সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: একসময় বঙ্গ সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর কৃষ্ণনগরে পটচিত্রের ছিল বাংলাজোড়া নাম। কাগজ, কাপড় এবং মাটির উপর রঙের ছোঁয়ার ফুটে উঠত রামকথা থেকে শুরু করে নানান লোকগাঁথা। এই শিল্পকলা শুধুমাত্র বিনোদন ও উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরাণ, ইতিহাস আর সমাজ জীবনের দলিল হয়ে উঠত।
একসময়ে দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে জগদ্ধাত্রী পুজো এমনকি নানা অনুষ্ঠানেরও এই শিল্পের কদর ছিল। শিল্পীরা সযত্নে হাতে আঁকতেন রামায়ণ-মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণলীলা থেকে বিভিন্ন দেবতাদের ছবি। গানের সুরে তাল মিলিয়ে ছবিগুলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হত। কিন্তু, আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। অবহেলা, বাজারের চাহিদা না থাকা, মজুরি কমের ফলে নতুন প্রজন্মের শিল্পীর আগ্রহ কমে যাওয়ায় কৃষ্ণনগরের পটচিত্র শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায়।
স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, আজ থেকে কয়েক দশক আগেও এই শিল্পের রমরমা চাহিদা ছিল। বহু দূর দূরান্ত থেকে অর্ডার আসত। কিন্তু, দিন যত এগিয়েছে মানুষ হাতে আঁকা পটচিত্রের বদলে সস্তার প্রিন্টেড পোস্টার ডিজিটাল ব্যানারের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে ক্রমশ বাজার চাহিদা কমে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই শিল্প। যে কারণে দক্ষ শিল্পীরা বাধ্য হয়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন।
এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের বক্তব্য, এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি উদ্যোগ ভীষণ প্রয়োজন। আগের তৃণমূল সরকার এইদিকে কোনো নজর দেয়নি। নতুন বিজেপি সরকার এসেছে, তাদের কাছে আবেদন এই শিল্পকে বাঁচান। সরকারিভাবে যদি পটচিত্র শিল্প প্রদর্শনী আয়োজন করা যায়, তবে এই শিল্পের প্রচার হবে।
কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত প্রবীণ শিল্পী রেবা পাল বলেন, একসময় কৃষ্ণনগরের পটচিত্র দূরদূরান্তে খ্যাতি অর্জন করেছিল। এখন আর সেভাবে বিক্রি হয় না। আমি ৬০ বছরের বেশি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিগত ১৫ বছর ধরে ক্রমাগত এই শিল্পের অবক্ষয় হতে হতে এখন তলানিতে ঠেকেছে। এখন আমি আর তেমন কাজ করতেও পারি না। নতুন কেউ এই কাজে আসেও না। সরকার এবং বিভিন্ন পুজোকমিটি যদি এগিয়ে না আসে, তবে এই শিল্পকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
উত্তম দাস নামে এক শিল্পপ্রেমী মানুষ বলেন, সরকারিভাবে এই শিল্পের জন্য বিশেষ ভাবনা অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্পীদের আর্থিক সাহায্য ও নতুন শিল্পীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া। নতুন বিজেপি সরকার এই দিকে যদি একটু নজর দেয়, তবেই হয়তো কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র আবারও তার গরিমা ফিরে পাবে।