নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: তৃণমূলের জমানায় যা ছিল কার্যত অকল্পনীয়, রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেটাই বাস্তব হতে চলেছে। এতদিন যাঁর বিরুদ্ধে আঙুল তোলার সাহস পেত না প্রশাসন, এবার তাঁর বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ নিতে চলেছে পুলিশ। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর এক ইট ব্যবসায়ীর ভাটায় হামলা, ভাঙচুর এবং প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার ইট লুটের ঘটনায় নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের হয়েছে শান্তিনিকেতন থানায়। সেই ঘটনার তদন্তের স্বার্থে এবার বীরভুমের একসময়ের ‘বেতাজ বাদশা’ অনুব্রত মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস পাঠানোর তোড়জোড় শুরু করল শান্তিনিকেতন থানার পুলিশ।
এই আইনি টানাপোড়েনের মূলে রয়েছে কঙ্কালীতলা অঞ্চলের পাথরঘাটার দীর্ঘ ৩৫বছরের পুরনো ইট ব্যবসায়ী তথা বিজেপি সমর্থক শুভেন্দু মণ্ডলের একটি অভিযোগ। তাঁর দাবি, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে তৃণমূল সরকার গঠন করার পরেই অনুব্রতর নির্দেশে এবং কঙ্কালীতলা অঞ্চলের উপপ্রধান মামন শেখের নেতৃত্বে একদল দুষ্কৃতী তাঁর ইটভাটায় তাণ্ডব চালায়। কর্মচারীদের মারধর করে প্রায় ৩০লক্ষ টাকার ইট লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেইসময় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অনলাইনে অভিযোগ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।
ব্যবসায়ী শুভেন্দুবাবুর কথায়, ‘তৃণমূল নেতারা বিভিন্ন সময়ে টাকা দাবি করত। টাকা না দেওয়ায় এবং বিজেপি করার অপরাধে আমার উপর এই হামলা হয়।’ রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই সম্প্রতি শান্তিনিকেতন থানায় নতুন করে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। আর তাতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস পাঠানো শুরু হয়েছে। অনুব্রত মণ্ডলকেও নোটিস পাঠানো হবে। অভিযুক্তরা দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি হবে।
অনুব্রতর রাজনৈতিক মেজাজ ও দাপট জেলাবাসীর চেনা। তৃণমূল জামানায় পুলিশ-প্রশাসনকে কার্যত ‘পকেটে’ পুরে রাখা কেষ্ট মণ্ডলের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও পুলিশ সবসময়ই ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়ে চলেছে। প্রকাশ্য মঞ্চ বা সভা থেকে বিরোধীদের ‘চড়াম চড়াম’ ঢাক বাজানো কিংবা ‘গুড়-বাতাসা’ খাওয়ানোর নিদান ছিল তাঁর বাঁ-হাতের খেল। কিন্তু আশ্চর্য বিষয়, সেইসময় তাঁর টিকি ছোঁয়ার সাহস দেখায়নি কোনো আধিকারিক। বীরভূমের একদা ‘বেতাজ বাদশা’র দাপট এতটাই চরমে উঠেছিল যে, খোদ বোলপুরের আইসিকে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় গালিগালাজ করতেও দু’বার ভাবেননি তিনি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তো দূর অস্ত, অনুব্রতর দাপটের সামনে পুলিশকে কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করতে দেখা গিয়েছিল। তবে এই তদন্তের সদিচ্ছা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে উঠছে নানাবিধ প্রশ্ন। অভিযোগ, একুশের নির্বাচন পরবর্তী হিংসার ঘটনায় শতাধিক মামলা রুজু হলেও পুলিশ আসলে ‘বাছাই’ করে গ্রেপ্তারি চালাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, অনুব্রতর মতো হেভিওয়েট নেতার বিরুদ্ধে কি সত্যিই কড়া পদক্ষেপ করবে পুলিশ, নাকি তলায় তলায় জল মাপা চলছে। রাজনীতির কারবারিদের দাবি, নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে যেভাবে তৃণমূলের বিধায়কদের একাংশ দল ভেঙেছে, সেই একই দোষে অভিযুক্ত অনুব্রতও। সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপিকে ‘সুবিধা’ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন দলেরই পরাজিত প্রার্থী নরেশ বাউরি, উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়রা। বিজেপির বোলপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, তৃণমূল আমলে চলা শোষণ ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে মানুষ এখন সাহস করে মুখ খুলছে। যত বড়ো বেতাজ বাদশাই হোক না কেন, শাস্তি সবাইকেই পেতে হবে। ফাইল ছবি।