


বিশেষ নিবন্ধ, সমৃদ্ধ দত্ত: ত্যেকদিন সকাল ৯টার সময় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের নাগরিক জীবন স্তব্ধ হয়ে যায়। এক মিনিটের জন্য। যে যেখানে আছে, তারা দাঁড়িয়ে পড়ে। নীরবতা পালন করে। সমস্ত ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হয়ে যায়। প্রত্যেকটি গাড়ি স্টার্ট বন্ধ করে দেয়। ২০২২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত রাশিয়ার মিসাইল, ড্রোন, রকেট লঞ্চার, বোমায় যত ইউক্রেনবাসী ও সৈনিকের মৃত্যু হয়েছে এবং হয়ে চলেছে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও শোকজ্ঞাপনের জন্য এই আশ্চর্য নিয়ম পালন করে চলেছে কয়েক বছর ধরে কিয়েভের বাসিন্দারা।
প্যালেস্টাইনের সিংহভাগ পিতা-মাতা তাদের বালক বালিকা সন্তানদের হাতে, পায়ে উল্কি দিয়ে নাম লিখে দেয়। গাজা স্ট্রিপের রাস্তার পাশে অসংখ্য মানুষ বসে থাকে শিশুদের হাতে পায়ে নাম লেখানোর পেশায়। সেখানে জড়ো হয় অভিভাবকরা। কেন? কারণ যেকোনো মুহূর্তে ইজরায়েলের আক্রমণ হবে এবং বিস্ফোরণ অথবা মিসাইল হানায় পরিবার ছিন্নভিন্ন ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। যদি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাওয়া মৃতদেহের মধ্যে সন্তানদের বিক্ষিপ্ত শরীর থেকে বোঝা না যায় যে, নিজের সন্তান কোনটা! তাই হাতে ও পায়ে নাম লেখা থাকে আগে থেকেই। যদি পা উড়ে যায়, তাহলে অন্তত হাত থাকবে। যদি হাত উড়ে যায়, তাহলে অন্তত পা থাকবে। তাই হাত ও পা, দুই অঙ্গেই নাম লেখা হয়।
লেবাননের ৩ লক্ষ ৬০ হাজার বালক
বালিকার স্কুল থেকে স্কুলে স্থানান্তর ঘটছে। পড়াশোনার জন্য নয়। একটি করে স্কুল ধ্বংস হচ্ছে। বিস্ফোরণ অথবা মিসাইল হানায়। আবার অন্য স্কুলে যেতে হচ্ছে। স্কুল মানে এখন আর লেবাননে বিদ্যালয় নয়। শেল্টার। আশ্রয়।
ইয়েমেনের গ্রামের পর গ্রামে সন্তানদের গাছের পাতা সিদ্ধ করে খাওয়ানোর পর তেঁতুল জাতীয় একটি তরল তৈরি করা হয়। জল সীমিত। এই তরল খাওয়ানোর সুবিধা হল একটি স্বাদে টক। এবং খেলেই অম্বল হয়ে যায়। তাহলে এই পাতা সিদ্ধ করে আবার ওই তরল খাওয়ানোর কারণ কী? কারণ অম্বল হয়ে গেলে অনেকক্ষণ খিদে পাবে না। বাচ্চারা কাঁদবে না খাবার চেয়ে। ইউনিসেফ কর্মীরা সারাদিনে একবার আসবে। সকালে। খাবারের প্যাকেট দিয়ে যাবে। সেই খাবারে পরিবারের সকলের চলে না। প্লাস্টিকের শিটের নীচে গ্রামের পর গ্রাম থাকে। ইয়েমেনে অন্তহীন গৃহযুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিঃশব্দে এভাবে মেরে ফেলছে প্রতিদিন।
এই দেশগুলিতে যুদ্ধ চলছে। কবীর সুমন তাঁর একটি গানে লিখেছিলেন, ‘আসল যুদ্ধ যেন সিরিয়াল দেখা/অ্যাকশন খুব জীবন্ত খুনোখুনি/দেখছে মানুষ সপরিবারে বা একা/ধর্ষণটাও দেখা যাবে এক্ষুনি…’। ইরানের উপর ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ আক্রমণ, লেবাননে আচমকা ইজরায়েলের মিসাইল নিক্ষেপ। মোসাদ বনাম ইরান রিভলিউশনারি গার্ডের নিরন্তর অ্যাকশন দেখতে দেখতে ভারতের সিংহভাগ নাগরিক অনেক সময় একটা থ্রিলারের মতো অনুভব করে। উত্তেজনা তৈরি হয়। তারা জানে না একটি যুদ্ধ অথবা গৃহযুদ্ধ ঠিক কতটা ধ্বংস করে দিতে পারে একটি প্রাচীন সভ্যতাকে।
কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নিছক সেখানেই যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকছে এমন নয়। এই যুদ্ধ যদি চলতে থাকে ভারতের উপর বিপুল বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অর্থনীতি একপ্রকার খাদের কিনারায় চলে যাবে। পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ব্যস্ত। সকলেই আলোচনা করছে কোন রাজ্যে কী হবে সেটা নিয়ে। অর্থাৎ একদিকে যুদ্ধের অ্যাকশন নিয়ে টানটান উত্তেজনা, ইরান না আমেরিকা? কে হাসবে শেষ হাসি? আবার অন্যদিকে বিজেপি বনাম বিরোধী। পাঁচ রাজ্যে কোথায় কে হাসবে শেষ হাসি। বাংলায় এই উত্তেজনার আবহে অতিরিক্ত এক চর্চা এসআইআর। লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে বাদ দেওয়া হচ্ছে ভোটার তালিকা থেকে। বৈধ ভারতবাসীকে ‘অবৈধ’ করে দেওয়া হচ্ছে! যাদের অবৈধ নাগরিকে পর্যবসিত করা হচ্ছে তাদের মনের অবস্থা বৈধ তালিকায় প্রবেশ করা নাগরিকবৃন্দ কি বুঝতে পারে? নাগরিক প্রতিবাদ নেই কেন? অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পক্ষে কেউ সওয়াল করবে না। কিন্তু বৈধ নাগরিকদের নিছক রাজনৈতিক কারণে অনাগরিক করে দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে কেন? এরা কিন্তু আমাদের সহনাগরিক।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আড়ালে এক মহাযুদ্ধ চলছে আমাদের সকলের চোখের আড়ালে। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার না পেয়ে দিল্লি, নয়ডা, মুম্বই, পুণে এবং ছোটো শহরগুলি থেকে অসংখ্য
পরিযায়ী শ্রমিক কাজ হারিয়ে ফিরে যাচ্ছে নিজেদের বাড়িতে। মহারাষ্ট্রের ভিওয়ান্ডি অথবা উত্তরপ্রদেশের কানপুর। অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে রাস্তায় রাতে ঘুমাতে। কেন? কারণ গ্যাসের সাপ্লায়ারদের দোকানের সামনে লাইন দিতে হচ্ছে সারা রাত। পূর্ব দিল্লিতে ৩ হাজার টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে গরিব মানুষকে। দুদিন…তিনদিন না খেয়ে কাটিয়ে বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরছে পরিযায়ীরা। কেন? কারণ যেখানে তারা কাজ করে সেখানে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে কারখানা কিংবা দোকান রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এদিকে বাসস্থানেও সিলিন্ডার নেই। দিনের পর দিন বাইরের দোকান থেকে কিনে খাবার খাওয়ার সামর্থ্য নেই। দিল্লি ও মুম্বই স্টেশনে মিডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এইসব পরিযায়ী শ্রমিককে কাঁদতে দেখা গিয়েছে।
এই প্রতিটি দৃশ্য ভীতিজনক। কেন? কারণ বারংবার প্রমাণ হচ্ছে যে, ভারত সরকার ক্রাইসিস সামলাতে ব্যর্থ। করোনাকালে ঠিক এটাই হয়েছিল। অক্সিজেন নেই। ওষুধ নেই। হাসপাতালে বেড নেই। পরিযায়ীদের জন্য বাহন নেই। কর্মসংস্থান নেই। সেই সময় আজ যে সামাজিক শ্রেণি মোবাইলে সারাক্ষণ যুদ্ধের অ্যাকশন দেখে দেখে আনন্দ উত্তেজনা পাচ্ছে, তারাই ব্যালকনিতে থানা বাজিয়েছিল। রাতে লাইট জ্বালানো নেভানো করেছে।
যুদ্ধ হচ্ছে, জ্বালানি আসার পথ বন্ধ। সরকার কী করবে? সরকারের পক্ষে এই যুক্তি যারা দিচ্ছে, তাদের প্রশ্ন করতে হবে, তাহলে সরকার কেন এতদিন ধরে বলেছে যে কোনো সংকট নেই? আমেরিকা ইরানকে আক্রমণ করবে সরকার জানত না? ট্রাম্প তো আগাম ঘোষণা করে পদক্ষেপ করেন। তিনি বেশ কিছু মাস ধরে বলে চলেছেন যে, ইরানকে শিক্ষা দেবেন। তাহলে সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে জ্বালানি নীতি আগাম নেওয়া উচিত ছিল না ভারতের? আমরা বিদেশনীতিতে কোনো দূরদৃষ্টি দেখতে পাচ্ছি না কেন?
অন্য দেশের জ্বালানি সংকট এবং ভারতের সংকট কি এক? ১৪৬ কোটি জনগণ কোথায় আছে? আর কোন উন্নত দেশের লক্ষ লক্ষ বালক বালিকা মিড ডে মিলের উপর নির্ভরশীল? সেই মিড ডে মিল বন্ধ বহু স্কুলে। বিনামূল্যে ৮২ কোটি মানুষ চাল গম পেয়ে সেই শস্য রান্না করবে কীভাবে? উজ্জ্বলা গ্যাসের সংযোগ কোন কাজে লাগছে? করোনাকালে অক্সিজেনের জন্য লাইন। তার আগে নোট বাতিলের লাইন। সিলিন্ডারের জন্য লাইন। এসআইআর ফর্ম জমা দেওয়ার লাইন। সরকার মানুষের জীবনকে মসৃণ করার পরিবর্তে অস্থির করে দিয়ে চলেছে। এটাই ব্যর্থতার উদাহরণ।
সাম্প্রদায়িক বিভাজন অথবা এসআইআর। রাম নবমী হলেই অস্ত্র মিছিলের মাধ্যমে এক ভীতিকর পরিবেশ। এসব তো ছিল না এতকাল! মানুষের জীবন অস্থির করে দেবেন না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কাদের পার্থক্য কিন্তু সুস্থিরতা। ভারত ৮০ বছর ধরে সুস্থির। সে নিয়ম করে ভোট দিয়েছে। ভারতে গণতন্ত্র আছে। সেই গণতন্ত্রই সবথেকে বড়ো শক্তি। সেটা যে কত বড়ো আশীর্বাদ সাধারণ জীবনযাপনে, ভারতবাসীর অনেকে বুঝতে পারে না। তারা গণতন্ত্রকে ক্যাজুয়ালি নেয়। যারা গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি তারা জানে যে গণতন্ত্র কত দামি।
তাই ভারত সরকারকে আবেদন, বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখুন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, গৃহযুদ্ধে জীর্ণ হওয়া দেশ, গণতন্ত্রহীন ভারতের প্রতিবেশী দেশ। সাধারণ মানুষের কী অপরিসীম দুর্দশা চলছে। তাই মানুষকে অযথা সংকটে ফেলবেন না। চেষ্টা করুন জীবনযাপনকে কীভাবে আরও একটু সহজ সরল করতে সাহায্য করতে পারেন। পাশে দাঁড়ান। মানুষকে ক্রমাগত বিপদের দিকে ঠেলে দিলে, মানুষ কিন্তু নিঃশব্দে সরে যাবে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ফলাফলকে মাথায় রাখুন! শত এসআইআর, শত কেন্দ্রীয় বাহিনী, শত নির্বাচন কমিশন, কোনো লাভ হয় না, মানুষ যদি বিপক্ষে চলে যায়।