সংবাদদাতা, কাটোয়া: বহরানের ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা অশ্বত্থ গাছের নীচে পূজিত হন মা ডাকাত কালী। ছাগবলির তাজা রক্ত মাকে নিবেদন করা হয়। কেতুগ্রামের বহড়ানের গ্রাম্য দেবীই ‘ডাকাত কালী’। সাড়ে চারশ বছরের প্রাচীন ডাকাত কালীকে এখনও ছাগবলির আগে চুরি করা চালকুমড়ো বলি দিয়ে তুষ্ট করতে হয়। পুজোতে লক্ষাধিক জনসমাগম হয়। ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় পুলিশকে।
এখনও পুজোর প্রথম নৈবেদ্য আসে ডাকাত পরিবার থেকে। তারপরেই মায়ের ঘট ভরতে যাওয়া হয়। কেতুগ্রাম-২ ব্লকের গঙ্গাটিকুরি পঞ্চায়েতের বহড়ান গ্রাম ট্রেন পথেও যাওয়া যায়। আজিমগঞ্জ-কাটোয়া শাখায় বহড়ান স্টেশন। কাছেই সেই অশত্থ গাছ। এখন চারদিক ঘেরা কংক্রিটের হলেও কোনো মন্দির গড়ে ওঠেনি। অশ্বত্থ গাছের নীচে কংক্রিটের বেদিতেই মায়ের পুজো হয়। এর পিছনেও রয়েছে এক কাহিনি। স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের এক ব্যবসায়ী নাকি মায়ের মন্দিরের ছাউনি গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ তিনি স্বপ্নাদেশ পান, মা নাকি মন্দিরে থাকবেন না। অগত্যা অশ্বত্থ গাছের নীচেই কংক্রিটের বেদিতে মাকে পুজো করা হয়।
বহড়ান গ্রামের শেষপ্রান্তে বহুকাল ধরে ঘন জঙ্গল ছিল। চারিদিক ঝোপঝাড়, গাছ গাছালিতে ভর্তি। সেখানেই অশ্বত্থ গাছের নীচে গ্রাম্য দেবীকে পুজো করতেন সবাই। কোনো মূর্তি ছিল না। গ্রামের বাসিন্দা খোকন সিং জানালেন পুজোর ইতিহাস। প্রায় তিনশ বছর আগে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে ছিলেন পরেশ হাজরা নামে এক দুধর্ষ ডাকাত। তখন তার নাম শুনলে স্থানীয় মানুষদের গলা দিয়ে ভাত নামত না। মুর্শিদাবাদের এক্কেবারে শেষ সীমানায় কেতুগ্রামের বহড়ান গ্রামটি অবস্থিত। তার আশেপাশে মুর্শিদাবাদ জেলারও বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে পরেশ হাজরার ডাকাত দল ছিল। লুটপাট করে এনে তা তিনি গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। সে সময় বঙ্গদেশে ডাকাতদের সঙ্গে মা কালীর আরাধনার একটা নিবিড় যোগ রয়েছে। মা কালী শক্তির দেবী। পরেশ হাজরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে বহড়ান গ্রামের ঝোপ জঙ্গল ঘেরা অশ্বত্থ গাছের নীচে গ্রাম্য দেবীর থানেই মা কালীর মূর্তি তৈরি করে পুজো দিতেন। প্রতি বছর নিজের বাড়ির পাশাপাশি গ্রাম্য দেবীর থানে মা কালীর বড় মূর্তিতে ধুমধামের সঙ্গেই পুজো করতেন। সেই থেকেই বহড়ানের গ্রাম্য দেবী ডাকাত কালী নামে প্রতিষ্ঠা হয়।
এখনও ডাকাত পরিবারের সদস্যরা প্রতিকী চুরি করা চালকুমড়ো মায়ের কাছে নিবেদন করে যান। এটাই রীতি। তন্ত্রমতে মায়ের পুজো হয়। সাত রকমের ভাজা, ঘি ভাত, পায়েস, খিচুড়ি এসব মায়ের ভোগে নিবেদন করতে হয়। পুজো কমিটির আরেক কর্মকর্তা অমিতাভ সরকার বলেন, গ্রাম্য দেবীই এখন আমাদের ডাকাত কালী। মা খুব জাগ্রত। পাশের পুকুরেই মাকে বিসর্জন করা হয়। তবে তার আগে মাকে গোটা গ্রামে প্রদক্ষিণ করানো হয়।
বহড়ানের ডাকাত কালীর মূর্তি খুব ভয়ঙ্কর। আপামর বাসিন্দারা মাকে ডাকেন ভক্তি ভরে। তাঁদের বিশ্বাস, ডাকাত কালী কাউকে খালি হাতে ফেরান না। ডাকাতদের সাধনা করা মা কালী আজ সবার মা।



