Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্যাথি আগে না সুস্থতা আগে?

রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বা পুনর্গঠনসহ ৩০০’র বেশি ধরনের অপারেশন এবং ১২০টির বেশি যন্ত্রের ব্যবহার। সুতরাং আয়ুর্বেদ নাম শুনলেই যাঁরা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন, তাঁরা কী বলবেন?

প্যাথি আগে না সুস্থতা আগে?
  • ১ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ দাস: একটি আলাপচারিতা 

Advertisement

 আপনার কাছে যত রোগী আসেন, কত শতাংশ হোমিওপ্যাথিও করেন? 
—৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ 
 কী মনে হয়, চিকিৎসকদের কত শতাংশ বাড়িতে হোমিওপ্যাথি করেন? 
—কমপক্ষে ১০ শতাংশ তো হবেই
 কত শতাংশ রোগীকে আপনারা আয়ুর্বেদিক বিভিন্ন রেমিডি এবং যোগ অভ্যাস করার কথা বলেন?
—আয়ুর্বেদিক রেমিডি কি না বলতে পারব না। তবে ঠান্ডা লাগলে, ইনফেকশন হলে ভাপ নেওয়া, গার্গেল করা—এইসব বলি। সপ্তাহে ৪-৫ দিন ব্যায়াম করার কথা তো সবাইকে বলি। মানসিক স্থিরতার জন্য ধ্যান বা মেডিটেশন, ওবেসিটি কমাতে হাঁটাহাঁটি, এগুলো ৮০-৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে তো বলিই। 
 জ্বরজারি, পেট খারাপ বা ছোটোখাটো সমস্যায় একবার মডার্ন মেডিসিনের ডাক্তার দেখিয়ে সমস্ত টেস্ট করিয়ে চিকিৎসা শেষ করতে একজন রোগীর কেমন খরচ পড়ে?
—প্রায় ৫ হাজার টাকা। ডাক্তারের ফিজ, টেস্টের খরচ, রোগ পরীক্ষার খরচ সব মিলিয়ে। হাসপাতালে ভর্তি হলে সেটা লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
 ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিনের ভবিষ্যৎ কেমন? 
—প্রত্যেক প্যাথির সীমাবদ্ধতা এবং জোর আছে। কাছাকাছি আসলে ক্ষতি কি!
উৎসের সন্ধানে
এক নামকরা ওষুধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক বলছিলেন, ‘মানতে চান বা না চান, আজকের মডার্ন মেডিসিনের সিংহভাগ ওষুধই এসেছে ভেষজ থেকে। তাই তো ফার্মাকোলজি’র আর এক নাম ভেষজবিদ্যা। হ্যাঁ, আগে গাছপাতার রস বা অংশবিশেষ থেকে ওষুধ তৈরি হত। এখন ল্যাবরেটরিতে তার কেমিক্যাল কম্পোজিশন থেকেই ওষুধ তৈরি হয়ে যায়। তা বলে সত্য মিথ্যা হয়ে যায় না। যত ধরনের ওষুধ বাজারে আছে, ৭০ শতাংশেরই উৎস ভেষজ গাছপালা।’
ম্যালেরিয়ার সাম্প্রতিক ওষুধের গল্প
বিশুদ্ধতাবাদীদের গলায় কাঁটার মতো আটকতে পারে, কিন্তু এইমুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া ড্রাগ আর্টিমেসিলিন তৈরি হয়েছে চীনা ভেষজ থেকেই। 
অসংখ্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধেরও উৎস হল আয়ুর্বেদিক ভেষজ। তবে তৈরির পদ্ধতি আলাদা। যেমন কালোজাম থেকে সেজিজিয়াম। থানকুনি থেকে হাইড্রোকোটাইল। সর্পগন্ধা থেকে রাউলপিয়া। শুনে যে কেউ থম মেরে যেতে পারেন! 
সুশ্রুতকাহিনি
কিংবদন্তি কাশী-বাসী সার্জন সুশ্রুতের কথাই বা মর্ডান সার্জারি ভুলবে কীভাবে? প্লাস্টিক সার্জারির জনকই বলা যেতে পারে তাঁকে। করেছিলেন নাকের সার্জারি রাইনোপ্লাস্টি। রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বা পুনর্গঠনসহ ৩০০’র বেশি ধরনের অপারেশন এবং ১২০টির বেশি যন্ত্রের ব্যবহার। সুতরাং আয়ুর্বেদ নাম শুনলেই যাঁরা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন, তাঁরা কী বলবেন? 
পার্সোনাল মেডিসিন
আর হোমিওপ্যাথির নাম শুনলেই যাঁদের গা পিত্তি জ্বলে, তাঁরাই আজকে অ্যালোপ্যাথিতে পার্সোনালাইজড মেডিসিন বা আলাদা রোগীর আলাদা চিকিৎসার কথা বলছেন! তাঁরা কি জানেন, সেই চিকিৎসা তো আবার হোমিওপ্যাথির মূল কথা। রোগের নয়, রোগীর চিকিৎসা। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তার জনক ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান নিজেই ছিলেন একজন অ্যালোপ্যাথ। ‘সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার’। ‘যা রোগের কারণ, তাই রোগের নাশ করে’।  
তাদের কাছাকাছি এনেছিল করোনা
করোনার সময় গার্গলের লাভ নিয়ে সমীক্ষা হয়েছিল তখনকার অন্যতম বড়ো কোভিড হাসপাতাল এম আর বাঙুরে। আবার হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আর্সেনিক অ্যালবা শহর ও শহরতলির হাজার হাজার মানুষকে প্রতিরোধমূলক ওষুধ হিসেবে খাওয়ানো চলল। তাতে দারুণ ফলও মিলল। 
টিকা চলল। আর্সেনিকও চলল। কোভিড ১৯ টাস্ক ফোর্সে আয়ুষের বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি এলেন আইসিএমআর, সিএসআইআর-এর সিনিয়র বিজ্ঞানীরাও। 
হার্ট অ্যাটাকও আটকাবে ধ্যান? 
দেশের এক নম্বর চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস)। সেখানে রীতিমতো গবেষণা চলছে হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে ধ্যানের ভূমিকা এবং হাইপ্রেশার কমাতে যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।
জেদাজেদি কেন? গোঁ ধরা কেন? 
যে কথাগুলি কিছু গোঁ ধরে থাকা মানুষ বুঝছে না, যুক্তি দিয়ে বোঝালেও বুঝবে না, সেগুলি অল্প কিছু, সামান্য কিছু মানুষ বুঝতে পেরে গিয়েছে। শুধু বুঝতেই পারেননি, তাঁরা নিজেদের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছেন। কদিন আগেই ফোনে কথা হচ্ছিল দক্ষিণবঙ্গের এক উদীয়মান তরুণ অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকের সঙ্গে। বললেন, চিকিৎসা পরিষেবার ভবিষ্যৎ হল ইন্টিগ্রেশন। মানুষ সুস্থ হতে চায়। একটা সময়ের পর কোন প্যাথি, সেদিকে ভ্রুক্ষেপই করে না। প্র্যাকটিস করে যেটুকু জমাতে পেরেছি, আর যা চেনা জানা লোকজন আছে, একটা ইন্টিগ্রেটেড হাসপাতাল খোলবার খুব ইচ্ছা। 
স্বপ্নপূরণের কাহিনি
তিনি যখন স্বপ্ন দেখছেন, আরেকজন বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক নিজের স্বপ্ন পূরণে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে সম্প্রতি চালু হয়েছে রাজ্যের প্রথম প্রাইভেট ইন্টিগ্রেটেড হাসপাতাল। অ্যালোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি, যোগা, আয়ুর্বেদ—সবই থাকছে একই ছাদের তলার। তাঁর সোজা কথা হল, গোঁ ধরে থাকলে চলবে না। ‘মিলেমিশি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’। 
ছোট্ট প্রাণকে বাঁচানোর স্বার্থে 
একটি দুধের শিশুর সারা মুখ ইঁদুরের কামড়ে ছিন্নভিন্ন হওয়ার পর যত্নসহকারে নাক, গাল, মুখের বিভিন্ন অংশ পুনগর্ঠন করবার পর রাজ্যের এক নম্বর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের বিনয়ী প্লাস্টিক সার্জন নতনম্র স্বরে বলেছিলেন, ‘যদি ধন্যবাদ দিতে হয় সুশ্রুতকে দিন। আমাদের অপারেশন আড়াই হাজার বছর আগে তিনি করে গিয়েছেন। আমরা শুধু আধুনিক রূপ দিচ্ছি মাত্র।’
পাথর ছুড়ে কী লাভ? 
এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি ধারাভির মানুষকে করোনাকালে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার অঙ্গ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল আর্সেনিক অ্যালবা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথি’র সেই গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা আর্সেনিক খান, তাঁদের অনেকেরই করোনা হয়নি। করোনা হলেও তীব্রতা ছিল অনেকটাই কম। তাই একে অন্যের দিকে পাথর ছুড়ে লাভ কী? মডার্ন মেডিসিনের দম্ভের অন্যতম হাতিয়ার হল অ্যান্টিবায়োটিক। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলির একটি। সেই অ্যান্টিবায়োটিকেরই তো রেজিস্ট্যান্সের দাপটে পুনঃ মূষিক ভব অবস্থা!
প্যাথি আগে না আগে সুস্থতা?
দিনের শেষে মানুষ চান সুস্থ হতে। যতটা সম্ভব কম খরচে। শরীরকে ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কষ্ট যতটা সম্ভব কম দিয়ে। ফলদায়ী গাছ ঝুঁকে থাকে। বিনয়ী হয়। তাই পরবর্তী দশক বরং হোক বিভিন্ন প্যাথির কাছাকাছি আসবার দশক। চিন্তা, ভাবনা, শেয়ারিং-এর দশক। আসুন না উচ্চশিক্ষিত, প্রাজ্ঞ, বহুদর্শী সব প্যাথিরই চিকিৎসককুল, কম খরচে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে নীরোগ থাকবার দিশা দেখান। আসন্ন দশক হোক নতুন কালজয়ী কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের দশক। আয়ুষের বিশ্বব্যাপী প্রসারের দশক। 
একই হাসপাতালে রোগীর মেডিকেল বোর্ডে থাকুন না মডার্ন মেডিসিন ও আয়ুষের চিকিৎসকরা। একই চায়ের টেবিলে পাশাপাশি বসে চার প্যাথির চিকিৎসক তর্কের তুফান তুলুন। কিন্তু শ্রদ্ধা বজায় রেখে। 
সারসত্য হল ‘শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম’। গীতা বলছে, যিনি শ্রদ্ধাশীল, যিনি নিষ্ঠাবান ও সংযতেন্দ্রিয় (ইন্দ্রিয় বশীভূত), তিনিই যে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করবেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ