প্রথমে আশ্বাস, তারপর নিষেধাজ্ঞা, শেষে ‘কোপ’। শুক্রবার রাতে এই তিন পর্বের নাটকের সাক্ষী থাকল দেশের প্রায় ৩৫ কোটি রান্নার গ্যাসের গ্রাহক। আমেরিকা-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলায় পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাসের আমদানিতে বড়োসড়ো সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশে গ্যাস ও তেলের দাম বাড়তে পারে বলে গত কয়েকদিন ধরেই প্রচার ও চর্চা চলছিল। রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা ছড়িয়েছিল। কিন্তু দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে কেন্দ্র প্রথমে জানায়, এসব গুজব। যুদ্ধের জেরে গ্যাসের জোগানে কোনো ধাক্কা লাগবে না। অথচ এর পরের ধাপে নিষেধাজ্ঞা জারি করে জানানো হয়, গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়ার ২১ দিনের মধ্যে আর বুকিং করা যাবে না। এর পরে রাত বাড়তেই নেমে এল ‘কোপ’! এক ধাক্কায় সিলিন্ডার পিছু ৬০ টাকা দাম বৃদ্ধির ঘোষণা। দেশের মানুষ যেন বলিপ্রদত্ত এক অসহায় প্রাণী! সর্বদা যেন হাড়িকাঠে তার গলা দেওয়া আছে। সরকার মনে করলেই নেমে আসবে খাঁড়ার কোপ। কারণের নামে যেকোনো অজুহাতে। মাত্র এগারো মাস আগে, গত এপ্রিলে রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছিল ৫০ টাকা। এবার গুজবে কান না দিতে বলে বাড়ানো হল ৬০ টাকা। ‘অমৃতকালে’ দেশবাসীকে মোদির ‘উপহার’।
কিন্তু এ তো অঙ্ক নয়, যেন ধাঁধা। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে ভারতের তেল-গ্যাসের ৩৮টি জাহাজ আটকে পড়েছে। সরকার জানাচ্ছে, দেশে প্রয়োজনীয় এলপিজি গ্যাসের ৮০-৮৫ শতাংশ আসে সৌদি আরব, কাতারের মতো দেশ থেকে, হরমুজ প্রণালীর পথ ধরে। সেই পথ বন্ধ হওয়ায় যে সমস্যা তৈরি হবে— তা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু কেন্দ্র দাবি করেছে, ভারতের কাছে ৩-৪ সপ্তাহের গ্যাস মজুত রয়েছে। তারপরেও দেশবাসীর কথা ভেবে ‘এসমা’ জারি করে সরকারি-বেসরকারি সমস্ত তৈল শোধনাগারগুলিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সুযোগে গ্যাসের বেআইনি মজুত ও কালোবাজারি রুখতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। উপরন্তু আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস আসতে শুরু করেছে। অতএব এলপিজি নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, গ্রাহকদের বারবার আশ্বাস দিয়েছে মোদি সরকারের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক। প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় এক মাসের মজুত ও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও কেন গ্যাসের দাম বাড়ানো হল? কেন্দ্রের যুক্তি, গ্যাসের জোগানে ঘাটতি না থাকলেও যুদ্ধের কারণে আমদানি খরচ অনেকটা বেড়েছে। তা সামাল দিতেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। অনেকের মতে, আমেরিকা থেকে গ্যাস আমদানির বাড়তি খরচ সামাল দিতেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।
এখানেই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, সদিচ্ছা, সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমদানি নির্ভর দেশে তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে যেমন রান্নার গ্যাস, পেট্রল, ডিজেলের দাম বাড়বে, তেমন এর উলটোটা হলে দাম কমা উচিত। গত এপ্রিলে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সময় এই যুক্তি দিয়েছিলেন দেশের তেলমন্ত্রীও। কিন্তু দেশবাসীকে সুরাহা দেওয়ার পরিবর্তে বাড়তি মুনাফা করেছে মোদি সরকার। অনেকের মতে, দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে ভারত আমদানি কমালে প্রতি বছর এই বাড়তি চাপ বহন করতে হয় না আম জনতাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিজনিত এই বাড়তি চাপ সাধারণ মানুষের উপর না চাপিয়ে সরকার কেন কোষাগার থেকে তা মেটানোর ব্যবস্থা করল না, সেই সংগত প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। জনগণকে সুরাহা দিতে চাইলে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর ঘন ঘন বিদেশ সফর সহ সরকারের একাধিক খরচ কাটছাঁট করে তা দিয়ে গ্যাস আনার বাড়তি খরচ মেটানো যেত। মোদি সরকারের থেকে এমন আচরণ আশা করাই অবশ্য বৃথা। বরং গ্যাসের পর এবার তেলের দাম বাড়বে বলে আশঙ্কা দৃঢ় হয়েছে। দেশে অশোধিত তেল এবং পেট্রল ডিজেল মিলিয়ে দু’মাসের জ্বালানি মজুত নেই। এই অবস্থায় তেলের দাম বাড়লে খুচরো ও পাইকারি বাজারে যে ফের আগুন জ্বলবে— তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এসব নিয়ে বিশেষ চিন্তিত বলে মনে হয় না। তিনি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিত্যনতুন ‘নির্দেশ’ পালনের অপেক্ষা দিয়ে দিন শুরু করেন। কে জানে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর নির্দেশও হয়তো ওভাল অফিস থেকেই এসেছে।