Bartaman Logo
৩১ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মহম্মদবাজারে উলটপুরাণ, বালি মাফিয়াদের ডেরায় হানা পুলিশের

তবে কি কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙল? নাকি রাজ্যে পালাবদল হতে রাতারাতি বদলে গেল চেনা উর্দিধারীরা?

মহম্মদবাজারে উলটপুরাণ, বালি মাফিয়াদের ডেরায় হানা পুলিশের
  • ৩১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: তবে কি কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙল? নাকি রাজ্যে পালাবদল হতে রাতারাতি বদলে গেল চেনা উর্দিধারীরা? যে বালি মাফিয়ারা এতদিন থানার নাকের ডগা দিয়ে দেদার অবৈধ বালি পাচার করত, ময়ূরাক্ষীর বুক খুঁড়ে পরিবেশ বিপন্ন করে তুলত, তাদেরই ডেরায় এবার হানা দিল পুলিশ। মাফিয়াদের রাজপ্রাসাদ থেকে উদ্ধার হল বস্তা বস্তা নগদ টাকা আর ভরি ভরি সোনা। এতদিন যে খাঁকি উর্দির চোখের সামনে এই অবাধ লুট চলত, সেই পুলিশেরই এই আচমকা ‘সিংহ বিক্রম’ দেখে জেলাজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। তবে এই ধড়পাকড়কে স্বাগত জানিয়েও সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন— এই তৎপরতা কি শুধুই মাঠের চুনোপুঁটিদের খাঁচায় পোরার জন্য, নাকি ভাগের অঙ্কে গরমিল হওয়ায় অবাধ্য ‘ছানাপোনা’-দের ডানা ছাঁটার খেলা? পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলা পুলিশের তৈরি একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গোপন সূত্রে খবর পেয়ে আচমকাই হানা দেয় মহম্মদবাজার ব্লকের রাজ্যধরপুর গ্রামে। লক্ষ্য ছিল, এলাকার বালি সিন্ডিকেটের তিন প্রধান মাথা— সোহেল শেখ ওরফে রাহুল, রাহুলের মোকাকা লবন শেখ এবং রাহুলের জ্যাঠতুতো ভাই সামিম শেখ। তিনজনেরই একই এলাকায় পাশাপাশি বাড়ি। এদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বালিঘাটগুলি থেকে কোটি কোটি টাকা তোলাবাজি ও অবৈধ কারবার চালানোর অভিযোগ ছিল। ওইদিন প্রথমে সিন্ডিকেট প্রধান রাহুলের বিলাসবহুল বাড়িতে হানা দেয় বিশেষ দল। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার হয় নগদ ২৯ লক্ষ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মূল অভিযুক্ত রাহুল চম্পট দেয়। এরপরই রাহুলের অন্যতম প্রধান সহযোগী লবন শেখের বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। লবনকে না পাওয়া গেলেও তার ঘর থেকে উদ্ধার হয় নগদ ২০ লক্ষ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা এবং প্রায় ৫০৩ গ্রাম ওজনের সোনার গয়না। দুই মূল অভিযুক্ত বেপাত্তা হলেও, এলাকা ঘেরাও করে অপর অভিযুক্ত সামিম শেখকে হাতেনাতে পাকড়াও করতে সমর্থ হয় পুলিশ। সব মিলিয়ে নগদ ৪৯ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা এবং আধ কেজিরও বেশি সোনার গয়না সহ সামিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃতকে জেলা আদালতে পেশ করে চারদিনের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। বীরভূমের বালি সিন্ডিকেটের দুনিয়ায় ‘রাহুল’ পরিচিত নাম। অথচ মজার বিষয় হল, কোনো বালিঘাটের সরকারি ইজারা বা লিজ এই রাহুল বা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নামে নেই! যারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারি নিয়মে ঘাট নিতেন, তাদেরও ব্যবসা চালাতে হতো এই মাফিয়াদের হাতে রেখেই। ময়ূরাক্ষীর বুক খুঁড়ে বালি লুটের টাকায় রাহুলের গ্যারেজে উঠেছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি, মাথা তুলেছে রাজপ্রাসাদ। আর এই রাজসূয় যজ্ঞ চলেছে পুলিশ-প্রশাসন আর একশ্রেণির নেতার প্রত্যক্ষ মদতে। মাফিয়া-নেতা-পুলিশের এই লালসার মাশুল দিতে হয়েছে ময়ূরাক্ষী নদী আর তার পাড়ের বাসিন্দাদের। নদীগর্ভে বালি তোলার দৌরাত্ম্যে ভূতুরার মতো একের পর এক গ্রাম ধ্বংস হতে বসেছে। বাসিন্দারা মুখ খুললেই মিলত হুমকি। আজ সেই মাফিয়াদের ঘরে পুলিশের হানা দেখে ভূতুরা গ্রামের মানুষের সাফ কথা, ‘মুখ খোলার জো ছিল না কারও। পুলিশ, প্রশাসন, নেতা, মন্ত্রী— সবাই তো এই পাপের ভাগীদার। আজ যে টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তা তো চুরির মালের সামান্য অংশ মাত্র। আসল চোরেরা তো এখনও ঠান্ডা ঘরে বসে হাওয়া খাচ্ছে।’ সাধারণ মানুষ তাকিয়ে রয়েছে, এই কাঁচা টাকার ভাগ নেওয়া ঠান্ডাঘরের বাবুদের কলার ধরে পুলিশ কবে টান মারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ