নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘কলকাতার সব পুকুরে স্নান করা যাবে না। কমিশনার যে পুকুরগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছে, একমাত্র সেখানেই স্নান করা যাবে’—এরকম একটি নোটিস প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫২ সালে। সেটি প্রকাশের পর কার্যত শোরগোল পড়ে যায় শহরে। দুপুর হলেই গামছা কাঁধে মানুষ তখন ছুটতেন নির্দিষ্ট পুকুরে। যেন মিছিল করে স্নান করতে যাওয়া। তখন শহরের সীমানা ছিল ছোট। কার্যত জঙ্গলে ঘেরা শহরে পুকুরই ছিল বাসিন্দাদের স্নানের লাইফলাইন। অথচ নোটিসে লেখা হল, শহরের মাত্র তিনটি পুকুরেই স্নান করা যাবে। কী কারণে এই নোটিস? ইতিহাসের বই ঘাঁটলে জানা যায়, শহর কলকাতার শোভাবৃদ্ধির জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তখন।
কমিশনারদের নোটিসের বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন কমিশনারের সেক্রেটারি জে ও বেকেট। বিজ্ঞপ্তির বয়ান, ‘১৮৫২ সালে ১২ আইনের ৪১ ধারার ১৩ প্রকরণের মর্মানুসারে লোককে অনুমতি প্রদান করা যাইতেছে যে, নীচের লিখিত পুষ্করিণীতে স্নান করিতে পারিবেক।’ সেই তিনটি পুকুর হল, দূর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট স্থিত ব্লাকো সাহেবের পুষ্করিণী, জানবাজার স্ট্রিটের নিয়োগী পুষ্করিণী ও রডন স্ট্রিট ও থিয়েটার স্ট্রিটের পুষ্করিণী। সেই নোটিসে স্পষ্টতই লেখা রয়েছে, এই তিনটি ছাড়া অন্য কোনও পুকুরে স্নান করা যাবে না। ১৭৩ বছর পেরিয়েছে সেই নোটিসটির। ‘কলকাতার পুরাকথা’ নামের একটি বইতে এমন তথ্য পাওয়া যায়। এখন কলকাতা পুরসভার খাতায় শহরের প্রায় ন’হাজার পুকুরের তালিকা রয়েছে। তবে কোথায় স্নান করা যাবে, এই মর্মে কোনও নির্দেশ নেই।
১৭৩ বছর আগের সময়কালের স্নানযোগ্য পুকুরগুলির বর্তমান অবস্থা কী? জানবাজার স্ট্রিটের ধারে তালতলায় নিয়োগী পুকুরটির অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু আজ তা নেই। এই পুকুরের নামে একাধিক রাস্তা ছিল বলে শোনা যায়। এখনও ওই এলাকায় নিয়োগী পুকুর বাই লেন নামের একটি রাস্তা রয়েছে। দূর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটে এখন আর কোনও পুকুরের কথা শোনা যায় না। রডন স্ট্রিট আর থিয়েটার রোডের আশপাশে পুকুরের কথা বললে সাধারণ মানুষ সুইমিং পুলের কথাই ভাবেন। তবে পথচলতি এক ব্যক্তির কথায়, এখানে পুকুর বলতে সেই ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে একটি পার্ক রয়েছে। সেখানে বড় একখানা পুকুর রয়েছে। শোনা যায়, একটা সময় পুকুর নিলামেও উঠত। দেউলিয়া হয়ে যাওয়া মানুষের পুকুর উঠত গিয়ে নিলামে। সংবাদপত্রে তেমন বিজ্ঞাপনও বের হতো। তবে আধুনিক জীবনে শহুরে অভ্যাসে পুকুর হয়ে উঠেছে সুইমিং পুল কিংবা সুদৃশ্য কোনও পার্ক।