


মৃণালকান্তি দাস: জেনারেল কমর জাভেদ বাজওয়াকে সরিয়ে পাক সেনাপ্রধান করা হয়েছিল যাঁকে, সেই আসিম মুনিরের যোগ্যতা কী ছিল? পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান থেকে একলাফে সেনাপ্রধান হওয়ার একমাত্র রসায়ন ছিল— তীব্র ইমরান বিরোধিতা। ইসলামাবাদের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মহম্মদ ফয়সাল খানের মতো রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করেন, ইমরান খানকে শায়েস্ত করতেই পাক সেনাপ্রধান পদে নিয়োগ করা হয়েছিল আসিম মুনিরকে। অথচ, ইমরানের দিন দিন বাড়তে
থাকা জনপ্রিয়তায় সামান্য চিড় ধরাতে পারেননি মুনির। একদিকে ইমরান কাঁটা আর অন্যদিকে লাগাতার তালিবানি (টিটিপি) হামলা— এই দুই সাঁড়াশি আক্রমণ সামলাতে পাক সেনাপ্রধানের ল্যাজেগোবরে অবস্থা।
শুধু তাই-ই নয়। সম্প্রতি আসিম মুনিরের হুঙ্কারকে পাত্তা না দিয়ে জাফর এক্সপ্রেস অপহরণকাণ্ডে রক্তাক্ত হয়েছে পাকিস্তান। যত সময় গড়াচ্ছে, ততই তীব্র হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের বালুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি। ‘বালোচ লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ) নামে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আক্রমণে ইসলামাবাদের ফৌজি জেনারেলদের ‘ত্রাহি মাম’ দশা। গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে পাক সেনাকে একরকম নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে তারা। এর জন্য পাক ফৌজই দায়ী। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে বালুচিস্তানবাসীকে বুটের তলায় রাখতে চেয়েছেন রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তারা। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকারের তোয়াক্কা করেননি তাঁরা। ফলে একাধিক ব্যর্থতার বোঝা কাঁধে চেপেছে পাক সেনাপ্রধানের। জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন ডিজিপি এসপি বৈদ্যের কথায়, ‘হু-হু করে জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় জেনারেল মুনির প্রবল চাপে রয়েছেন। ফৌজ এবং পাকিস্তানের জনগণের সামনে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে মরিয়া তিনি। আর তাই কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের জিগির তুলছেন রাওয়ালপিন্ডির সেনাপ্রধান।’ নিজের ইজ্জত বাঁচাতে পাক নাগরিকদের চোখ অন্যদিকে ঘোরানো ছাড়া উপায় ছিল না সেনাপ্রধান মুনিরের। এই কৌশল অবশ্য তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেই রপ্ত করেছেন।
যখনই পাক সেনাপ্রধানরা বিপদে পড়েছেন, তখনই সন্ত্রাসবাদী হানা আছড়ে পড়েছে ভারতের মাটিতে!
সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব তথা দেশের রাশ নিজের হাতে রাখতে গেলে জেনারেল মুনিরকে এমন কিছু ঘটাতে হতো, যা গোটা পাকিস্তানে একটা আবেগের ঢেউ তুলবে। সপ্তাহখানেক আগে জেনারেল মুনির তারই ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। হাতিয়ার করেছিলেন ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের উদ্দেশ্যে মহম্মদ আলি জিন্নার ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’কে। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে বিভিন্ন দেশে কর্মরত পাক রাষ্ট্রদূতদের সম্মেলনে বক্তৃতায় জেনারেল মুনির বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূতদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, তাঁরা একটি উন্নততর ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির ধারক। আমাদের পূর্বপুরুষরা ভাবতেন যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা হিন্দুদের থেকে আলাদা। আমাদের ধর্ম, আমাদের রীতিনীতি, ঐতিহ্য, চিন্তাভাবনা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা পৃথক। এটিই ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তি।’ ওই সম্মেলনে তাঁর বক্তৃতায় উঠে এসেছে পাকিস্তানে বিদ্রোহী তেহরিক-ই-তালিবান (টিটিপি) এবং বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মির সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গ। তিনি বলেছেন, ‘কাশ্মীর হল ইসলামবাদের গলার শিরা। তাই পাকিস্তানিরা কখনও তাকে ভুলতে পারবে না।’ অন্যদিকে, বালোচ বিদ্রোহীদের উদ্দেশে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তাঁর মন্তব্য, ‘বালুচিস্তান পাকিস্তানের গর্ব! তোমরা এত সহজেই এটা কেড়ে নেবে? ১০ প্রজন্মের মধ্যে কেড়ে নিতে পারবে না।’ পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এই বিষোদ্গারের ঠিক তার তিন-চার দিনের মাথায় জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের উপর বর্বরোচিত হামলা চালায় ইসলামাবাদ মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তোইবার ছায়া সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ বা টিআরএফ। ঘটনাপ্রবাহ দেখে বিশ্লেষকদের দাবি, ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন জেনারেল মুনির। শুধুমাত্র নিজের পিঠ বাঁচাতে ‘বিধ্বস্ত’ পাকিস্তানকে ঠেলে দিতে চাইছেন ধ্বংসের কিনারায়।
ছোটবেলায় রাওয়ালপিন্ডির বিখ্যাত মারকাজি মাদ্রাসা দার-উল-তাজউইদ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা নিয়েছিলেন মুনির। পাক সেনাবাহিনীর মধ্যে কট্টরপন্থা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি এক ভাষণে জেনারেল মুনির বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, ভারত ভেঙে পাকিস্তান তৈরির নেপথ্যে কত ‘সংগ্রাম’ রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, এ হেন পাকিস্তানকে কীভাবে রক্ষা করতে হয়, তা তাঁর জানা। জেনারেল মুনিরের ওই ভাষণ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। আসলে ওই ভাষণটি ভাইরাল করা হয়, যাতে ভারতে নাশকতা হওয়ার পরে পাকিস্তানের জনতা সেই ঘটনার সঙ্গে জেনারেল মুনিরের ভাষণকে সহজে মিলিয়ে ফেলতে পারে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, যারা ভারতের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ করার সাহস পায় না, তারা ভারতকে এভাবে রক্তাক্ত করার সাহস পায় কী করে? সন্ত্রাসবাদী হামলার পাল্টা জবাবে ভারত যদি সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে যে প্রত্যক্ষ সংঘাতেই জড়াতে হবে, সে কথা কি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জানেন না? অবশ্যই জানেন। কিন্তু পাকিস্তানের সরকার বা পাকিস্তানের সেনা যখন এ সব ঘটায়, তখন কিছু পরিস্থিতি বিচার করে ঘটায়। ভারতের পূর্ব সীমান্তে, অর্থাৎ বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা ভারতের পক্ষে খুব একটা অনুকূল নয়। সেই বাস্তবতা সম্ভবত জেনারেল মুনিরের মনোবল কিছুটা বাড়িয়েছে। তিনি সম্ভবত এ-ও ভাবছেন যে, ভারতের বিরুদ্ধে সক্রিয় হলে তিনি চীনের সমর্থন পাবেন। এই সব ধারণার ভিত্তিতে পাক সেনাপ্রধান ভেবেছেন, কোণঠাসা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এটাই একমাত্র উপায়। জেনারেল পারভেজ মুশারফও এভাবেই কোণঠাসা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০০১ সালে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় সংসদে জঙ্গিহানার ঘটনার পরে ইসলামাবাদে মুশারফের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছিল। জেনারেল মুনির এখন মুশারফের দেখানো পথেই নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে চাইছেন। এমনই ব্যাখ্যা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল তথা দেশের প্রাক্তন উপ-সেনাপ্রধান সুব্রত সাহার।
পাক রাজনীতিবিদদের একাংশের ধারণা, যুদ্ধ বাধলে আমেরিকা এবং চীনের সমর্থন পাবে ইসলামাবাদ। কিন্তু, আমেরিকার কৌশলগত বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘পহেলগাঁও কাণ্ডের পর গোটা বিশ্বের সমর্থন রয়েছে ভারতের দিকেই। এ ব্যাপারে নীরব থেকে আখেরে নয়াদিল্লির হাত শক্ত করতে পারে বেজিং। তাছাড়া রাশিয়ার পূর্ণ সাহায্য পাবে ভারত সরকার।’ ইতিহাস বলছে, ভারত-পাকিস্তানের কোনও যুদ্ধে চীন কখনও সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। ভারতের কোনও পদক্ষেপ সম্পর্কে চীন তার অসন্তোষ ব্যক্ত করতে পারে। ভারতের কী করা উচিত, কী উচিত নয়, চীন সে সব নিয়ে নানা বিবৃতি দিতে পারে। কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। আর আমেরিকা? চলতি বছরের ২৪ মার্চ মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসে ‘পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক অ্যাক্ট’ শীর্ষক একটি বিল পেশ করেন রিপাবলিকান নেতা জো উইলসন। বিলটি সমর্থন করেন কংগ্রেসের আর এক সদস্য জিমি প্যানেটা। সংশ্লিষ্ট বিলে পাক সেনাপ্রধান জেনারেল মুনিরের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোর দাবি তুলেছেন তাঁরা। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, এই বিল পাশ হলে মার্কিন সফরের জন্য আর ভিসা পাবেন না জেনারেল মুনির। পাশাপাশি, আমেরিকায় তাঁর যা যা সম্পত্তি রয়েছে, সে সব বাজেয়াপ্ত করতে পারবে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে ইমরান-সহ সমস্ত ‘রাজনৈতিক বন্দি’দের পাক সরকার মুক্তি দিলে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারে ওয়াশিংটন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ উইলসন রিপাবলিকান দলের নীতি নির্ধারক কমিটির সদস্য। মার্কিন প্রশাসনের ‘বিদেশ ও সশস্ত্র বাহিনী কমিটি’কে (ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড আর্মড সার্ভিসেস কমিটি) নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জেলবন্দি ইমরানের মুক্তির দাবিতে সুর চড়িয়ে আসছেন তিনি। পাক সেনাপ্রধানের উপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেসে পেশ হওয়া বিলটিতে পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর ফলে জেনারেল মুনিরের সঙ্গে সেনার একাধিক পদস্থ কর্তা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের উপরেও নিষেধাজ্ঞার কোপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর অর্থ বোঝার ক্ষমতা রয়েছে আসিম মুনিরের।
তাহলে কি পাকিস্তানে আবার পালাবদলের ইঙ্গিত! নাকি সেনাপ্রধানের পদ ছাড়তে হবে আসিম মুনিরকে? নাহলে এত বাগাড়ম্বর কেন? রাষ্ট্রপতির পুত্র তথা পাকিস্তান পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি থেকে উপ প্রধানমন্ত্রী ইশাক দার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ থেকে রেলমন্ত্রী হানিফ আব্বাসি— প্রত্যেকে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। সিন্ধু নদে রক্ত বইয়ে দেওয়ার কথা বলছেন। ১৩০টি পরমাণু বোমা ভারতের দিকে তাক করে রাখা বলে মন্তব্য করছেন। অথচ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভাঙনের মুখে থাকা সরকার, খারাপ শাসনব্যবস্থা, সামরিক একনায়কতন্ত্র এবং সীমান্ত সন্ত্রাসের কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতি ধুঁকছে। জিডিপি ক্রমশ তলানিতে। ফুরিয়ে এসেছিল তহবিল। বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারও তলানিতে পৌঁছেছিল। অর্থনীতি বাঁচাতে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার বা আইএমএফের কাছে হাত পাততে হয় ইসলামাবাদকে। আইএমএফ অনেক টালবাহানার পরে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল পাকিস্তানকে। সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তর্জন-গর্জন ছাড়া পাকিস্তানের ওই মন্ত্রীদের এখন অন্য কিছু আর করার নেই। কারণ, সেনাপ্রধানের উপর ভরসা করে গোটা দেশ আজ দেউলিয়া। গোটা ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রাক্তন স্পেশাল সেক্রেটারি রমানাথন কুমার বলছেন, পাকিস্তানে যে ধীরে ধীরে ভিতর থেকে ভাঙন শুরু হয়েছে, তা ভারতের উপরও প্রভাব ফেলছে। রক্তাক্ত হচ্ছে ভারতের মাটি।
জুলফিকার আলি ভুট্টো ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী হিসাবে রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভাষণ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান এক হাজার বছর ধরে যুদ্ধ চালাবে।’ যুদ্ধ তিনি চালিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় কোনও যুদ্ধে পাকিস্তানের জয় দেখে যেতে পারেননি। বরং ১৯৭১ সালে নিজের দেশকে দু’টুকরো হয়ে যেতে দেখেছেন। এবার যুদ্ধে জড়ালে সেই যে একই পরিণতি হবে তা সবচেয়ে ভালো জানেন সেনাপ্রধান আসিম মুনির। কারণ, এক
হাতে ভিক্ষাপাত্র, অন্য হাতে বন্দুক নিয়ে অন্তত
যুদ্ধ করা যায় না! তবে সেনাবাহিনীর ব্যর্থতার
দিক থেকে পাকিস্তানের নাগরিকদের চোখ ঘুরিয়ে রাখা যায়!