


অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: হুগলি জেলায় বেশ কিছু সমৃদ্ধ নগরী আছে। তার মধ্যে চন্দননগর, উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর সর্বদাই থেকেছে জনচর্চায়। কিন্তু নিভৃতে রয়ে গিয়েছে পাণ্ডুয়া। মঙ্গলকাব্য ধারা থেকে বাস্তবের রাজা এবং সুলতানি সাম্রাজ্যের শিকড় আছে পাণ্ডুয়ায়। যদিও আধা শহুরে এই জনপদ নিজেকে প্রকাশ করেনি। তবে এই নীরবতাপ্রিয় জনপদে ভোট রাজনীতির ওঠাপড়া প্রকাশ্য। সেই ইতিহাস দেখলে পাণ্ডুয়াবাসীর বর্তমান আওয়াজ বোঝা কঠিন নয়।
এমনটাই বলেন রাজনীতির ভাষ্যকাররা। তাঁদের মতে, একদা গরিব পাণ্ডুয়ায় মসিহা হয়েছিল বামেরা। তারপর স্বভাবের মতোই নীরবে বদলেছে পাণ্ডুয়া। মাকর্সবাদের লড়াই মাছ-ভাতে এসে ঠেকেছে। গরিবের নয়া মসিহা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। মাছ-ভাতটা বেশ সহজে হজম হয়। তাই পাণ্ডুয়ায় স্থায়ী ভিত্তি গড়েছে তৃণমূল, ঘাসফুল। বিগত ১৫ বছরের ইতিহাস তার সাক্ষী। ২০০৯ সাল, লোকসভা নির্বাচন। পাণ্ডুয়ায় সিপিএম পেয়েছিল ৪৭.৯৩ শতাংশ ভোট আর তৃণমূল ৪২.২৮ শতাংশ। পরবর্তী ১৩ বছরে তৃণমূল কখনও ৪১ শতাংশের কম ভোট পায়নি। গত লোকসভা নির্বাচনে ঘাসফুল পেয়েছে ৪৭.৩২ শতাংশ ভোট, যা তৃণমূলের পক্ষে সর্বোচ্চ। উল্লেখ্য, তৃণমূল কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ হতে পারবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলের দ্বিধা ছিল। কিন্তু পাণ্ডুয়া সেসব ভাবেনি। আবেগ উজাড় করে দিয়েছে। অথচ, ২০১১ সালে বাংলায় সবুজ ঝড়েও সিপিএম জিতেছিল পাণ্ডুয়ায়। ২০১৬ সালেও বদল আসেনি চরিত্রে। দু’বারই তৃণমূল ৪৩ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল এবং ভগ্নাংশের ব্যবধানে হেরেছিল। রাজনৈতিক মহল বলে, ঘাসফুলের শিকড় মজবুত হলেও মাছ-ভাতের লড়াইয়ে লাল না সবুজ, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিল জনতা। এই দ্বিধা কেটেছে দু’টি ঘটনায়। একটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক প্রকল্প আর অন্যটি বামেদের রামভক্তি। আজ থেকে ১২ বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে পাণ্ডুয়ার মানুষ প্রথম দেখতে পায়, সেখানে বিজেপির ৮-১০ শতাংশ ভোট আছে। আরও অবাক হয়ে তাঁরা দেখেন, পাণ্ডুয়ার বিধায়কের দল অর্থাৎ সিপিএমের ভোট ততটাই কমেছে, যতটা বিজেপি পেয়েছে। এই সমীকরণই পাণ্ডুয়াকে নাড়িয়ে দেয় ২০১৬ সালে। সেবার দেখা যায়, বিজেপির ভোট কমেছে, আর তাতেই সিপিএম বাজিমাত করেছে। পাণ্ডুয়া ওইদিনই যেন শপথ নিয়েছিল, মাছে-ভাতেই ভরসা রাখবে। পরিণাম, ২০২১ সালে পাণ্ডুয়ায় প্রথম ঘাসফুল ফোটে। আর পিছনে ফেরেনি শাসকদল। ২০২১ সালে পেয়েছিল ৪৬ শতাংশ ভোট। পরবর্তী লোকসভা ভোটে সেই হার আরও বেড়েছে।
এমন অঙ্কে বেজায় খাপ্পা পাণ্ডুয়ার বিজেপি প্রার্থী তুষার মজুমদার। তিনি বলেন, পরিসংখ্যান দিয়ে ভোট হয় না। মানুষ এবার সব বদলে দেবেন। বামপ্রার্থী আমজাদ হোসেন প্রাক্তন বিধায়ক। একটু শান্তস্বরে বলেন, বিজেপির খেলা পাণ্ডুয়া বুঝে ফেলেছে। এবার ওসব হবে না। তুষারে যেমন ‘ঠান্ডা’ নেই, তেমনই আমজাদের ‘মহিমা’ হারিয়েছে। কিন্তু ‘সমীর’ অর্থাৎ বাতাস বইছে পাণ্ডুয়ায়। মৃদুমন্দ নয়, প্রবল। তাতেই ফুটছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুরুর দিনের সৈনিক। ঘাসফুল প্রার্থী সমীর চক্রবর্তী বলেন, গোলেমালে হরিবোল আর হবে না। পাণ্ডুয়ার মানুষ উন্নয়নের স্বাদ পেয়েছেন। তাই তৃণমূলই ভরসা, বাকি সব ফরসা।
মানুষ কি বলছে? জামনার গোহমি গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এবারের ভোটে মানবধর্ম পালন করতে হবে। তাই তৃণমূলের পক্ষে থাকব। তিন্নায় বাজার করতে এসেছিলেন অর্চনা ক্ষেত্রপাল। গরিব, মাঝবয়সির গলায় ঝাঁঝ। বলেন, রাম-বামের কাটাকুটির পাত্র আমরা নই। শান্তি চাই, উন্নয়নও। গরিবের দল তৃণমূলই। অন্তত মাছে-ভাতে রাখে। হ্যাঁ, ঠিক ভাবছেন। মৌন-মুখর পাণ্ডুয়ার নারীর কণ্ঠে ‘আমার সন্তান থাকুক দুধেভাতে’র স্বরই আছে। আর আছে মাছ-ভাতের লোক হয়ে ওঠার ধারাকথন।