হাওয়া বৃদ্ধের শেষ কথাগুলি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। যেমন করে মহেশটোলায় ভেসে যাচ্ছে পুজোর স্বপ্ন।



