নয়াদিল্লি: পেলেট গান, কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ, জটিল ধারায় মামলা— যন্তরমন্তরে দেশের ছাত্র-যুবদের ‘জব্দ’ করতে সরকার ও পুলিশি দমন-পীড়নের তালিকা দীর্ঘ। জেন জি-দের উপর বর্বরতার ক্ষতচিহ্নও স্পষ্ট। একের পর এক প্রমাণ তুলে ধরে সরব বিরোধীরা। ককরোচদের হুমকিতে পড়ুয়াদের উপর মামলা প্রত্যাহার করতে হয়েছে বটে, তবু নিজেদের ‘ধোয়া তুলসিপাতা’ প্রমাণে মরিয়া মোদি সরকার। কিন্তু এরই মাঝে ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তোপ দেগে কেন্দ্রকে অস্বস্তিতে ফেলে দিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুয়ান। তিনি বলেন, ‘‘যন্তরমন্তরে পড়ুয়াদের উপর পুলিশি অত্যাচার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বেদনাদায়কও।’ পুলিশের ক্ষমতা, কর্তব্য, নিরপেক্ষতা নিয়েও রীতিমতো প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতি। পুলিশি ব্যবস্থা কোথাও গিয়ে যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, প্রচ্ছন্নভাবে সেই ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
দিল্লিতে অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস আধিকারিক যশোবর্ধন আজাদের লেখা বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি উজ্জ্বল ভুয়ান। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়েই পড়ুয়াদের বিক্ষোভে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে যথেষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘তরুণ পুলিশ আধিকারিকরা ব্যক্তিগত আক্রোশে বিক্ষোভকারীদের উপরে চড়াও হয়েছেন। এই দৃশ্য দেখে আমরা হতাশ। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও উদ্বেগজনক। পুলিশের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা কাম্য। কিন্তু সেই নিরপেক্ষতাই ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।’ বিচারপতি ভুয়ানের মতে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা আম জনতার অধিকার লঙ্ঘন না করেও আইনশৃঙ্খলা বজার রাখা যায়। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, রাস্তায় লাঠি ও বাঁশি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশকর্মী সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। কারও সঙ্গে কোনো অন্যায় হলে মানুষজন তড়িঘড়ি পুলিশের দ্বারস্থ হন। পুলিশের তরফেও সেই বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে কঠোরভাবে সংবিধান মেনে চলতে হবে। পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে আইনের শাসন বজায় রাখতে হবে। সততা, সাহস, দৃঢ়তা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করতে হবে। বজায় রাখতে হবে পেশাদারিত্ব।
পুলিশি হেপাজতে ক্রমবর্ধমান নির্যাতন, মৃত্যু ও ভুয়ো এনকাউন্টারের ঘটনা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের এই বিচারপতি। তাঁর কথায়, সভ্য সমাজে এই ধরনের মৃত্যু একটি জঘন্য অপরাধ। সরকারি আধিকারিকরাই যদি আইন অমান্য করেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠবে। কোনো সভ্য জাতি তা মেনে নিতে পারে না। পুলিশ গ্রেপ্তার করার সঙ্গে সঙ্গেই কি কোনো নাগরিক তাঁর মৌলিক অধিকার হারিয়ে ফেলেন? প্রশ্ন বিচারপতির।
দিনকয়েক আগে নিট প্রশ্নফাঁসের জেরে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদ প্রসঙ্গে সরব হয়েছিলেন বিচারপতি ভুয়ান। সাফ জানিয়েছিলেন—প্রশ্ন করলে বা ভিন্নমত মত পোষণ করলেই পড়ুয়াদের শাস্তির হুমকি দেওয়া যায় না। এটি অংসবিধানিক। এবার পুরো পুলিশি ব্যবস্থাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন তিনি। বিরোধীদের একাংশের কথায়, রাজধানীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নিয়ন্ত্রণে থাকা দিল্লি পুলিশ বহুদিন ধরে অন্যায় অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারপতির বার্তা কার্যত বেআব্রু করে দিল কেন্দ্রের প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা সেই পুলিশকে।