


কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভা কেন্দ্র খানিক হেঁয়ালির মতো। এখন বৈশাখে রাজারহাটে আম পাকছে। মধু বোসের বাগানের আমচাষি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এবার ফলন ভালো হবে। আপনারা, শহরের মানুষরা কম দামে পাবেন।’ একটু দূরে নিউটাউনের বহুতল থেকে আম পাকার গন্ধ পাচ্ছেন আইটি কর্মী, কাচে ঢাকা ১০ তলা অফিসের জানলায় দাঁড়িয়ে। নাম লিখতে বারণ করলেন। বললেন, ‘প্রকৃতিকে কাছে পাই বলে এই অফিসে আসতে এত ভালো লাগে।’ রাজারহাটের পাথরঘাটায় জমিতে চাষ করে ভাত খেতে দুপুরে বাড়ি ফিরলেন কৃষক রসুল আহমেদ। বললেন, ‘সেচের জল একটু কম পাই গরমে।’ এর কিছু দুরেই নিউটাউনের সাপুরজি আবাসনে স্যান্ডউইচ আর কোল্ড ড্রিংকস দিয়ে লাঞ্চ সারছেন পলাশ মল্লিক। বললেন, ‘ব্র্যান্ডেড ড্রেসের শো রুম নিউটাউনে আরও কয়েকটি বলে ভালো।’ একরের পর একর কৃষি জমি, একের পর এক আমবাগান, অগুন্তি ভেড়ি, ছোটো-বড়ো-মাঝারি পাকা বা টালির চাল বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের বাড়ি নিয়ে রাজারহাট পঞ্চায়েত সমিতি গঠিত পাথরঘাটা, রাজারহাট-বিষ্ণুপুর (১) এবং (২), চাঁদপুর, জ্যাংড়া-হাতিয়ারা (২) এই পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে। ঠিক তার গা ঘেঁষে বিশাল বহুতল, ফাইভ স্টার হোটেল, অভিজাত ক্লাব, গলফ কোর্ট, রেস্তরাঁ, শপিং মল, কোটি টাকা দামের গাড়ি মাঠের মতো বড়ো রাজপথ দিয়ে চলাচল করে। এই হল এনকেডিএ অথিরিটির অধীনে থাকা নিউটাউন। দুই গা ঘেঁষে থাকা জনপদের এই বৈপরিত্য হেঁয়ালির মতোই লাগে। এই বিপরীত সহাবস্থানকে বেঁধে তৈরি হয়েছে রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভা। এছাড়াও রয়েছে বিধাননগর পুরনিগমের ১১ টি ওয়ার্ড। ১ নম্বর ওয়ার্ডের বড়োগাঁতি এলাকার তাপসী ওঁরাও বলেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকায় মেয়েকে কম্পিউটার শেখাই।’ পুর অঞ্চলে এখন শহুরে উন্নয়নের ছোঁয়া। তবে পুর পরিষেবা নিয়ে সবাই যে সন্তুষ্ট এমন নয়।
২৯ তারিখ এই বিধানসভার ভোট? কে জিতবেন? তিনি জিতলে কেন জিতবেন? যাঁরা হারবেন তাঁরা কেন হারবেন? সে প্রশ্নেই মশগুল এখানকার ৩ লক্ষ ২৬ হাজারের মতো ভোটার। (এটি জানুায়ারি ২০২৬ এর হিসাব। তারপর এসআইআরে বাদ গিয়েছে কমবেশি ২৪ হাজারের মতো নাম।)
রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী তাপস চট্টোপাধ্যায়। (২০২১’এর বিধানসভায় এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন প্রায় ৫৬ হাজার ভোটে) তিনি খুব একটা কথা বলেন না। মৌন থেকে কাজ করা পছন্দ। ঘরে ঘরে পৌঁছে মানুষের খোঁজখবর করেন। ভোট থাকলেও করেন। না থাকলেও করেন। তাঁর বক্তব্য, ‘সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে আমি মানুষের সঙ্গে থাকি। মানুষও আমার সঙ্গে থাকেন।’ তাঁর উল্টোদিকে বিজেপির হয়ে দাঁড়িয়েছেন পীযূষ কানোরিয়া (এবার নতুন)। তিনি চরিত্রে তাপসের উল্টো। অনর্গল গরম গরম কথা বলেন। এবং এই অবাঙালি মানুষটি হিন্দি-বাংলার ফোয়ারা ছুটিয়ে যে কোনো পরিস্থিতিতে উত্তেজনা তৈরি করতে ওস্তাদ। তাঁর বক্তব্য, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছি। পরিবর্তন চাই।’ তাঁদের বিপরীতে সিপিএমের সপ্তর্ষী দেব (২০২১ সালে তাপসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরাজিত হন)। তিনি গৌতম দেবের পুত্র। নিউটাউন উপনগরীর রূপকার হিসাবে গৌতম দেবতে অধিকাংশ মানুষ কৃতিত্ব দেন। সপ্তর্ষী দৌড়চ্ছেন। নিউটাউনের মাটিতে বাবা যে অ্যাডভান্টেজ পুঁতে দিয়ে গিয়েছিলেন তার ফসল তোলার জন্যই ছোটাছুটি। তাঁর বক্তব্য, ‘এলাকার পরিষেবা মজবুত করব। সরকারি হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, গণপরিবহণের উন্নতির ব্যবস্থা হবে।’ এই মাটি আর একজনও চষছেন। তিনি হলেন সপ্তর্ষীদের একদা জোটসঙ্গী কংগ্রেসের সেখ নিজামুদ্দিন (নতুন প্রার্থী)। রাজারহাটের বিস্তীর্ণ জমি অধিগ্রহণ করে গৌতম দেবের সিপিএম তৈরি করেছিল নিউটাউন। সেই অঞ্চলের জমিহারা মানুষদের হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়েছিলেন নিজাম। তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের জন্য বিজেপি-তৃণমূল কেউ কাজ করেনি। তাঁদের এবং জমিহারাদের স্বার্থরক্ষার জন্যই আমার লড়াই।’ একনজরে এই হল রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভার প্রার্থী পরিচিতি। এই প্রার্থীরাই হচ্ছেন সেই প্রজা যাঁদের কোনো একজনকে ভোটে জিতিয়ে আনবেন তাপস চট্টোপাধ্যায়ের রাজারা।
নিউটাউনে এখন সিন্ডিকেট সেভাবে সক্রিয় নয়। নিউটাউন এবং রাজারহাট একই বিধানসভা অঞ্চল হলেও এই দুই অংশের মানুষের দাবিদাওয়া এক নয়। নিউটাউন চায় ভালো ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, সরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ুক। আরও আধুনিক হাসপাতাল, এসি বাস এবং সন্ধ্যার পর সব বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, ব্লকের ভিতরের রাস্তা মেরামত, পার্ক সংস্কার, দুর্ঘটনা কমুক ইত্যাদি। নিউটাউন রেসিডেন্স ওয়েলফেয়ার ফোরামের সম্পাদক সমীর গুপ্ত বলেন, ‘ব্লকে ব্লকে কমিউিনিট হল হওয়ার দরকার।’ উল্টোদিকে রাজারহাট ভাবে, রেকজোয়ানি হাসপাতালটি ঠিকঠাক করলে বেঁচে যাই। না হলে সেই আরজি কর বা নীলরতন নিয়ে যেতে হয় রোগীকে। গ্রামের ভিতরের রাস্তার সম্পূর্ণ সংস্কার চান তাঁরা। পুকুর সংস্কার চান। চাষের জন্য সেচ ব্যবস্থা ঠিকঠাক হোক, মাছ চাষের উপযোগী করে তোলা হোক জলাশয়, যাত্রী পরিবহণের সংখ্যা বাড়ুক এবং পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পরিষেবার কথা বলে রাজারহাট। চাঁদপুরের স্বপন বারুই বলেন, ‘স্বাস্থ্যসাথীর জন্য বিনা পয়সায় অপারেশন করাতে পেরেছি।’ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রবীর কর বলেন, ‘ রাস্তাঘাটের বিপুল উন্নতি হয়েছে। রাজারহাট নামেই পঞ্চায়েত, দেখলে মনে হল পুরসভা এলাকা।’
এখানে বসবাস করেন ৪২ শতাংশ সংখ্যালঘু। হিন্দু ৫৮ শতাংশ। (এসআইআরে আগের হিসাব। বিএলও সূত্রে জানা গিয়েছে, এসআইআরে কমবেশি ৬০ শতাংশ মুসলমান এবং ৪০ শতাংশ হিন্দু নাম বাদ গিয়েছে)। রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভা বারাসত লোকসভার অধীন। ২০২৪ সালের লোকসভার নিরিখে নিউটাউন বিধানসভায় তৃণমূলের কাকলি ঘোষ দস্তিদার এগিয়ে ছিলেন ২৮ হাজার ৪১৭ ভোটে। কিন্তু জ্যাংড়া-হাতিয়ারা, চাঁদপুর পঞ্চায়েত ও এনকেডিএ এলাকায় বিজেপি এগিয়ে ছিল ৪ হাজার ৬৯৩ ভোটে। প্রসঙ্গত জ্যাংড়া এলাকা মতুয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত। তবে এসআইআরে নির্বিচারে নাম বাদ যাওয়ায় সে ভোট এখন তৃণমূলের দিকে আসার সম্ভাবনা বেড়েছে বলে বক্তব্য অধিকাংশ মতুয়ার।