


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, উত্তরপাড়া: বিধানসভা ভোটের দামামা তখন বেজে গিয়েছে। উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হিসাবে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা করেছে তৃণমূল। ফলে প্রচারের জন্যই কলকাতা থেকে উত্তরপাড়ার বাড়িতে ফিরতে হল প্রার্থীকে। একদিকে কর্মিসভা, অন্যদিকে জনসংযোগ। এদিকে, দুই যমজ শিশুকন্যাকে রোজ সকালে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পৌঁছে দেওয়া তাঁর রুটিন কাজ। এইটুকুই তাঁর কাছে অক্সিজেন। এর মধ্যেই মেয়েরা এবার কলকাতার একটি নামজাদা স্কুলে ভরতি হয়েছে। তাদের আব্দার, বাবাকেই নতুন স্কুলে দিয়ে আসতে হবে। দিনভর প্রচার সেরে তাই মাঝরাতে কলকাতায় ফিরতে হয়েছে শীর্ষাণ্যকে। সকালে স্কুল হয়ে ফের উত্তরপাড়ায় প্রচারের ময়দানে। শেষমেশ তিনদিন এভাবে চলার পর মেয়েদের অনুমতি নিয়ে এখন পাকাপাকিভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন উত্তরপাড়ায়। শীর্ষণ্যর কথায়, আমার কাছে পরিবার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তৃণমূলও ততটাই। আমি যতটা ফ্যামিলিম্যান, ততটাই পার্টিকর্মী।
এবারের ভোটপর্বে উত্তরপাড়া জমজমাট। সিপিএম আনুষ্ঠানিকভাবে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা করার অনেক আগে থেকেই তিনি মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন উত্তরপাড়া, কোতরং, কোন্নগরে। তাঁকে প্রার্থী হিসাবে পেয়ে উল্লসিত পার্টি কমরেডরা। গোড়া থেকেই তাঁরা ভেবে নিয়েছেন, এবার উত্তরপাড়ায় সিপিএমের জয় নিশ্চিত। প্রচারে ঝড় তুলছে লালপার্টি। দেওয়াল, ফ্লেক্স, ব্যানারে লালে লাল পাড়া, কলোনি, গলিঘুঁজি। এমনকি, গাছে গাছে পেরেক পুঁতেও চলেছে ব্যানার টাঙানো। স্ট্রিট কর্নারের যেখানে আগে জনাদশেক লোক জড়ো করতে সিপিএমের কালঘাম ছুটত, সেখানে প্রার্থী হাজির থাকলে মোটামুটি ভিড় হচ্ছে।
এই বিধানসভা কেন্দ্রে তৃতীয় দফার প্রার্থী তালিকায় দীপাঞ্জন চক্রবর্তীর নাম ঘোষণা করে বিজেপি। এমনিতেই লেট। তারপর কোনো এক অজানা কারণে গোড়ার দিকে প্রচারে প্রায় নামেনি পদ্ম শিবির। যেখানে সিপিএম ও তৃণমূল সমানে সমানে দেওয়াল লিখনে টক্কর দিয়েছে, সেখানে প্রায় ভ্যানিশ বিজেপি। সম্প্রতি ফ্লেক্স আর ব্যানার নিয়ে মাঠে হাজির তারা। ভোটবাজারে প্রার্থীকে নিয়ে তাদের ট্যাগলাইন, ‘এক্স এনএসজি কমান্ডো’। দেশীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’-এর কর্মী হিসাবে মুখেমুখে যে প্রচার করেছিল বিজেপি, সেসবের উল্লেখ থাকছে না প্রচারে। উত্তরপাড়া মাখলার এক বিজেপি কর্মীর কথায়, আমাদের প্রার্থী নাকি নকল ‘এনএসজি’ বা ‘র’। কস্মিনকালেও নাকি তাঁর সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এমন টিপ্পনিতে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছি। প্রচার করব কী, এসব সামলাতেই ব্যস্ত আমরা। তাঁর অনুযোগ, প্রার্থী যাই-হোন না কেন, মেজাজখানা তাঁর মিলিটারির মতোই! ধমক-চমকে রাখছেন আমাদের!
আর তৃণমূল? বাবা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীরামপুরের এমপি। সেই পরিচয়ের বাইরে এসে নিজের উজ্জ্বল উপস্থিতি তুলে ধরছেন শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ব্যক্তিত্ব, চেহারা ও অতি মিষ্টি ব্যবহারে ইতিমধ্যেই মন জয় করে নিয়েছেন সকলের। বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক অতি নাক উঁচু কাঞ্চন মল্লিককে নিয়ে যেটুকু ক্ষোভ ছিল এলাকাবাসীর, তার সবটুকু ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছেন তিনি। শুধু তাক লাগানো প্রচারই নয়, তাঁর উপস্থিতিই তৃণমূলকে এগিয়ে দিচ্ছে অনেকখানি।
মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে আলোচনা চললেও, তাকে আদৌ আমল দিতে রাজি নন শীর্ষণ্য। তাঁর কথায়, সিপিএম প্রার্থী এলাকায় নতুন। তাঁর সঙ্গে যে পুরানো কমরেডরা ঘুরছেন, তাঁরা আসলে পচা আলুর মতো। মানুষ তাঁদের কীর্তিকলাপ ভুলে যাননি। এর আগে লোকসভায় এখানে প্রার্থী ছিলেন দীপ্সিতা ধর। হেরে যাওয়ার পর তিনি আর এসেছেন এই এলাকায়? খোঁজ নিয়েছেন কারও? এটাই সিপিএমের চরিত্র। মুখে বড়ো বড়ো কথা। বাস্তবে জনবিচ্ছিন্ন। এরই সঙ্গে শীর্ষণ্যর সংযোগ, এখানে সিপিএম আর বিজেপির আঁতাত আছে। যদিও তৃণমূল ওসব নিয়ে ভাবছে না।
শীর্ষণ্যর কথায়, উত্তরপাড়া বিধানসভা এলাকার হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন মিশছি। আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি এখানকার বনেদিয়ানা, আন্তরিকতা আর সংস্কৃতি দেখে। একে অন্যের সঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকার রেওয়াজ এখানে। ঠিক যেন এক পরিবার। বৃহত্তর পরিবারে একে অন্যের হাত ধরে আছেন সবাই। আমি আদ্যপান্ত পারিবারিক মানুষ। এমনই একটা পরিবার চাই আমিও। তাঁরা চাইলে, এই পরিবারকে আগলে রাখব আমি। কথা দিচ্ছি।