


সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, নৈহাটি: সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভিটে বাড়ি রয়েছে নৈহাটির কাঁঠালপাড়ায়। ১৮৩৮ সালের ২৬ জুন এখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৭৪ সালের দুর্গাপূজার সময় নৈহাটির বাড়িতে বসেই তিনি ‘বন্দেমাতরম’ গীত রচনা করেছিলেন। এই মহাসংগীত ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজমন্ত্র। সেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবারের বিধানসভা ভোটে নৈহাটিতে অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। বঙ্কিমের ছোট ভাইয়ের বংশধর সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বিজেপি প্রার্থী করায় এই চর্চা শুরু হয়েছে নৈহাটি জুড়ে। তবে সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নৈহাটিতে কেউ কখনও দেখেননি বলেই দাবি করছে তৃণমূল কংগ্রেস।
একটা সময় ‘বাম গড়’ বলে পরিচিত নৈহাটিতে গোপাল বসু, রঞ্জিত কুণ্ডুরা জিততেন। সেই নৈহাটি এখন তৃণমূলের ‘গড়’ বলে পরিচিত। বর্তমানে এখানে সিপিএমের প্রার্থীই নেই। তাদের সমর্থিত সিপিআইএমএল প্রার্থী দেবজ্যোতি মজুমদার প্রচারে রয়েছেন। তবে প্রচারের দৌড়ে তৃণমূলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে তিনি। এই আসনে ২০১১ সাল থেকে তিনবার জিতেছিলেন পার্থ ভৌমিক। এরপর তিনি লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ান। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পার্থ ভৌমিক ১৮,৩১৬ ভোটে নৈহাটি থেকে ‘লিড’ পেয়েছিলেন। পার্থবাবু বিধায়ক হিসাবে পদত্যাগ করায় এই বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের সেই উপনির্বাচনে ৪৯ হাজার ২৭৭টি ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছেন সনৎ দে। এবার ভোটে সনৎবাবুর স্লোগান, ‘নৈহাটি নিজের ছেলেকে চায়’।
কাঁঠালপাড়ার বাসিন্দা বর্ষীয়ান অমলেন্দু ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে বঙ্কিম ভবনের অধ্যক্ষ ডঃ রতন নন্দী, বঙ্কিম গবেষক পার্থপ্রতিম চট্টোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বংশধর হতে পারেন সুমিত্রবাবু। তবে আমরা নৈহাটিতে তাঁকে কখনো দেখিনি। বঙ্কিমভবনের কোন অনুষ্ঠানেও তাঁকে আমাদের নজরে পড়েনি। এখন ভোটের সময় উত্তরাধিকারী সূত্রের কথা বললে, তার কতটা প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে এভাবে ভোটের রাজনীতিতে টেনে আনা ঠিক হয়নি।
বঙ্কিম গবেষকরা মনে করেন, সবটাই ভোটের জন্য রাজনীতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ মতো বন্দেমাতরম গানটির যে দু’টি স্তবক গাওয়া হতো, তারও পরিবর্তন করেছে মোদি সরকার। তাতেও তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন রতন নন্দী, পার্থবাবুরা।
এদিকে, সুমিত্রবাবু নিজেকে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের বংশধর বলে প্রচারে তুলে ধরে বলছেন, পেশাগত কারণে আমি আমার বাবার সঙ্গে বাইরে ছিলাম। তবে আমি যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ভাইয়ের পঞ্চম পুরুষ, এটা তো অস্বীকার করতে পারবেন না। নৈহাটির মানুষের যদি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি আবেগ, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা থাকে, তবে নিশ্চয়ই আমাকে সমর্থন করবেন। এছাড়া তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি সহ বিভিন্ন অভিযোগও তুলেছেন বিজেপি প্রার্থী।
তৃণমূল প্রার্থী সনৎ দে অবশ্য ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন এই বক্তব্য। তিনি বলেছেন, আমার ৫২ বছর বয়স। জন্ম নৈহাটিতে। আমার এই ৫২ বছর বয়স পর্যন্ত আমি ৫২ সেকেন্ডও ওঁকে নৈহাটিতে দেখিনি। যে কেউ বঙ্কিমবাবুর বংশধর বলে দাবি করে ভোট চাইতেই পারেন। কিন্তু ভোটাররা কাজের মানুষকেই চান।
পার্থ ভৌমিকেরও স্পষ্ট দাবি, নৈহাটির বাসিন্দারা কোনো বহিরাগতকে মেনে নেবেন না। তাই স্লোগান উঠেছে, নৈহাটি নিজের ছেলেকে চায়।