Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

পুজোর সময় মা দুর্গার নিখুঁত মুকুট, মহরমে সুদৃশ্য তাজিয়া, শোলাশিল্পী সমরেন্দ্রনাথের ঘরে সম্প্রীতির চিত্র

সমরেন্দ্রনাথ দে। বয়স ৭০। মহরমের সময় তাজিয়া বানান। দুর্গাপুজোর সময় তৈরি করেন প্রতিমার মুকুট। মুসলমানরা বলেন, দে বাবুর মতো এত ভালো তাজিয়া কেউ বানাতে পারেন না।

পুজোর সময় মা দুর্গার নিখুঁত মুকুট, মহরমে সুদৃশ্য তাজিয়া, শোলাশিল্পী সমরেন্দ্রনাথের ঘরে সম্প্রীতির চিত্র
  • ৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া:  সমরেন্দ্রনাথ দে। বয়স ৭০। মহরমের সময় তাজিয়া বানান। দুর্গাপুজোর সময় তৈরি করেন প্রতিমার মুকুট। মুসলমানরা বলেন, দে বাবুর মতো এত ভালো তাজিয়া কেউ বানাতে পারেন না। হিন্দুরা বলেন, সমরবাবুর তৈরি মায়ের মুকুট সবার সেরা। সমরবাবু হিন্দু না মুসলমান কেউ জিজ্ঞাসা করে না। উল্টে বলে, দেশজুড়ে যখন অসহিষ্ণুতার বীজ ছড়ানোর কাজ চলছে তখন সম্প্রীতির পতাকা পতপত করে ওড়ে সমরবাবুর ঘরে। সে পতাকার তলায় এসে নিশ্চিন্তে বসেন হিন্দুরা, মুসলমানরাও।

Advertisement

পাঁচলার বিকিহাকোলা গ্রামের গ্রামের মালাকারপাড়ার অনেকেই লালনের গান গুনগুন করেন-‘কেউ মালা, কেউ তসবি গলায়, তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়, যাওয়া কিংবা আসার বেলায় জেতের চিহ্ন রয় কার রে।’ এই এলাকারই মানুষ সমরেন্দ্রনাথ। ছোট থেকে শুনে এসেছেন, শিল্প ধর্মের বেড়াজাল ভাঙে। প্রকৃত শিল্পীর কাজ ভেদাভেদ ভুলিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। কাঁপা হাতে নকশা ফোটাতে ফোটাতে সমরবাবু বলেন, ‘মায়ের মুকুট যেমন বানাতে পারি। তেমনই তাজিয়াও বানাই।’ ৪০ বছর ধরে মহরমের তাজিয়া বের করেন হাবিব খান। ছোটবেলা থেকে দেখছেন পাড়ার পুজোয় ঠাকুরের জন্য শোলার কাজ করতেন সমরবাবু। নিখুঁত সে কাজ। তা দেখেই তাজিয়ার বরাত দেন হাবিব। তিনি বলেন, ‘আগে মেটিয়াবুরুজ থেকে তাজিয়া বানিয়ে আনতে হতো। তাও সে কাজ মনের মত হতো না। দে বাবুর মতো হাতের কাজ কোথাও দেখিনি। এখন দশবছর ধরে দে কাকুই আমাদের তাজিয়া বানিয়ে দিচ্ছেন।’ স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘সমরেন্দ্রবাবু আমাদের মালাকার পাড়ায় শোলা শিল্পের শেষ প্রদীপ। সম্প্রীতির আলো তিনিই ছড়িয়ে দিচ্ছেন আমাদের দিকে।’ কয়েক প্রজন্ম ধরে কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী রাসমেলার রাসচক্র বানিয়ে আসছেন আলতাফ মিঞারা। আর হাওড়ার পাঁচলার সমরেন্দ্রনাথবাবুর তৈরি তাজিয়ায় মহরম পালন করছেন হাবিবরা। গোটা বাংলা এ কারণেই লালনের গানে গলা মেলায়, এখন তো আরও বেশি করে গায়-‘জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা, সত্য কাজে কেউ নয় রাজি, সব দেখি তা না না না...’
পাঁচলার বাসিন্দারা জানান, একসময় পাড়াজুড়ে শোলা শিল্পীদের রমরমা ছিল। ঘরে ঘরে তৈরি হতো শোলার মুকুট, কারুকার্যপূর্ণ অলঙ্কার, টোপর, চাঁদমালা, মণ্ডপের সামগ্রী। ধীরে শোলার জায়গা নেয় থার্মোকল। আধুনিক মেশিন এসে যাওয়ায় শিল্পীদের কদর যায়। বর্তমানে পাড়ায় একমাত্র সমরেন্দ্রবাবু একাই পূর্বপুরুষের পেশাকে আঁকড়ে রেখেছেন। এক সময় বড়বাজার থেকে কাঁচামাল আনতেন। বয়সের কারণে এখন যেতে পারেন না। এরপর থার্মোকলের কাজ শেখেন। দীর্ঘদিন পুজোর মণ্ডপে থার্মোকলের কাজ করছেন। বর্তমানে বয়স ৭৩। এখন বাড়িতে বসেই শোলা ও থার্মোকল দিয়ে পুরনো শিল্পকলা ফুটিয়ে তোলেন বৃদ্ধ। 
বর্ষার বিকেলে সমরেন্দ্রবাবু বসে ইসলামিক ধাঁচের শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তুলছেন থার্মোকলে। গড়ে উঠছে তাজিয়া। মহরমের বরাত এসেছে অনেক ক’টি। শেষ মুহূর্তে তারই ব্যস্ততা চলছে। একটু আক্ষেপ নিয়ে বললেন, ‘শোলার কাজ করেই ছেলেমেয়েদের বড় করেছি। ওরা অবশ্য বাবার পেশায় এল না। যতদিন বেঁচে আছি আমিই করে যাব।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ