Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / বিনোদন

মেরা উও সামান লওটা দো..

প্রযোজক জে বি ওয়াদিয়া ১৯৩৭ সালে একটি সিনেমা তৈরি করলেন। ‘নওজওয়ান’। গানহীন সিনেমা। মুখ থুবড়ে পড়ল সেই ছবি

মেরা উও সামান লওটা দো..
  • ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রযোজক জে বি ওয়াদিয়া ১৯৩৭ সালে একটি সিনেমা তৈরি করলেন। ‘নওজওয়ান’। গানহীন সিনেমা। মুখ থুবড়ে পড়ল সেই ছবি। সবেমাত্র সিনেমায় সংলাপ, আবহসংগীত, গানের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ভিড় উপচে পড়ছে এই নতুন মিরাকল দেখতে। অথচ এমন সময় গান ছাড়া সিনেমা? ফ্লপ করল। আর সিনেমা জগৎ বুঝে গেল, সাধারণ মানুষ গান চায়। চারের দশকে সিনেমার গানের এই জয়যাত্রার কারণে সবথেকে বেশি ধাক্কা খেল নাটক ও থিয়েটার। ভেঙে পড়েছিলেন মারাঠা ব্রাহ্মণ পরিবারের এক সংগীতশিল্পী—দীনানাথ মঙ্গেশকর। তাঁর মঞ্চ, আর থিয়েটারের গান শুনতে আর যেন আগ্রহ নেই। আয় কমছে। হতাশ দীনানাথ ভাবছিলেন, বড়ো মেয়েকে এখনই মঞ্চে আনবেন না। কিন্তু আর উপায় নেই। মেয়ে এল মঞ্চে। নাম, লতা মঙ্গেশকর। ক্রমে সেই মেয়ে সিনেমা থেকেও ডাক পাচ্ছে। ১৯৩৩ সালে জন্ম হওয়া আর এক মেয়েকেও একদিন আনবেন তিনি মঞ্চে। আশা। 

Advertisement

এগিয়ে আসছে পাঁচের দশক। পুরানো স্টাইলের গানও আর চলছে না। চাই নতুন কিছু। সেই সময় লাহোর থেকে বম্বে হাজির হলেন আবদুল রশিদ কারদার। শুরু করলেন নতুন প্রযোজনা সংস্থা ও গানের স্টুডিও। তারা চায় নতুন গান, নতুন কণ্ঠ। চারজন নতুন মানুষ সেই আশা পূরণ করলেন। নৌশাদ, মজরুহ সুলতানপুরী, সুরাইয়া এবং মহম্মদ রফি।  
১৯৪৯ সালে এই প্রোডাকশন হাউসের সিনেমার একটি গান জগৎ জয় করল—‘সুহানি রাত ঢল চুকি’। কিন্তু বম্বে টকিজ এই নতুন সূর্যোদয়ে কি অস্ত যাবে? তারা একটি সিনেমা তৈরি করল।—‘মহল’। গুলাম হায়দার ক্ষেমচাঁদ প্রকাশকে বলেছিলেন, ওই মেয়েটিকে সুযোগ দিন। ক্ষেমচাঁদ সুযোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে সেই সিনেমার গানও বিশ্বজয়ের সূত্রপাত করল... ‘আয়েগা, আয়েগা আনেওয়ালা আয়েগা’। জন্ম হয়েছিল নতুন দুই স্টারের মহম্মদ রফি ও লতা মঙ্গেশকর। 
ঠিক ওই বছরেই একদিকে যেমন লতা মঙ্গেশকর ভারতসম্রাজ্ঞী হওয়ার ঘোড়ায় চাপলেন, মাথায় বজ্রপাত হল। প্রিয় বোন আশা তাঁরই প্রাইভেট সেক্রেটারিকে বিয়ে করে চলে গিয়েছে। কখন এই ভালবাসা হল? লতা টেরও পাননি। তিনি যে প্রবল কষ্ট পেলেন তাই নয়, ক্রুদ্ধ হলেন। আর ১৬ বছরের আশা মঙ্গেশকর সেই গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করে হলেন আশা ভোঁসলে। আর প্রবেশ করলেন চরম বেদনাময় জীবনে। আশা ভোঁসলে সেই স্বামীর ঘর পরিত্যাগ করে ফিরলেন নিজের পরিবারে। এবং শুরু হল তাঁর দ্বিতীয় সংগ্রাম। 
লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্ত এবং শামশাদ বেগম। সংগীত পরিচালকদের কাছে আবার কী চাই? এই তিন নক্ষত্র তো আছেনই! অতএব আশা ভোঁসলেকে ওঙ্কারপ্রসাদ নায়ার বললেন, ‘এঁদের মতো করে গাইবে না।’ ১৯৫২ সালে ‘ছম ছমা ছম’ সিনেমায় তাই তিনি বললেন, নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। তিনটি গান গাইলেন আশা। সফল। ১৯৫৬ সালের সিআইডি সিনেমার গানে শামশাদ বেগম ও মহম্মদ রফির মধ্যে তাঁর কণ্ঠ যেন ঢেকে যাচ্ছে! আশা দাবি করলেন, ‘আবার রেকর্ড করুন।’ ও পি নায়ারের কাছে। ‘আমার সেরাটা দিতে হবে।’ সামান্য অংশেই আশা প্রমাণ করলেন, তিনি থাকতে এসেছেন। ‘নয়া দৌড়’ ছবিতে ঠিক এই ত্রিমূর্তিকেই নায়ার আবার নিলেন। প্রতিটি গান সুপারহিট। হিন্দি সিনেমার গান ক্রমেই যেন অনুভব করল, শুধু লতা, গীতা, শামশাদ নন। এসেছে নতুন এক জলতরঙ্গ।
‘নও দো গ্যায়ারা’ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক শচীন দেববর্মন। তিনি পুত্রকে বললেন, ‘আশা আসবে, ওকে এই সুরটা তুলে দিতে হবে। ভালো করে শুনে নিবি।’ আশা ভোঁসলেকে পিতার তৈরি করা সুরের মহড়া দেওয়া ঠিক কোন মাহেন্দ্রক্ষণে শুরু করেছিলেন পুত্র রাহুল দেববর্মন? কারণ, ওই মাহেন্দ্রক্ষণ ভারতীয় সংগীতের এক অমৃতসুধা যাত্রার সূচনার সূত্রপাত ঘটালো। তখনও কেউ জানে না যে, সাতের দশক থেকে কী বিস্ফোরণ ঘটবে এই যুগলবন্দিতে! ছয়েক দশকের মাঝামাঝি থেকেই আশা ভোঁসলের কণ্ঠকে শ্রোতা খুঁজতে হয়নি। তাই ‘মেরা সায়া’ ছবির সুপারহিট গান যতই হোক ‘তু জাহাঁ জাহাঁ চলেগা’... লতা মঙ্গেশকরের সেই মেগাহিটকে চিরকালীন আধুনিক থাকার ম্যারাথনে হারিয়ে দিয়েছে আশা ভোঁসলের ‘ঝুমকা গিরা রে’। আজও হিট।
রাহুল দেববর্মনের হাত ধরে আশা ভোঁসলের গান হিন্দি সংগীত দুনিয়াকে যে বিনোদনের উড়ান দিয়েছে, সেই আকাশে ‘পিয়া তু আব তো আজা’ অথবা ‘দুনিয়া মে লোগো কো’ নয়, সাতরঙা প্রজাপতিরা উড়েছে। যে প্রজাপতিদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক পরাগ সিঞ্চন হল ‘মেরা কুছ সামান’, ‘খালি হাত শাম আয়ি হ্যায়’। বাংলার পুজোর বছরের পর বছর ধরে বাতাস অপেক্ষা করে থাকত, দু‌ই জুটির প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য। একদিকে সলিল চৌধুরী ও লতা মঙ্গেশকর। অন্যদিকে আশা ভোঁসলে রাহুল দেববর্মন। ২০টি ভাষায় ১২ হাজার গান। ২০১২ সালে অভিনয়ে প্রবেশ। আর পডকাস্টে অভিষেক ৯১ বছরে।
তিনি বলেছিলেন, ‘সুরে ছন্দ নেই, এতো ভাবতেও পারি না।’ বাঙালি অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে যুগ যুগান্ত ধরে অপেক্ষা করবে, কখন আশা ভোঁসলে সত্যিই আবার একদিন বলে উঠবেন—‘ফিরে এলাম দূরে গিয়ে...’! 

সম্পর্কিত সংবাদ