শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: ছোটখাট চেহারা। ডান পায়ে সমস্যা থাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। এভাবেই সে উঠে পড়ত কোনও দূরপাল্লার ট্রেনের বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য সংরক্ষিত কামরায়। ট্রেন এগতে শুরু করলে পৌঁছে যেত সংরক্ষিত বা অসংরক্ষিত কামরার কোনও একাকী যাত্রীর কাছে। জায়গা থাকলে অনেকেই তাকে বসার কথা বলত। সেই সুযোগে যাত্রীর সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলত সে। একসময় ব্যাগ থেকে বার করত ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। সহযাত্রীকে ‘অফার’ করত সেই পানীয়। কেউ একবার ‘টোপ’ গিললেই মাদক মেশানো সেই পানীয় খাইয়ে দিত। এরপর যাত্রী অচৈতন্য হয়ে পড়লে তাঁর কাছে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল, সোনাদানা ইত্যাদি হাতিয়ে সুযোগ বুঝে সরে পড়ত সে। এভাবেই বিভিন্ন রাজ্যে ট্রেনের যাত্রীদের কাছ থেকে চলছিল লুট। শেষ পর্যন্ত হাওড়া জিআরপির হাতে ধরা পড়ে অভিযুক্ত। পুলিস জানিয়েছে, ধৃতের নাম অশোক কুমার। তার বাড়ি পাঞ্জাবে।
রেল পুলিস সূত্রে খবর, ৩ এপ্রিল এই অভিযুক্ত হাওড়া স্টেশন থেকে শহিদ এক্সপ্রেসে ওঠে। ট্রেন ছাড়ার পর সে বিশেষভাবে সক্ষমদের কামরা থেকে চলে যায় জেনারেল বগিতে। তার হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে এক যাত্রী তাঁর পাশে বসার ব্যবস্থা করে দেন। ওই যাত্রী রামপুরহাট যাবেন বলে জানানোয় অভিযুক্ত বলে, সেও সেখানেই যাচ্ছে। আরও কয়েকটি স্টেশন চলে যাওয়ার পর কামরা কিছুটা খালি হতেই অশোক ব্যাগ থেকে নরম পানীয় বের করে ‘অফার’ করে সহযাত্রীকে। প্রথমে ইতস্তত করলেও অশোকের জোরাজুরিতে তিনি ওই পানীয় কিছুটা খেয়ে নেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে অচৈতন্য হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর কাছে থাকা নগদ ন’হাজার টাকা ও মোবাইল লুট করে চম্পট দেয় অভিযুক্ত। অচৈতন্য অবস্থায় ট্রেনেই থেকে যান ওই যাত্রী। রেকটি আবার যাত্রী নিয়ে হাওড়ায় ফেরে। ট্রেনের সাফাইকর্মী তাঁকে অঘোরে ঘুমোতে দেখে ডাকাডাকি করেন। সাড়াশব্দ না পেয়ে রেল পুলিসকে খবর দেন তিনি। তারা এসে ওই যাত্রীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর, ৬ এপ্রিল হাসপাতালে বসেই গোটা ঘটনার কথা জানান যাত্রী। হাওড়া রেল পুলিস মাদক মেশানো পানীয় খাইয়ে টাকা লুটের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে।
প্রথমে তারা হাওড়া স্টেশনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। যে প্ল্যাটফর্ম থেকে শহিদ এক্সপ্রেস ছেড়েছিল, সেখানকার ফুটেজ কাটাছেঁড়া করার সময় কালো রঙের প্যান্ট ও কালো স্ট্রাইপ দেওয়া শার্ট পরিহিত একজনকে বিশেষভাবে সক্ষমদের কামরায় উঠতে দেখা যায়। তার ছবি রেল পুলিসের সমস্ত থানায় ও আরপিএফের কাছে পাঠানো হয়। ১২ এপ্রিল আরপিএফের নজরে আসে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একজন ট্রেনের দিকে যাচ্ছে। তাকে আটক করে ব্যাগে তল্লাশি চালাতেই মেলে মোবাইল, মাদক ট্যাবলেট, আধার, জামাকাপড়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিসের কাছে শহিদ এক্সপ্রেসে লুটের কথা স্বীকার করে বলে দাবি রেল পুলিসের। তদন্তকারীরা আরও জেনেছেন, অভিযুক্ত এই কৌশলে অচৈতন্য যাত্রীর জিনিসপত্র লুট করে পরের স্টেশনেই নেমে যেত। সেখান থেকে ট্রেন ধরে অন্যত্র চলে যেত সে। বিভিন্ন রাজ্যে চলন্ত ট্রেনে এভাবেই সে ‘অপারেশন’ করেছে। রাত কাটাত প্ল্যাটফর্মে। যাত্রীদের লুট করা মোবাইল ব্যবহার করত সিম বদলে। এরকম কতগুলি ঘটনা সে ঘটিয়েছে, জানার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিস।