নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: কয়েক মাস আগের ঘটনা। চাষের জন্য বাঁকুড়া জেলা থেকে গোরু নিয়ে যাওয়া চাষি ও ব্যবসায়ীদের বেধড়ক মারধর করা হয় দুর্গাপুরের গ্যামেন ব্রিজের কাছে। মাথা ফাটানোর পাশপাশি ব্যবসায়ীদের কান ধরে ওঠবোসও করানো হয়। কান ধরে রাস্তায় হাঁটানো হয়। এমনকী, টাকা লুটেরও অভিযোগ ওঠে। সংস্কৃতির শহর দুর্গাপুরের এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হতেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযোগ, বিজেপি যুব মোর্চার রাজ্য কমিটির সদস্য পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই হামলা হয়। দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ভিন রাজ্য থেকে পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
সেই পারিজাতই দুর্গাপুজোর আগে দুর্গাপুরে বিজেপির পোস্টার বয় হয়ে উঠেছেন। শুক্রবার রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ তাঁকে সংবর্ধনা দেন। তাঁকে ছাড়াও সংবর্ধনা দেওয়া হয় ওই ঘটনা পুলিসের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া বাকিদেরও। সনাতনী ঐক্য মঞ্চের ব্যানারে দুর্গাপুরের নিউটাউনশিপ থানা এলাকায় আয়োজিত ওই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন দিলীপ। সেখানে তিনি বলেন, ‘গো-ভক্ত যুবকদের সম্মান জানাতে এসেছিলাম। বেআইনি গোরু পাচারের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছে।’
এখানেই শেষ নয়, বৃহস্পতিবার দুর্গাপুরের বিজেপি নেতাদের উদ্যোগে আয়োজিত একটি পুজোর উদ্বোধনে আসেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর বাড়িতেও যান বিরোধী দলনেতা। অথচ, ওই ঘটনার পর বিজেপির নেতাদের মুখেও নিন্দা, সমালোচনার সুর শোনা গিয়েছিল। এদিন দ্বন্দ্ব ভুলে দলের দুই নেতা পারিজাত ও তাঁর দলবলের পাশে দাঁড়ানোয় হতবাক স্থানীয় মানুষজন। কেউ কেউ গেরুয়া শিবিরের বিশ্বাসযোগত্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছেন।
দুর্গাপুরের প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক বিপ্রেন্দ্রু চক্রবর্তী বলেন,‘পারিজাতের মতো ছেলেদের নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে রুচিতে বাঁধে। দুর্গাপুরের মতো শহরে এই ঘটনা ঘটতে পারে, আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আমরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছি। বিজেপির ওটাই সংস্কৃতি। ওদের দ্বিচারিতা বাংলার মানুষ বুঝে গিয়েছে।’ তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘দুর্গাপুরে হুলিগানিজমকে উৎসাহ দিতেই বিজেপির এই পরিকল্পনা। ধর্মীয় বিভাজন উস্কে দুর্গাপুরকে অশান্ত করতেই পারিজাতদের মুখ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। দুর্গাপুরের মানুষ এর জবাব দেবে।’
পারিজাতকে দুর্গাপুরে এভাবে বিজেপির মুখ করার পিছনে ভোটের অঙ্ক কাজ করেছে বলে রাজনৈতিক শিবিরের মত। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন ৭৬ হাজারের বেশি ভোটে দুর্গাপুর থেকে লিড পেয়েছিল বিজেপি প্রার্থী সুরেন্দ্রসিং আলুওয়ালিয়া। তারপর থেকে তাঁকে শহরের মানুষ সে ভাবে দেখতে পাননি। ২০২৪ সালে তাঁকে এখান থেকে টিকিট দেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি বিজেপি। ২০২১ সালে দুর্গাপুর পূর্বে বিজেপি প্রার্থী করেছিল কর্নেল দীপ্তাংশু চৌধুরিকে। ভোটে হেরে তারপর আর রাজনৈতিক ময়দানে দেখা যায়নি তাঁকে। ২০২৪ সালে দিলীপ ঘোষের মতো হেভিওয়েটও পরাজিত হন লোকসভা ভোটে। ২০১৯ সালের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট বেড়েছে দুর্গাপুরে। পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক, তৃণমূলের তারকা এমপি কীর্তি আজাদ দুর্গাপুর চষে বেড়াচ্ছেন। তৃণমূলের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে পারিজাতদের মতো ‘গো-ভক্ত’দের সামনে আনছে বিজেপি।