নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: শিল্পীর কল্পনা আর শিল্পের আধার কত কিছুকে যে আশ্রয় করে তার হদিশ মেলা ভার। প্রতিদিনের জীবনে যেগুলি তেমনভাবে নজর পড়ে না এমন অনেক কিছুই পুজো মরশুমে বর্ণময় আধার হয়ে ওঠে থিমের। তখন দেখে চমক লাগে। নবীন থেকে প্রবীণরা গালে হাত দিয়ে ভাবেন, এমনও হয়! আসলে উমার আগমন ধ্বনিতে পল্লবিত হয় প্রকৃতি। তেমনই দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলে কল্পনা। শিল্পীর মনসমুদ্রেও শুরু হয় মন্থন। তৈরি হয়, প্রতিদ্বন্দ্বী পুজো উদ্যোক্তাকে দেখিয়ে দেওয়ার তীব্র আবেগ। ফলশ্রুতি, থিমের উপকরণ হয়ে ওঠে এক্স রে প্লেট থেকে হারাতে বসা পাটকাঠি আর পাট। শিল্পীর কল্পনার উৎসমুখ ঠেলে আকার নেয় ‘পাটের ইতিকথা’, ‘রঙের হাট’এর মতো থিম।
হুগলির ব্যান্ডেল জনবসতির বিচারে ‘মিনি ভারতবর্ষ’। বাঙালির সেরা উৎসবে সেখানে বেশ কয়েকটি বিগ বাজেটের পুজো হয়। তার মধ্যে অন্যতম কেওটা নবীন সঙ্ঘের পুজো। এবারে পুজো উদ্যোক্তারা রঙের ধাঁধা তৈরি করতে চেয়েছেন। আর তাই পুজো মণ্ডপে এসে জুটেছে লাখো এক্স রে প্লেট, হাজারে হাজারে চুড়ি। গোটা মণ্ডপ নানা রঙের মায়াময় আধার করে তুলতে সেসব ব্যবহার হচ্ছে। আর থাকবে আলো। এক বিশেষ রকমের আলোকসজ্জা। তাতে দিনে আর রাতে দু’টি ভিন্ন চেহারায় ধরা দেবে মণ্ডপসজ্জা। জানা গিয়েছে, মণ্ডপের ছাদ তৈরিতে ব্যবহার করা হবে কাচের চুড়ির সাজ। আর দেওয়াল গড়ে উঠছে হাজার হাজার রকমারি এক্স রে প্লেট দিয়ে। বিশেষভাবে তাতেই পড়বে আলো, তৈরি হবে আলোর কাব্যিক ঝরণাধারা। মজা হচ্ছে, শিল্পকৌশলের আধুনিক নমুনা পেশ করলেও মণ্ডপে দেবী থাকবেন সাবেক সাজে। ডাকের সাজ আর সাবেকি প্রতিমার সেই অবয়ব তৈরি করছেন কৃষ্ণনগর থেকে আসা মৃৎশিল্পী। পুজো উদ্যোক্তা গৌতম দাস বলেন, ‘আমাদের রঙের হাট থিম এবার আক্ষরিক অর্থেই দর্শকের মনে রংমশাল জ্বেলে দেবে।’
গঙ্গাপাড়ের সাবেক শ্রীরামপুরজুড়ে একদিন বেড়ে উঠেছিল চটকল। বাংলার পাট হয়ে উঠেছিল স্বর্ণতন্তু। সে এখন অতীত। কিন্তু পুজো মরশুম তো অতীতচারণারও কাল। তাই শ্রীরামপুর নিউগেট সর্বজনীনের এবারের থিম, ‘পাটের ইতিকথা’। পাটকাঠি আর পাটের তন্তু দিয়ে তৈরি মডেলে সাজবে মণ্ডপ। অন্দর থেকে বাহিরসজ্জা সর্বত্রজুড়ে থাকবে পাটের জন্মকথা আর তার বাহারি প্রয়োগের ইতিহাস। কার্যত পাটের একটি মিউমিজিয়ামের আদল পেতে চলেছে নিউগেটের নবতম আয়োজন। পুজো উদ্যোক্তা সংবীর চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সাবেক আদলের প্রতিমা আর থিমের সঙ্গে মানানসই আলোকসজ্জা থাকবে।’
পুজো মানেই চিরচেনা জনপদের আচমকা অচেনা হয়ে ওঠা। চারদিনের সেই চাঁদনি, হরেক চমকের উজ্জ্বল ছটার টানে ছুটে আসে জনস্রোত। এআই যুগে এসেও শিল্পীর কল্পনার তাজমহলে তাই প্রতিদিন চাপছে নিত্যনতুন পরত। এগিয়ে আসছে দশভুজার দর্শনকাল, মায়ানগরী হয়ে উঠছে গঙ্গাপাড়ের চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর।