


‘আমাদের সেই গ্রামের নামটি ফুলেরা...’। হতে পারে ফুলেরার অবস্থান উত্তরপ্রদেশে। সেখানকার মানুষের ভাষা আলাদা। কিন্তু সেই গ্রাম তো আমাদেরও। পাঁচ বছর আগে এই গ্রামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন শহর থেকে যাওয়া এক পঞ্চায়েত সচিব। সেই শুরু। তারপর থেকে তো ফুলেরার বাসিন্দারা আমাদেরই প্রতিবেশী। তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ঝগড়া— সবকিছুই আমাদের বড় চেনা। ফুলেরার শান্ত, নিস্তরঙ্গ জীবনকে চৌচির করে বেজেছে যুদ্ধের দামামা। পঞ্চায়েত নির্বাচন। একদিকে প্রধানজি ব্রিজভূষণ ও মঞ্জুদেবীর গদি ধরে রাখার লড়াই।
অন্যদিকে, পালাবদলের চেষ্টায় ভূষণ ও ক্রান্তীদেবীর জুটি। সেই লড়াইয়ে জড়িয়ে গিয়েছে সচিবজি, প্রহ্লাদ, বিকাশ, বিনোদরাও। কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে-সেই গল্প নিয়েই হাজির ‘পঞ্চায়েত’ ওয়েব সিরিজের চতুর্থ সিজন। গত তিন সিজনের পর দর্শকের প্রত্যাশা যে তুঙ্গ উচ্চতায় পৌঁছেছিল, তা পূরণের চ্যালেঞ্জ ছিল নির্মাতাদের কাছে। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জকে ছাপিয়ে যেতে পারলেন না তাঁরা। নির্বাচন ঘিরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপে হারিয়ে গেল গল্পের স্বাভাবিক গতি। কয়েকটি মুহূর্ত ছাড়া এবারের সিজন ঘুরল একঘেয়েমির গোলকধাঁধায়। এক এক করে বলা যাক।
এই সিরিজের মূল ইউএসপি সারল্য, সূক্ষ রসবোধ, চরিত্রদের মধ্যে বন্ধন। সারল্যের মাত্রা যে কমবে, তার ইঙ্গিত তৃতীয় সিজনের শেষে মিলেছিল। কিন্তু রাজনীতির ঘোলা জলে যে সারল্য কার্যত ডুবে যাবে তা বোঝা যায়নি। মজার আড়ালে কিছু সত্যি ঘটনাকে দেখানোর চেষ্টা এবারেও হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যগুলো আশা জাগিয়ে শুরু হলেও খাপছাড়াভাবে শেষ হয়ে যায়। ভোটে জিততে পরিকল্পনা আর তার পাল্টা পরিকল্পনা- এই দুইয়ের চক্করে গল্পের ইতি। চতুর্থ সিজনে বদলে গিয়েছে চরিত্রদের মনোভাবও। বিধায়কের অন্যায় দাবির বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়া প্রধানজিকে (রঘুবীর যাদব) এখন ক্ষমতার লোভ পেয়ে বসেছে। ভূষণ (দুর্গেশ কুমার) ও ক্রান্তিদেবী (সুনীতা রাজওয়ার) যেন একমাত্রিক ভিলেন। পদে পদে প্রধানজিকে বিপদে ফেলাই তাদের কাজ। মঞ্জুদেবীও (নিনা গুপ্ত) যেন ফ্যাকাশে। এবার সবচেয়ে বেশি নজর ছিল সচিবজি (জিতেন্দ্র কুমার) আর রিঙ্কির (সানভিকা) সম্পর্ক কোনদিকে গড়ায় তার উপর। সেখানেও হতাশা। অভিষেকের সঙ্গে প্রহ্লাদ (ফয়জল মালিক) ও বিকাশের (চন্দন রায়) রসায়নও এবার কষ্ট করে খুঁজতে হবে। নতুন চরিত্র হিসেবে এসেছেন মঞ্জুদেবীর বাবা। সকলের ভুল ধরিয়ে দিয়ে তিনি যেন বিবেকের ভূমিকায়। কিন্তু তিনি হঠাৎ যেমন আসেন, তেমনই উধাও হয়ে যান। কেন এই চরিত্রের অবতারণা, স্পষ্ট হয় না। গ্রামের নির্বাচনে বহু ছোট ফ্যাক্টর কাজ করে। সেগুলো নিয়ে কমেডির পথে হাঁটাই যেত। কিন্তু দুই পরিচালক দীপককুমার মিশ্র ও অক্ষত বিজয়ববর্গীয় সেই পথে হাঁটেননি।
ভালো কি কিছুই নেই? আছে, আর তা হল অভিনয়। প্রত্যেক অভিনেতা সেরাটা দিয়েছেন। আলাদা করে বলতে হয় অশোক পাঠকের কথা। বিনোদ চরিত্রে আগেই মন জয় করেছিলেন তিনি। এবার সেই ভোলাভালা বিনোদের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে একজন শিরদাঁড়া সোজা রাখা মানুষ। দৃপ্ত কণ্ঠে যে বলতে পারে, ‘গরিব হতে পারি, বিশ্বাসঘাতক নই’। অশোক যেন উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে।
তবে ফুলেরার গল্প এখনও শেষ হয়নি। পরের সিজন আসবে, তার ইঙ্গিত এবার দিয়ে রেখেছেন নির্মাতারা। অভিনয় এবং গল্প নিয়ে প্রত্যাশা থাকবে দর্শকের।
শুভজিৎ অধিকারী