নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: আবর্জনা হোক বা ফুল। জৈবসার তৈরিতে এসব উপাদান ব্যবহার প্রচলিত। কিন্তু এবার মাছের বর্জ্য থেকে জৈবসার তৈরি করে চমক দিলেন কাকদ্বীপের আইসিএআর—কেন্দ্রীয় নোনা জলজীব পালন অনুসন্ধান সংস্থার কাকদ্বীপ গবেষণা কেন্দ্রের (সিবা) প্রধান বিজ্ঞানী দেবাশিস দে। প্রায় আট বছরের গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সাফল্য এসেছে বলে তিনি জানান। তিনি এই কাজের পেটেন্টও পেয়েছেন বলে তাঁর দাবি। দুই ধরনের জৈবসার তৈরি করেছেন দেবাশিসবাবু। একটির নাম সিবা-প্ল্যাঙ্কটন প্লাস এবং অপরটির নাম দিয়েছেন সিবা-হর্টিপ্লাস। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই জৈব সার প্রয়োগ করে মাছ এবং শাকসবজির উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে। ফলে আগামীদিনে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমবে এবং জৈবসারের চাহিদা বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজ্য সরকার যদি এই প্রযুক্তি এখানে প্রয়োগ করে তাহলেও অনেক সবজি ও মৎস্য চাষি উপকৃত হবেন।
মৎস্য বর্জ্য বলতে এখানে মাছের নাড়িভুঁড়ি থেকে শুরু করে আশ ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেগুলি মাছ কাটার সময় ফেলে দেওয়া হয় সেগুলি থেকেই এই সম্পদ তৈরি করেছেন ওই বাঙালি বিজ্ঞানী। বিশেষ মেশিনে সেগুলি প্রক্রিয়াকরণ করে নানা পরীক্ষা করে সার তৈরি করা হয়েছে। এই গবেষণা কেন্দ্রের দাবি, ভারতে বর্তমানে বছরে প্রায় ১৯৫ লক্ষ টন মাছ উৎপাদিত হয়। তার থেকে ৬০ লক্ষ টনেরও বেশি মাছের বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এই বিপুল বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে প্রতিবছর প্রায় ৪৮ লক্ষ টন প্ল্যাঙ্কটন প্লাস এবং ৩ লক্ষ টন হর্টিপ্লাস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরল, গুজরাত, মহারাষ্ট্র এবং অসমে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। দেবাশিসবাবুর গবেষণার দলে ছিলেন আটজন সদস্য।
কাকদ্বীপের ওই গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, মৎস্যচাষে প্ল্যাঙ্কটন প্লাস ব্যবহারের মাধ্যমে হেক্টর প্রতি গড়ে ৪০০ কেজি অতিরিক্ত মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব। দেশের ১২.৩ মিলিয়ন হেক্টর সম্ভাব্য জলচাষ এলাকায় এর প্রয়োগ অতিরিক্ত ৪৯.২ লক্ষ টন মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে। এছাড়াও খাদ্য ব্যয় কমাতেও সক্ষম। কৃষিক্ষেত্রে এই জৈবসারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য লক্ষ করেছেন এই বিজ্ঞানী ও তাঁর দল। ধানচাষে এই সার স্প্রে করার ফলে ইউরিয়ার প্রয়োজনীয়তা হেক্টর প্রতি প্রায় ৭৫ কেজি পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে। ফলনের কোনো হ্রাস ঘটেনি। বরং বিভিন্ন সবজি ফসলে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত রাসায়নিক সারের পরিবর্তে এটি ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার প্রমাণও মিলেছে। দেবাশিসবাবু বলেন, মাছের বর্জ্য ভিত্তিক এই জৈবসার শুধু পরিবেশ দূষণ কমাবে না, বরং কৃষকদের উৎপাদন খরচ হ্রাস, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং টেকসই কৃষি ও মৎস্যচাষ ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশের প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলন ও জৈব উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই প্রযুক্তি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।