চাঁদের কোণে বসে যিনি চরকা কাটতেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছড়ায় তাঁর বয়স জানিয়েছিলেন, ‘সাত-শো হাজার কুড়ি’! তবে কল্পনার ছড়ার জগৎ ছেড়ে যদি বাস্তবে পা রাখি, তাহলে এখানেও তেমন সুদীর্ঘ আয়ুর অকুতোভয় কর্মঠ কয়েকজন রয়েছেন বইকি! তেমনই একজন বালিগঞ্জের বাসিন্দা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ স্মৃতিকণা রায়। তাঁর হাতে দুনিয়ার আলো দেখেছে অন্তত ৩৫০০ জন শিশু ।
চিকিৎসকের কাছে যখন তিনি শুনলেন, পেসমেকারই একমাত্র সুস্থ করতে পারে তাঁকে, কালবিলম্ব না করে সম্মতি দিলেন অস্ত্রোপচারের। শুধু তা-ই নয়, সফল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরে গিয়েছেন স্মৃতিকণাদেবী। ভাবছেন, এ আর এমন কী! চারপাশে কত বৃদ্ধ মানুষেরই তো পেসমেকার বসে! চমক এখানেই। এই প্রাণশক্তি ও সাহসে ভরপুর রোগিণীর বয়স মাত্র ১০২ বছর!
১০২! বয়সের নিরিখে সিংহভাগের কাছেই অধরা। এই বয়সের রোগীর অস্ত্রোপচার করতে ভয় পান চিকিৎসকরা, ভালোমন্দ ঘটে যাওয়ার উদ্বেগে পিছিয়ে আসেন পরিজনরা। এই বয়স বললেই মনে আসে নুব্জ্য, অসহায় ও মনে-মগজে অসাড় হয়ে যাওয়া কোনও মানুষের মুখ। কিন্তু সেসব চেনা ছবি ও ধারণাকে ফুৎকারে উড়িয়ে অসীম জীবনীশক্তিকে পাথেয় করে পেসমেকারের চ্যালেঞ্জ সামলালেন লেডি ডাফরিনের এই প্রাক্তন চিকিৎসক। উডল্যান্ডস হাসপাতালে হল অস্ত্রোপচার। এই সাফল্যের কৃতিত্ব সিনিয়র হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুনীলবরণ রায়ের। দীর্ঘদিন যাবৎ ডাঃ রায়ের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ঘন ঘন মাথা ঘুরছিল। সঙ্গে দেখা দিয়েছিল দুর্বলতা। রোগিণীর উপসর্গ দেখেই অসুখ চিনেছিলেন বর্ষীয়ান চিকিৎসক। তড়িঘড়ি স্মৃতিকণাদেবীর একটি হল্টার মনিটর করার উদ্যোগ নেন তিনি। দেখা যায়, মাঝে মাঝেই দু’টি হার্টবিটের মাঝে ৬ সেকেন্ডের বিরতি তৈরি হচ্ছে। সাধারণত দু’-তিন সেকেন্ডের বিরতি থাকলেও পেসমেকার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে সেই বিরতি প্রায় দ্বিগুণ! এত বয়স্ক রোগী, এদিকে পেসমেকার ছাড়া উপায় নেই। ঝুঁকি নিতে বাধ্য হলেন চিকিৎসক। সম্মতি দিলেন খোদ রোগিণী।
সুনীলবরণের নেতৃত্বে তৈরি হল পাঁচ সদস্যের দল। ছিলেন ডাঃ পল্লবী সিনহা, ডাঃ অনসূয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, ডাঃ ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডাঃ সৌমিত্র ভট্টাচার্য। অবশেষে সাফল্যের সঙ্গে মিটেছে এই অস্ত্রোপচার। হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িও ফিরে গিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, ‘দিব্য আছি!’
বিরল এই ঘটনার অন্যতম কারিগর ডাঃ সুনীলবরণ রায়ও খুশি স্মৃতিকণাদেবীর এই প্রাণশক্তিতে। জানালেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই ওঁর চিকিৎসা করছি। কোভিডও কাবু করতে পারেনি ওঁকে। দুর্দান্ত নিয়মানুবর্তী জীবন পালন করেছেন। এই বয়সেও সুগার, প্রেশার সহ কোনও কো-মর্বিডিটি নেই। হার্টের অন্যান্য পরীক্ষায় কোনও সমস্যা নেই। তাই অস্ত্রোপচার করতে দ্বিধা করিনি। রোগিণীর আত্মবিশ্বাসই জুগিয়েছে বাড়তি অক্সিজেন। নতুন জীবনে ফিরে গিয়েছেন তিনি।’
রবীন্দ্রনাথও কি মনে মনে জানতেন স্মৃতিকণাদেবীর প্রাণশক্তিকে? তাই বোধহয় লিখেছিলেন, ‘সব-চেয়ে যে পুরানো সে/ কোন্ মন্ত্রের বলে/ সব-চেয়ে আজ নতুন হয়ে/ নামল ধরাতলে।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়