প্লেজিয়ারিজম অতীত! এআই দিয়ে লেখানো গবেষণাপত্র নিয়েই চিন্তা
  • ৫ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: টুকলি করে গবেষণাপত্র লেখা নতুন কিছু নয়। প্রয়াত কিছু স্বনামধন্য শিক্ষাবিদের বিরুদ্ধেও এসব অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই কুম্ভীলকবৃত্তির একটি গালভরা নাম রয়েছে, প্লেজিয়ারিজম। উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে বেশ কিছু সফ্টওয়ার ব্যবহার করে এতদিন সহজেই এটি ধরে ফেলা যাচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল করে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এখন গবেষণাপত্র লেখা হচ্ছে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। যা ধরতে গিয়ে চিরাচরিত সফ্টওয়ারগুলি চ্যালেঞ্জর মুখে পড়েছে। ফলে চুরি করা গবেষণাপত্র ধরা পড়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।

Advertisement

প্লেজিয়ারিজম ধরার বেশ কিছু ফ্রি সফ্টওয়ার রয়েছে। তবে সেগুলি গবেষক মহলে তেমন ভরসাযোগ্য নয়। এর পাশাপাশি আইথেনটিকেট, টার্নইটইন, গ্রামারলি বা ক্যুইলবটের মতো সফ্টওয়ার রয়েছে। আইথেনটিকেট বা টার্নইটইনের সাবস্ক্রিপশন অনেক বেশি হওয়ায় এগুলি সাধারণত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক লাইসেন্স নেওয়া থাকে। তবে উচ্চমানের সফ্টওয়ারগুলিও পড়েছে সমস্যায়। এক গবেষক বলেন, ‘এআই দিয়ে লেখা পেপার ধরতে নামী সফ্টওয়ারগুলি নিজেদের পরিবর্তন করছে। কিছু এআই কম্পোনেন্ট এতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও অনেক সময় ফলস অ্যালার্ট দিচ্ছে। মৌলিক লেখাকেও প্লেজিয়ারিজম বা এআই টেক্সট বলে দেগে দিচ্ছে। এতে আরও সমস্যা হচ্ছে।’ একইভাবে প্লেজিয়ারিজম ধরতে বাজারচলতি ফ্রি এআই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করেন কেউ কেউ। সেগুলি কিছুটা টুকলি ধরতে পারলেও চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে লেখা অনেকসময় চিহ্নিত করতে পারে না।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক সনাতন চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘গবেষণাপত্র লেখার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। না হলে গবেষকদের মৌলিকতা, সৃষ্টিশীলতা এবং সর্বোপরি মেধার ব্যবহার পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে।’ তিনি জানান, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন ফ্যাকাল্টিতেই এআই ব্যবহার করে গবেষণাপত্র লেখা চলছে। কেউ কেউ ফাঁকি দেওয়ার জন্য টেকনিক্যাল কিছু শব্দ পরিবর্তন করে দিচ্ছে। বিকল্প শব্দটি হয়তো সেক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। তাতে অর্থই পালটে যাচ্ছে। প্লেজিয়ারিজম ধরার দামী সফ্টওয়ারগুলি লাইব্রেরির অধীনে থাকত। সেখানেই গবেষণাপত্র পাঠিয়ে দেখে নেওয়া হত। এখন তা নেই। অনেক অধ্যাপকই নিজেদের যোগাযোগ খাটিয়ে বিদেশে বা ভিন রাজ্যে থাকা বন্ধু বা ছাত্রছাত্রীদের কাছে গবেষণাপত্র পাঠিয়ে চেক করিয়ে নেন। কারণ, বিদেশের প্রতিষ্ঠানগুলিতে এই সফ্টওয়ারগুলি জলভাতের মতো। ব্যক্তিগতভাবেও সাবস্ক্রাইব করে রাখেন অনেকে। তবে এটা সমাধান নয়।’
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক অমিতাভ গুপ্ত বলেন, ‘কিছুদিন আগেই মাস্টার ডিগ্রির এক ছাত্রের পেপারে দেখলাম, প্রায় ৪২ শতাংশ এআই দিয়ে লেখা। তাকে আবার তা নতুনভাবে লিখতে বলা হয়েছে।’ তবে তাঁর দাবি, লাইব্রেরিতে সফ্টওয়ার রয়েছে। ইউজিসির মধ্যেমে ইনফ্লিবনেটের মতো সফ্টওয়ারের অ্যাকসেসও রয়েছে। তাই পরিকাঠামো সমস্যা নয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই লাইব্রেরি সায়েন্সের অধ্যাপক গৌতম মাইতি বলেন, ‘এআই দিয়ে লেখা গবেষণাপত্রে এমন কিছু সাইটেশন দেওয়া হচ্ছে বা সোর্স লেখা হচ্ছে, যেগুলির বাস্তব অস্তিত্বই নেই। অর্থাৎ, মূল বিষয় এক রেখে কিছু কাল্পনিক তথ্যসূত্র যোগ করে দিচ্ছে এআই। তা অবশ্য ধরা পড়ছে।’ তবে বুদ্ধি করে প্রম্পট দেওয়া গবেষণাপত্র লিখে অনেকটাই ফাঁকি দেওয়া সম্ভব বলে আশঙ্কা তাঁর। পুরো গবেষণাপত্র পড়ে বিভিন্নভাবে তথ্য যাচাই করেই এই চুরি ঠেকানো সম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।