নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: দশভুজার চিরপরিচিত গড়ন এখানে মিলবে না। দেবীকে সপরিবারে পুজো করার চল বাঙালির নিজস্ব। বাঙালির উমা তো শিবানী। অর্থাৎ শিব ও শক্তির মহামিলনের ঐতিহ্য বহন করছে। তাই এক গ্রাম্য দুর্গা তাঁর পতি শিবের সঙ্গে পুজো নেন। পতির সঙ্গী হয়ে পুজো নেন বলেই তিনি পরিচিত ‘পতিদুর্গা’ নামে। বিরলদর্শন সেই দুর্গার পুজো হয় পলাশি গ্রামে। সিরাজদৌল্লার পতনের পলাশি নয়, এই পলাশি হুগলির ধনেখালির এক প্রত্যন্ত গ্রাম। বিরল গড়নের দেবীর মতো পুজো সম্পর্কিত আরও একাধিক বিষয় আছে যা বিস্ময় জাগায়। পতিদুর্গার পুজো শুরু কবে হয়েছে পলাশিতে তার বিশেষ লেখাজোকা মেলে না। কিন্তু এক নিভৃত গ্রামের ততধিক নিভৃত মন্দিরে বিরলদর্শনা দেবী পূজিতা।
কেউ বলেন, প্রায় নয় কি দশ পুরুষ আগে শুরু হয়েছিল পুজো। কেউ আবার হিসেবের খেরোর খাতা খুলতেই পারেন না। সময়ের অঙ্ক কষার থেকে বেশি আকর্ষক একগুচ্ছ তথ্য পুজো ঘিরে আছে। বঙ্গজুড়ে থিমের দাপট, সরকারি অনুদানের বাহুল্য থাকা সত্ত্বেও হুগলির ধনেখালির পলাশি গ্রামে আর একটিও দুর্গাপুজো হয় না। এ গ্রামে দুর্গা মানেই পতিদুর্গা। আরও আছে। দেবী, শিবের সঙ্গে একাসনে বসেন। তিনি দশভুজাও নন। মহিষাসুর সংহারকও না। তাঁর সঙ্গে থাকেন জয়া, তাঁর সঙ্গিনী। পদতলে থাকে সিংহ। আর শিব থাকেন বটুক ভৈরবকে নিয়ে। তাঁর পদতলে থাকে ষাঁড়, নন্দী অবতার।
দেবীর পুজো প্রণালীও বেনজির। সবচেয়ে বড় বদল পুরোহিতে। দেবীকে কোনও ব্রাহ্মণ পুজো করেন না। কিন্তু পুজো হয় শাক্তমতে। শুরুর কাল থেকে ‘পতিদুর্গা’র পুজোর পূজারি অন্ত্যজ শ্রেণির কোনও মানুষ। বংশপরস্পরায় ‘পতিদুর্গা’র পুজো করছেন এক চর্মকার পরিবারের কোনও সদস্য। পুজোর বর্তমান পুরোহিত উত্তম পণ্ডিত। তিনি বলেন, ‘আমরা হাড়ি সম্প্রদায়ের। প্রায় আট পুরুষ আগে আমাদের পরিবারের সদস্যরাই এই পুজো শুরু করেছিলেন। শোনা যায়, তাঁরা স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। আমি নিজে পুজো করছি ৩০ বছর ধরে। ব্রাহ্মণের কাছ থেকে শিখেছি পুজো প্রণালী।’
হুগলির এক্কেবারে শেষ প্রান্তে পলাশি। জল আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা ছিল সে গ্রাম। সে সময়ে রাতে তো বটেই দিনেও পথে প্রান্তরে গা ছমছম করত। সেখানকার বাসিন্দাদের অনুমান, সে কালেই কোনও এক সময় গ্রামীণ পতিব্রতাদের জন্য হয়ত ‘পতিদুর্গা’র পুজো শুরু হয়েছিল। বিরল, বেনজির দুর্গাকে ঘিরে জনশ্রুতি, বহু কল্পকথা। দেবীর মন্দির আছে। পুজো হয় মাটির মূর্তিতে। শোনা যায়, গ্রামবাসীরা একবার ভালোবেসে পাথরের মূর্তি গড়েছিলেন। তার পুজোও হয়েছিল। কিন্তু কোনও রাতে কেউ তা ভেঙে দিয়ে যায়। তারপর হাজার চেষ্টা করেও আর স্থায়ী মূর্তি গড়া হয়নি। গ্রামের মানুষ আর কখনও পাথরের মূর্তি গড়ার প্রয়াস করেননি।
এসব চর্চার পালে পুজো এলেই হাওয়া এসে ধাক্কা দেয়। তেমনই চর্চায় আসে, দেবী মহা জাগ্রত। কিন্তু সেসব শুধুই মানুষের চর্চা। পুজোর চারদিন সামান্য হইচই ছাড়া প্রত্যন্ত এক ‘গ্রামীণ’ দেবী তার স্বরূপের মতোই বিরল ও প্রান্তিক হয়েই থেকে যান।