বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: কদিন আগে স্বাস্থ্যদপ্তরের কর্তার কাছে হাজির এক মধ্যবিত্ত বাবা-মা। মেয়ে চার লক্ষ র্যাঙ্ক করেছেন নিটে। খুব ইচ্ছা, ওই মেয়েকে ডাক্তার করেন তাঁরা। অগত্যা বিরাট টাকার ব্যাংক লোন নিয়ে রাজ্যের একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে ম্যানেজমেন্ট কোটার আসনে ভরতি করিয়েছেন। খরচ কোটি ছাড়িয়ে! কিন্তু সেই প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ আবার একবারে চারটি সেমেস্টারের টিউশন ফি চাইছে। একবারে ৪০ লক্ষ টাকা! দেবেন কীভাবে? কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বাবা। অগত্যা স্বাস্থ্যদপ্তরের ওই কর্তা ফোনাফুনি করে কলেজকে ধমক দিয়ে বিষয়টির সমাধান করে দেন। পাশাপাশি ওই অসহায় পিতাকেও বলেন, মেয়ে নিটে আর একবার চেষ্টা করলেই তো পারত। সরকারি কলেজে হয়ে গেলে এই বিরাট চাপ নিতে হত না আপনাকে। এরপর বাকি জীবনটা তো আপনি লোনেই ডুবে থাকবেন। এমন ঘটনা যেমন আছে, তেমনই নিজের সীমার অনেক বাইরে গিয়ে ডাক্তারি পড়াতে ইচ্ছুক এমন বাবা-মায়ের সংখ্যা ইদানীং তেমন বাড়ছে না, বরং কমছে। এজন্যই বাংলার ৩৯টি মেডিকেল কলেজে (সরকারি ২৫, প্রাইভেট ১৪) শেষ রাউন্ডের কাউন্সেলিং শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বাংলায় ১৭৫টি এম বি বি এস আসন ফাঁকা পড়ে আছে। সবগুলিই প্রায় প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের ম্যানেজমেন্ট কোটার। বি ডি এস বা ডেন্টাল আসন ফাঁকা আরও ৬টি।
দীর্ঘদিন রাজ্যের মেডিকেল শিক্ষার নজর রাখা সিনিয়র মানুষজন বলছেন, এত মেডিকেল কলেজ চালু করে হবে কী? ছেলেমেয়েরা এম বি বি এস পাশ করে শেষমেশ খেতে পাবেন তো? চাহিদার থেকে অনেক বেশি সংখ্যক ডাক্তার তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি নিরাপত্তার চাকরি কজন পাবেন? কজনই-বা পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে মোটা টাকার প্যাকেজ? বড়ো জোর ৫ থেকে ১০ শতাংশ। বাদবাকিদের মধ্যে যাঁরা কোটি টাকা খরচ করে ডাক্তারি পড়েছেন, পাশ করার পরে খরচের টাকা সৎভাবে তুলতে পারবেন তো? যেভাবে কলেজ খুলছে হুড়মুড় করে, পরে সেভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে না তো? সেই আশঙ্কাও করছেন অনেকে। ডাঃ প্রতাপচন্দ্র রেড্ডির মতো বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের দিকপাল ব্যক্তিত্বের অবশ্য দাবি, দেশে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর চাহিদা প্রচুর। কিন্তু পরিকল্পনা এমনভাবে করতে হবে যাতে ১০০ জন চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি হলে ২০ শতাংশ দেশের চাহিদা মেটাতে পারেন। ৮০ শতাংশ সারা পৃথিবীতে হাসপাতাল ক্ষেত্রে নিয়োজিত হতে পারেন। তবে বাস্তব জানাচ্ছে নির্মম কিছু তথ্যও। দেশে বর্তমানে ‘মেডিকেল শিক্ষার রাজধানী’ বলে পরিচিত দক্ষিণ ভারতেই গাদা গাদা এম বি বি এস আসন ফাঁকা! ওই অঞ্চলে এম বি বি এস আসন ফাঁকার খতিয়ানটি এইরকম: চেন্নাইয়ের সত্য সাঁই মেডিকেল কলেজে ১৮৮, শ্রীবালাজিতে ৮২, কাঞ্চিপুরমের মীনাক্ষী মেডিকেল কলেজে ১১৭ এবং পুদুচেরির মাহাত্মা গান্ধী মেডিকেল কলেজে ৯২। দীর্ঘদিন সরকারি এবং একাধিক প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত অধ্যাপক ডাঃ প্রদীপ মিত্র বলেন, ব্যাঙের ছাতার মতো প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ খোলার পরিণতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হতে পারে। তামিলনাড়ুতে এম বি বি এস আসন সংখ্যা সাড়ে ১০ হাজার। তার ২০ শতাংশই ফাঁকা থাকছে!



