এই দুনিয়াটাই আজব চিড়িয়াখানা। মানুষ কেন, প্রত্যেক জীবকেই তার কর্মফল অনুযায়ী চলতে হয়। জীবই নিজেই নিজের ভালোমন্দ কর্মের দ্বারা তৈরি করে ভাগ্য। কার অদৃষ্টে কী আছে কেউ জানি না। দেখা যাচ্ছে সুবর্ণ সুযোগ সামনে আসছে, কিন্তু এলেও ধরা গেল না! কেন? বিপদ ঘটতে পারত কিন্তু ঘটল না। অথবা যা হওয়ার নয় তাই হল। এটাই বড় রহস্য। অদৃষ্টই কি এর কারণ! স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, রামচন্দ্র থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ এমনকী বহু মুনি-ঋষি থেকে সাধু-মহাত্মা কেউই অদৃষ্টকে এড়াতে পারেননি। কিন্তু তাঁরাই বলে গেছেন নানা উপায় আছে। কী সেই উপায়? লিখেছেন সোমব্রত সরকার।
Advertisement
যা দেবে হাতে, ওহি যাবে সাথে
জীবন শুধুমাত্র নিজের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের ওপরই নির্ভরশীল নয়, প্রাকৃতিক ও অন্যদের কাজের ওপরও কিছুটা নির্ভর করে। নানাপ্রকার বিরুদ্ধ অবস্থা প্রত্যেক মানুষের জীবনে কোনও না কোনও সময়ে আসবেই, কেউ যদি মনে করে এই সব অবস্থা একেবারেই আসবে না, তবে আমি শান্তি লাভ করব— সে কখনওই সেই শান্তি পাবে না। কারণ বিরুদ্ধ অবস্থা কিছু না কিছু আসতে থাকবেই। ধনী হোক আর দরিদ্র, সন্ন্যাসী হোক আর গৃহী, প্রত্যেকেই কোনও না কোনও ভাবে ওইরূপ অশান্তির কারণ— নানা বিরুদ্ধ অবস্থা আসবেই। কিন্তু যিনি এই সব বিরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে স্থির থেকে সমস্ত কিছুকেই সমানভাবে গ্রহণ করতে অভ্যাস করবেন এবং তাঁর যে পরিমাণে আয়ত্ত হয়, সেই পরিমাণে তিনি শান্তিলাভ করবেন। এটা সব সময়ের জন্য যাঁরা মাথাতে রাখতে সক্ষম হবেন— জীবনে আসা নানান বিরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে আমি আমার মনকে স্থির ও প্রসন্ন রাখতে অভ্যাস করব, আর মনকে চঞ্চল করলে বা অসন্তুষ্ট করলেই তো তার আসা বন্ধ হবে না অথচ এই চাঞ্চল্য ও অসন্তুষ্টির জন্য অশান্তি আরও বেড়ে যাবে তাঁরাই জীবনটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন। যে কোনও অবস্থাই আসুক স্থির থেকে নিজের সাধ্যমতো কর্তব্য করে যেতে চেষ্টা করতে হবে আমাদের, বিচলিত হলে চলবে না। যেমন পাহাড়ের উপরকার তীর্থস্থলে পৌঁছতে হলে কখনও উঁচু শিখরে উঠতে হয়, আবার কখনও বহু নীচে নামাতেও লক্ষ্যস্থানে এগিয়ে যাওয়াই হয়, মানুষের মনের গতিমুখ আর জীবনের গতিপথটা অনেকাংশে ঠিক তেমনই। মন কোনও কোনও পরিস্থিতিতে আশা-উদ্রেককারী যে সমস্ত ভাবনা, তা থেকে সরে এসে একেবারে হতাশার গহীনে তলিয়ে চলে যায়, জীবনের পথও ওইরকম ভাবেই মনের মতোই আমাদের অতি দুর্গম, উঁচু-নিচু অবস্থার মধ্যে দিয়েই চলে। ওই সব দিকে মোটেই ভ্রূক্ষেপ না করে যাঁরা নিজের সাধ্যমতো কাজ করে যান, চেষ্টা করতে করতে নিশ্চিত থাকার অভ্যাস করতে পারেন তাঁরাই একমাত্র বাধা বিপত্তিগুলোর মোকাবিলা করতে সক্ষম। সকল অবস্থায়— সুখ, দুঃখ, জয়, পরাজয়, লাভ, ক্ষতি ইত্যাদি সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস করাটাই একটা যোগ। সর্বাবস্থায় স্থির, ধীর ও শান্তচিত্তে যিনি থাকতে জানেন তাঁর থেকে বড় যোগী, সন্ন্যাসী আর দ্বিতীয় কেউ নন।
সিদ্ধাচার্য সরহপা মনস্থ করলেন পাহাড়ে গিয়ে তপস্যায় বসবেন। ঘরে নানাবিধ কোলাহল আর সাংসারিক বিপত্তির কারণে তাঁর সাধনা ঠিকমতো এগচ্ছে না। স্ত্রী বললেন, ‘নির্জনবাসেই শুধু সাধনা হয় না কি?’ সরহপা বললেন, ‘তবে? সাধনা কীভাবে হবে শুনি?’ স্ত্রী বললেন, ‘এই যে বারো বচ্ছর সমাধি-সাধন করলে, সমাধি ভাঙার পর তুমি বল্লে কী?’ সরহপা বললেন, ‘মূলোর তরকারি খাব।’ স্ত্রী বললেন, ‘তাহলেই ভেবে দেখ, এখনও তোমার খাওয়ার চিন্তা যায়নি। সামান্য জিনিস থেকেই তুমি মন সরাতে পারলে না, পাহাড়ে গিয়ে করবেটা কী শুনি?’ সরহপার চোখ খুলে গেল স্ত্রীর কথায়। তিনি উপলব্ধি করলেন নির্জন জায়গাতে গিয়ে থাকলেই মনকে কোলাহল আর কামনার বৃত্তি থেকে তো বের করা যাবে না। সংসারে থেকেই বৃত্তি ধ্বংস করতে হবে।
ধৈর্য ধরে কষ্ট সহ্য করে গেলে তার ফল ভালোই হয়। পাণ্ডবরা অত ক্লেশ সহ্য করেছিলেন বলেই তাঁরা সুখী হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধে পাণ্ডবরা জয়লাভ করেছেন বটে, কিন্তু তাঁদের আপন বলতে আজ আর কেউ নেই। পাণ্ডববংশ সমূলে ধ্বংস করবার জন্য অশ্বত্থামা অমানুষিক নিষ্ঠুরতায় দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রদের ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেছেন। এই অবস্থার মধ্যেও পাণ্ডবেরা কর্তব্যকর্মে অবিচল। পরলোকগত আত্মীয়দের জন্য তাঁরা পারলৌকিক কর্ম করতে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গঙ্গার তীরে এসেছেন। কাজ শেষ হলেই শ্রীকৃষ্ণ ফিরে যাবেন দ্বারকায়। এই সংবাদ পেয়ে পাণ্ডব জননী কুন্তী বললেন, ‘বলে শেষ করতে পারি না কতবার কত বিপদ থেকে তুমি রক্ষা করেছ আমাদের। কখনও বিষ থেকে, কখনও আগুন থেকে, কখনও শত্রুর হাত থেকে, বনবাসের কষ্ট থেকে, তারপর যুদ্ধের মধ্যে বারবার কত মহারথীদের অস্ত্র থেকে আমার ছেলেদের তুমি বাঁচিয়েছ। এখন তো বিপদ কেটে গেছে তাই এবার তুমি চলে যাচ্ছ। বিপদই আমার হোক ‘শশ্বৎ’— সর্বদা। নিরন্তর আমার বিপদ যেন লেগে থাকে, তাহলে ‘তত্র তত্র জগৎগুরু’, যেখানেই বিপদ সেখানেই তুমি জগৎগুরু আমার পাশে এসে দাঁড়াও। বিপদের মধ্যে তোমার সেই দর্শন আমি লাভ করেছি তাই আর ভবদর্শন করতে চাই না। আমি চাই এমনিভাবে বিপদ লেগে থাকুক সদাসর্বদা আমাদের, আর তোমাকে কাছে পাই দেখে প্রাণ জুড়োই, মুক্তি পাই।’
ভাগবতের মধ্যে রয়েছে ভগবানের প্রতি ভক্ত কুন্তীর এই স্তব। কুন্তীর মুখে এই প্রার্থনা শুনে তাঁর মনমতো অভিপ্রায় জেনে, শ্রীকৃষ্ণ মধুর হাসিতে সকলকে আনন্দে আপ্লুত করে রথ থেকে নেমে, অন্তঃপুরে গিয়ে প্রবেশ করলেন।
নারদপঞ্চরাত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মানুষের সুখ- দুঃখ, রোগ-শোক, শুভ-অশুভ আসছে প্রারব্ধ কর্ম থেকে। ‘প্রাক্তনাৎ সুখদুঃখঞ্চ রোগঃ শোকো ভয়ং পিত।’ প্রারব্ধ কর্মের ফেরে দুঃখাদি ভোগ আসে আমাদের জীবনে। আমরা এর নাম দিই— নিয়তি, অদৃষ্ট, ভাগ্য ইত্যাদি। এই প্রাক্তন ফলভোগ জ্ঞানী, যোগী, সাধক, সন্তদের পর্যন্ত করতে হয়। এতে বিচলিত হয়ে পড়লে ভোগকাল আরও বেড়ে যায়। ভোগকাল কেটে গেলে আপনা হতেই সব রোগশোকাদি দূর হয়ে যায়। অনুকূল অবস্থার মধ্যে মনকে প্রসন্ন ও শান্ত রাখতে সবাই পারে, কিন্তু একটু ক্লেশের অবস্থা তৈরি হলেই অত্যন্ত অসহায় ও বিপন্ন বোধ করতে থাকি আমরা নিজেদেরকে। যাঁরা বিপদ ও ক্লেশকে অকাতরে ধৈর্য সহকারে গ্রহণ করে তার মধ্যেও মনকে শান্ত রাখতে অভ্যাস করেন, বিপদ ও ক্লেশের অবস্থা আসলে তাঁরা তা ভগবৎ কৃপা বলে মনে করেন। কুন্তী এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের উৎকৃষ্ট শাস্ত্রসমূহের দিকেও যদি আমরা একটু ফিরে তাকাই তাহলে দেখব যে মহর্ষি বাল্মীকির মনে হঠাৎ করে দুঃখ হল শিকারি ব্যাধ ক্রৌঞ্চ— মিথুনের একটিকে তির দিয়ে মেরে ফেলবার কারণে। পাখিটি ছটফটিয়ে রক্তাক্ত হয়ে ডাল থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল বাল্মীকির চোখের সামনে। দুর্বৃত্ত দস্যু বাল্মীকির মনের অবস্থা এ দৃশ্যেই নিমেষে বদলে গেল। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল শ্লোক— রামায়ণের জন্ম হল এভাবেই। জীবন ঘুরে গেল তাঁর। দস্যু থেকে ঋষি হলেন তিনি। দুঃখের আতিশয্য, বিপরীত অবস্থাদি এভাবেই প্রেক্ষাপট বদল করে হঠাৎ করেই। মানুষের নিয়তি বদলে যায়।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় সমস্ত ভাই, বন্ধু, স্বজনদের মারতে হবে বলে অর্জুন বেঁকে বসলেন। তাঁর মনে অনুশোচনা এল, ‘প্রিয়জনদের হত্যা করে আমি সিংহাসন লাভ করব, দরকার নেই আমার রাজ্য লাভের। ছিঃ ছিঃ কত নিকৃষ্ট কীট হলে এরকম করা যায়!’ ত্রিকালজ্ঞ শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘আত্মীয় বিরোধ সর্বত্র। অবস্থার ফেরে জীবনে এ সমস্ত ঘটবেই। দমে গেলে চলবে না তো। স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে যুদ্ধ করতেই হবে।’ শ্রীকৃষ্ণ নিজেও তো কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধরথ চালনা করলেন। পাণ্ডবদের রক্ষা করলেন ঠিকই কিন্তু তাঁকেও চোখের সম্মুখে দেখতে হল যদুবংশের ধ্বংসলীলা। সমস্ত মানুষকেই বিরোধ, হিংসা, দ্বেষের ভেতর দিয়ে এগতেই হবে— জীবনের প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপটগুলো এমনই। এ সব অবস্থার হাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চোখের সামনে দেখলেন তাঁর বংশ ধ্বংস হয়ে গেল আর নিজের মৃত্যু ঘটল ব্যাধের হাত থেকে খসে যাওয়া সামান্য একটা তিরে। যিনি পরিস্থিতির নির্ণায়ক, কোনও না কোনও সময়ে তিনিই আবার ভীষণভাবে পরিস্থিতির শিকার। কিচ্ছু করবার থাকে না তখন। তখনই নিয়তি, অদৃষ্টের চিন্তাগুলো সব এসে ধাক্কা মারে আমাদের দুর্বল মনে।
পৌরাণিক ঋষিরা তাঁদের লেখায় এভাবেই অধ্যাত্মতত্ত্বের সম্মিলন ঘটালেন। সমস্ত কাহিনিমালাগুলো সেখানকার মানুষেরই নানারকম অবস্থার ফেরে। রাজা সুরথকে তাঁরই মন্ত্রীবর্গ রাজ্যচ্যুত করে তাড়িয়ে ছাড়ল। সমাধি নামের বিত্তশালী ব্যবসায়ী স্ত্রী-পুত্রের চক্রান্তে বনে চলে এলেন। সেখানে মেধস মুনির সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ ঘটল। মুনি তাঁদের বললেন, ‘মহামায়ার মায়ার গেরোতে মানুষের অবস্থান্তর ঘটে। দুঃখ-ক্লেশ ভোগ করে তারা।’ এভাবেই অবস্থার বিপাক নিয়েই জন্ম হল শাস্ত্রপুথি চণ্ডীর।
মহর্ষি ব্যাসদেবের মনে পর্যন্ত শান্তি নেই। বেদ বিভাগ করলেন তিনি, নানা পুঁথিটুথি লিখলেন— তাও তাঁর মনের ওঠা-পড়া যায় না। তিনি এবার শরণাপন্ন হলেন দেবর্ষি নারদের। মহামতি নারদ সবটা শুনে বললেন, ‘কলিকালে মানুষের আয়ু অত্যন্ত কম। যাগযজ্ঞ, যোগ, প্রাণায়াম সবরকম সাধনেই সিদ্ধ হতে সুদীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।’
মহর্ষি বেদব্যাসের এই বিষাদ ভাব থেকেই জন্ম হল ভাগবত শাস্ত্রের। সেখানে বলা হল, শরৎকালে যেমন সরোবরের জল আপনা আপনি পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনই শ্রীভগবানের মহিমা শ্রবণ করলে মানুষের মন আপনা থেকেই পবিত্র হয়ে যায়। দুঃখ-ক্লেশে, শোকে-তাপে জর্জরিত মানুষ অবস্থার বিপাকে পড়ে এখনও ছুটে যান সাধুসন্তদের কাছে ভাগবত কথা শুনতে। সকলকেই তাঁরা তখন বলেন, ‘পূর্বজন্মার্জিত কর্মের কারণে ভোগ আসলে কী আর করবেন? প্রারব্ধ ভোগ তো এড়ানো যায় না। ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষদেরও এটা ভোগ করতে হয়।’
শ্রীরামকৃষ্ণদেব, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর মতো মহাপুরুষেরাও অসহ্য রোগ যাতনা ভোগ করে গেছেন। ব্রজবিদেহী মোহন্ত সন্তদাস কাঠিয়া বাবাজি স্থূলদেহে শিবপুর আশ্রমে রোগ যাতনা ভোগ করতে করতে হাওড়া থেকে বৃন্দাবনে আর পৌঁছতে পারলেন না। ট্রেনের মধ্যেই তিনি দেহ ছেড়ে দিলেন। এজন্যই সন্তেরা বলছেন, ‘নানান বিপর্যয়ের মুখে হতাশ না হয়ে বরং এটাই মনে করো যে ভগবান তোমার প্রারব্ধের ভোগ ক্ষয় করে দিচ্ছেন। এই অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও মনে মনে সব সময় ইষ্টমন্ত্রটি জপ করতে চেষ্টা কর। ভোগের দ্বারা ভোগ ক্ষয় হয়েই অন্তরাত্মা পরিষ্কার হয়। এছাড়া আর দ্বিতীয় পথ নেই। জেনে রেখ, মরণের সঙ্গে যাবে কেবলমাত্র তোমার কৃতকর্ম। যা দেবে হাতে, ওহি যাবে সাথে। নিজে হাতে তুমি যাকে যেমন শুভকর্ম ও খারাপ কাজের যা কিছু ফলাফল দান করে যাবে, সেটাই তোমার সঙ্গে যাবে।’
য্যায়সা কে ত্যায়সা মিলে
মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের ওপর এসে পৌঁছয় নানান ধরনের আধিদৈবিক তাপ। হঠাৎ কোথাও কোনও বিদ্যুৎপাত হল— পরিবারের কেউ চলে গেল। ভূ-কম্পন, অতিবৃষ্টি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হল গোটা পরিবার। অতিবৃষ্টিতে কৃষকের সমস্ত জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেল। সুদে টাকা ধার নেওয়া ছিল। আর্থিক সঙ্কটে কেউ হয়তো আত্মহত্যা করে বসলেন। এই সমস্ত হঠাৎ আসা বিপদগুলোকে বলা হচ্ছে আধিদৈবিক তাপ। এই তাপ যে কোনও মানুষের জীবনে যখন-তখন লাগতে পারে। এর থেকে আর্থিক, মানসিক, শারীরিক, পারিবারিক সব ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সেখান থেকে জীবনে আসতে পারে দুর্যোগের বোঝা। শোক, দুঃখ-কষ্ট কত কী এসে ভালো অবস্থাকে একেবারে খারাপ করে দিতে পারে। পরিবার ছিল সচ্ছল— চলছিল ভালোই— বাড়িতে একদিন ডাকাত পড়ে লুট হল সর্বস্ব, পরিবারের কেউ ডাকাতি রুখতে গিয়ে খুন হয়ে গেল। দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ হারাল পরিবারের প্রধান। সমাজ বিরোধীরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিল বাড়ি। এই সব ডাকাতি-চুরি-ছিনতাই, খুন-রাহাজানি এগুলো হল মানুষের জীবনে আসা আধিভৌতিক তাপ। যে কোনও সময়ে আসা ঝড়ের মতো এগুলো ঢুকে গোটা পরিবারটাকে নষ্ট করে দিতে পারে। সুখ-শান্তি চিরতরে চলে যেতে পারে। সম্পর্ক ছিন্নের ব্যথা, অনেক দিনের যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, চূড়ান্ত অপমান, অসম্মানিত হওয়া, মামলা-মোকদ্দমা, বাপ- ঠাকুরদাদার আমলের জমি-বাড়ি-সম্পত্তি নিয়ে হট্টগোল— থানা-পুলিস, জেল-হাজত এই সমস্ত তাপ জীবনে যখন ঢুকে পড়ে বুঝতে হবে যে জীবনটা এবার আধিভৌতিক তাপের শিকার হল। শরীরে হুট করেই বড় ধরনের মারণব্যাধি এল, সমস্ত অর্থ বেরিয়ে গেল, ব্যাধি সারাতে জমি-বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হল কিংবা চরম দারিদ্রের মধ্যে চলে আসা একটি পরিবার, সেই পরিবারের ছেলেটা চাকরি পেল, একটু ঘর-বাড়ি স্বাচ্ছন্দ্য আসতেই একদিন ছেলেটা বাইক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেল। এই হঠাৎ আসা বিপদগুলো— পাহাড়ি ধসে তলিয়ে গেল বেড়াতে যাওয়া একটা সুখী পরিবার, বিয়ের কদিন আগে হবু বর-বউ কেনাকাটা করতে গিয়ে গাড়ির তলায় চাপা পড়ে চলে গেল— রোজই এমন মর্মান্তিক দুঃখ ও বিয়োগের তাপ এসে লাগে কোনও না কোনও পরিবারে। এগুলো হল আধ্যাত্মিক তাপ। এই তিন তাপে জর্জরিত মানুষের জীবন। কেউ বলতে পারে না, যে এই তিন তাপ থেকে সে মুক্ত। এগুলোই হল গিয়ে অদৃষ্ট, দৈব, ভাগ্য বা নসিব। অবশ্যম্ভাবী ঘটনা থেকে এই সমস্ত দুর্যোগ আসে মানুষের, জীবন একেবারে ছারখার করে দেয়। মানুষ এর নাম দিয়েছে নিয়তি। সাধকেরা বলছেন একে, ত্রিতাপ।
ত্রিতাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় কী?
এই তাপ থেকে মুক্ত হতে গেলে দরকার চেষ্টা। যাকে বলা হচ্ছে পুরুষকার প্রয়োগ। একমাত্র মানুষের পক্ষেই এটা সম্ভব। জীবন যুদ্ধে হারা-জেতা বড় কথা নয় এক্ষেত্রে। যুদ্ধটা করতেই হবে তোমাকে। এর হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই কারও। যদি পালিয়ে যাও, নিজেকে শেষ করে দাও— সেটাই হেরে যাওয়া। মানুষই একমাত্র যে কোনও পরিস্থিতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। মন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই— এ সবই তাই আমাদের শাস্ত্রে বর্ণিত। মা দুর্গা যুদ্ধ করছেন অসুরের সঙ্গে, কুরুক্ষেত্রে চলছে ধর্মযুদ্ধ, পিতৃসত্য পালনের জন্য রামচন্দ্রকে শিকার হতে হচ্ছে কত ক্লেশ ও দুর্ঘটনার। যা কিছু শাস্ত্র বর্ণিত ঋষি-মুনিদের লেখাতে ঘটেছে সমস্তটাই কিন্তু ওই আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক তাপ বা দুঃখেরই কলরব। জীবনটা আমাদের আদতে এমনই।
সাধকেরা বলছেন, ভালো খাওয়া-দাওয়া, আয়-উন্নতি, সম্পত্তি-সুখ বেড়ে যাওয়াটা মানুষের পুরুষকার নয়। পুরুষকার হল ত্রিতাপ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করাটা— ‘ত্রিভিস্তাপৈঃ নিবৃত্তি পুরুষার্থ।’ সন্তেরা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে রয়েছে তিনটি শ্রেণি— দেবশ্রেণি, মনুষ্যশ্রেণি ও পশু বা অসুরশ্রেণি।’
দেবশ্রেণির মানুষ যারা, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়, অপরের দুঃখে এদের প্রাণ কাঁদে, কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলে না, হাসিখুশি, পরিবেশকে আনন্দে রাখতে চায়, নিজেকে সবসময়ে আড়ালে রেখে চলে, প্রবল ঈশ্বরনির্ভরতা। এরা দৈবীগুণসম্পন্ন হয়। এদের মধ্যেই থাকে পূর্বজন্মের সংস্কারগুলো। পূর্বজন্মের সংস্কার অনুসারেই বিদ্যা, ধন, ভার্যা আগে-আগে ধাবমান হয়। বিনা চেষ্টাতেই এগুলি মিলে যায়। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অনেক সময় পূর্বজন্মের সংস্কারের চিহ্ন পর্যন্ত থাকে, তা দেখে মহাত্মারা তার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা বলে দিতে পারেন।
কাশীর সুমেরু মঠের মোহন্ত দণ্ডিস্বামী নিগমানন্দ তীর্থ মহারাজ তীর্থ পর্যটন উপলক্ষে কাশী ছেড়ে শ্রীক্ষেত্রে যাত্রা করেন। সেখান থেকে তারাপীঠ যাওয়ার পথে মৌড়েশ্বর গ্রামের পাশে জঙ্গুলে হাতায় একজন বালককে তিনি ঘুমিয়ে থাকতে দেখলেন। ঘুমন্ত বালকের মাথায় তখন একটি কৃষ্ণকায় কালসর্প ফণা ধরে রোদের হাত হতে তার মুখখানি বাঁচানোর চেষ্টা করছে। দণ্ডিস্বামী বুঝলেন বালকের মধ্যে রয়েছে রাজলক্ষণ অথচ সে কেন বনে-বাদাড়ে গোরু চরাচ্ছে! ঘুম ভাঙলে বালকের সঙ্গে কথা হল সন্ন্যাসীর। বাড়িও গেলেন তার। গিয়ে বুঝলেন এবার, বালক বসন্তের দীক্ষামন্ত্রখানিতে একখানি গুরুতর ভুল আছে। বসন্তের মাকে সঙ্গে করেই দণ্ডিস্বামী তাই গেলেন গুরুবাড়ি। গিয়ে বললেন বালকের মন্ত্রটি শুদ্ধ করে দিতে। গুরু তো রাজিই হলেন না। উল্টে বসন্তকে ‘অল্পায়ু হও’ বলে অভিশাপ দিয়ে বসলেন। সেদিনই সন্ন্যাসী বালক বসন্তকে সিদ্ধমন্ত্র দিয়ে সাত দিনের ভেতরে রাজা হওয়ার কথা বলে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে এও বলে গেলেন বসন্ত রাজা হলে তিনি এসে ওকে অভিষিক্ত করে যাবেন।
চারদিনের মাথায় সকালবেলায় হঠাৎ একটি বাজপাখি উড়ে এসে বসন্তের হাতে বসল। সে পাখিটি ঘরে এনে গোপনে রেখে দিল। পাখিটি ছিল ময়ূরাক্ষী নদীর কিনারায় তাঁবু করে থাকা নবাবের বেগমের। নবাবরা ফিরছেন শ্রীক্ষেত্র থেকে রাজধানী বাংলায়। বেগম মহলের তাঁবু থেকে প্রিয় বাজ উড়ে গেল সেদিন বেগম সাহেবার। পোষা বাজ হারানোর কান্নায় সাহেবা ভেঙে পড়লে নবাব খবর করলেন বাজ ধরে দিলেই পুরস্কার।
বসন্ত নবাবকে পাখি ফেরত দিয়ে পেলেন এখানকার ভূখণ্ডটি পুরস্কার। রাজা হলেন তিনি এলাকার। গুরু দণ্ডিস্বামীর আশিসে মৌড়েশ্বরে নবাবের প্রতিশ্রুত নিষ্কর রাজ্য স্থাপন হয়ে গেল। বাজের বদলে রাজ্য এল বলে মহারাজের নাম হল বাজবসন্ত। নিষ্কর রাজ্যসীমাই পরবর্তীতে লোকমুখে বদলে গেল নানকর রাজ্যে। নানকর তালুক বর্ণনার পরে এই কাহিনিই অন্তর্ভুক্ত হল বীরভূমের ইতিহাসে। রাজারা সব বিভিন্ন জায়গায় রাজধানী স্থাপনের শেষে বিশাল মল্লভূমের প্রান্তসীমায় জঙ্গল সাফা করে রাজধানী গড়ে তোলেন। রাজপরিবারের সঙ্গে কাশীর সুমেরু মঠের মোহন্ত-পরম্পরার যোগসূত্র। গুরুর কথামতো তাই রাজপরিবারের লোকেরা রাজধানীতে নিজেদের বসবাসের জন্য দালান কোঠা তৈরি না করিয়ে বংশানুক্রমে শতাধিক দেবদেবীর মন্দির বানিয়েছিলেন। কালের ক্ষয় বুকে নিয়ে ভগ্নাবশিষ্ট বেশ কিছু মন্দির তাঁদের অনুপম কীর্তির সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে। এ সমস্তটাই দেবশ্রেণির মানুষের কীর্তিকলাপ।
দেবশ্রেণির মানুষের সঙ্গে পশু বা অসুরশ্রেণির মানুষ যদি মিশতে চায়, তা তারা কখনও পারবে না। কিন্তু মানুষ রয়েছে মাঝখানে, তাই সে ইচ্ছে করলে দেবশ্রেণির সঙ্গে মিশতে পারে, আর পশু বা অসুরশ্রেণির সঙ্গেও মিশতে পারে। সেইজন্যই মানুষের উচিত আপন আপন স্বভাবের চেয়ে উচ্চকোটির মানুষের সঙ্গ করা। পশুশ্রেণির মানুষ যারা দিনরাত তারা নেশা আসক্তি ও খারাপ কর্মে মেতে আছে, আর মানুষশ্রেণিরা সক্কলে ইন্দ্রিয়বন্ধনে আটকে আছে। দেবশ্রেণির মধ্যে রয়েছে সত্ত্বগুণ, মানুষগণ রজগুণ প্রধান এবং পশুরা বা অসুরেরা তমগুণ প্রধান। মানুষ রয়েছে মাঝখানে। মানুষ চেষ্টা করলে দেবতা হতে পারে অর্থাৎ ঊর্ধ্বগতি লাভ করতে পারে অথবা নিম্নগতি হয়ে পশু বা অসুর পর্যায়ে চলে যেতে পারে। সাধারণত নীচের সঙ্গে নীচই মিলবে, জলের সঙ্গে মিলবে জল, আর পাঁকের সঙ্গে মিলবে পাঁক। তুমি যদি ভালোর সঙ্গ করতে চাও, তাহলে তোমাকে ভালো হতে হবে, নইলে তুমি ভালোর সঙ্গে মিশতে পারবে না। সন্তেরা বলেন—
‘য্যায়সা কে ত্যায়সা মিলে
নীচকে মিলে নীচ,
পানিমে পানি মিলে,
কীচড়সে মিলে কীচ।’
অদৃষ্ট, নিয়তি, দৈব
ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধের প্রয়োজনে বিমানঘাঁটি তৈরি করবার জন্য ফেণী শহরের চারদিকে ৩৫টি গ্রামের মানুষদের বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নোটিস জারি করেছে। ওই সকল গ্রামের সমস্ত পরিবার বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। মালাকার পরিবারও নোটিশপ্রাপ্ত হয়েছে। তাদের বাড়ির অতি সংলগ্ন উত্তর দিকে একটি বিরাট ধানি জমির মাঠ বিমানঘাঁটি তৈরির স্থানরূপে সরকার নির্ণয় করেছে। অতএব মালাকার পরিবারের মানসিক অবস্থা কী হতে পারে সহজে অনুমেয়। এই পরিবারের জ্যেষ্ঠভ্রাতা রায়সাহেব শচীন্দ্রকুমার মালাকার প্রথম দীক্ষা নিয়েছিলেন মহাত্মা রাম ঠাকুরের কাছে ১৯৩৩ সালে। ধীরে ধীরে এই পরিবারের সকলেই আজ ঠাকুরের আশ্রিত। আজ প্রায় দশ বছর পর যখন এই ঘোরতর বিপদ তখন রক্ষা একটাই মহাত্মা রাম ঠাকুর উপস্থিত আছেন মালাকার বাড়িতেই। তাই যা করতে হয় ঠাকুর করাবেন এই ভরসায় মালাকার বাড়ির সকলে শান্তিতে আছে। নোটিসপ্রাপ্ত লোকেরা দলে দলে এসে রাম ঠাকুরের পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘বাবা, এখন আমরা কী করব? বাড়িঘর ছেড়ে উঠে যাওয়ার জন্য সরকার থেকে দু’বার নোটিস পেয়েছি। সরকার এখানে বিমানঘাঁটি করবেই। আমরা বাড়িতে থেকেও অতি কষ্টে পরিবার পালন করছি। এমতাবস্থায় বাড়িঘর ছেড়ে স্ত্রী-পুত্র পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কী করব দিশা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা অসহায়, সম্বলহীন, অর্থহীন নিরুপায়। চোখে অন্ধকার দেখছি। আপনার শ্রীচরণে স্মরণ নিলাম। আমাদের কী গতি করবেন করে দেন।’ রাম ঠাকুর সহানুভূতিসূচক মৃদু মধুর গলাতে প্রবোধ দিলেন, ‘আপনারা অধৈর্য, অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন কেন? সংসার চালাতে গেলে কখনও সুখ, কখনও দুঃখ আসে। সুখের সময় সুখ, দুঃখের সময় দুঃখ ভোগ করে যেতে হয়। এইজন্য চঞ্চল হতে নেই। চঞ্চলতা বাড়লে কষ্ট ভোগ বেড়ে যায়। ভাগ্যকে মেনে ধৈর্য ধরে থাকেন। এই বিপদ সমষ্টিগত। প্রবল ঝঞ্ঝায় বাড়িঘর উড়িয়ে নিলে নিরাশ্রয় হয়ে কোথাও গিয়ে সাময়িক আশ্রয় নিয়ে কাল যাপন করতে হয়। পরে সময় সুযোগ আসলে পুনরায় বাড়িঘর করে বসতি করে। তেমনই যুদ্ধে যখন পড়েছেন, বাড়িঘর ছেড়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেন সরকারের। ক্ষতিপূরণ নিয়ে দূরবর্তী একটা আশ্রয় করে কিছুকাল বসতি করেন গিয়ে। যুদ্ধ বিপদ শেষে সরকার পুনরায় বাড়ির জায়গা, জমি সব দিয়ে দেবে। বিমানঘাঁটি সরকার ছাড়বে না। অতএব বিপদের সময়টা ধৈর্যের সঙ্গে কাটিয়ে দেওয়া সমীচীন। ধৈর্যহারা হবেন না। এই বিপদে ধৈর্যই একমাত্র সহায়। ভয়ের কী আছে? ভয়ের কিছু দেখি না।’ ঠাকুরের কাছ থেকে সান্ত্বনা বাক্য পেয়ে একদল তো ফিরে গেল, অপর দল এসে উপস্থিত হল পরদিন। সমস্ত গ্রাম থেকেই কেউ না কেউ রোজই তখন আসছে মালাকার বাড়িতে। সবাই ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘বাবা, এই বিপদে কোথায় যাব, কী করব, কিছু ঠিক করতে পারি না বলে আপনার পদপ্রান্তে ছুটে এসেছি।’ রাম ঠাকুর সকলকে বললেন, ‘আপনারা এত অধৈর্য হয়ে পড়ছেন কেন? বিপদ আসে পুনরায় চলে যায়। চিরস্থায়ী ভাবে থাকে না। সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হরিশচন্দ্রও একদা সর্বহারা হয়ে কাশীধামে ডোমের অধীনে আশ্রয় নিয়ে শবদাহের কাজ করেছিলেন। তিনি কী ছিলেন, কী হয়েছেন, কী করছেন এইজন্য কোনও অনুতাপ, অনুশোচনা ছিল না। বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে পড়েছিলেন। স্ত্রী-পুত্রহারা হয়েও ধৈর্যচ্যুত হননি। ভোগকাল অন্ত হওয়ার পর পুনঃ সব ফিরে পেয়েছিলেন। শ্রীবৎস, চিন্তা, নল, দয়মন্তী, সাবিত্রী, সত্যবান এই সকল দৃষ্টান্ত থেকে একই উপদেশ লাভ করা যায়। সকলে স্বীয় কপালকে ধৈর্য সহকারে মান্য করে, আপদকাল কর্তন করেছেন। জন্মের সঙ্গে কপাল নিয়ে জন্ম নিয়েছেন। যে কোনও স্থানে যান কপালখানা আপনার সঙ্গে যাবেই। কপালখানা রেখে কোথাও যেতে পারবেন না। সুতরাং ধৈর্য ধারণ করে কপালের লিখন মান্য করে নাম নিয়ে পড়ে থাকেন গিয়ে। এই কপালকেই ভাগ্য, অদৃষ্ট, নিয়তি, দৈব বলে। নামের অমোঘ, অসীম শক্তি। অতএব এদিক সেদিক ছোটাছুটি না করে ধৈর্য সহকারে নাম সহায় সম্বল করে থাকেন গিয়ে। গুরু বিনা নান্য পন্থা বিদ্যতে। ভয় কী?’
১৯৪২ সালের অক্টোবর মাসে আরও কয়েকজন গুরুভাই মালাকার বাড়ি এসে বিপদের কথা জানালে রাম ঠাকুর বললেন, ‘জীবনে চলার পথে উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ একত্র হয়। সেজন্য ভয় করলে চলবে কেন? যুদ্ধ আসন্ন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হবে। ফেণী শহরকে কেন্দ্র করে জাপান প্রবল এরোপ্লেন যুদ্ধ চালাবে। শেষ দিনের এরোপ্লেন যুদ্ধে জাপানের ও ব্রিটিশের অনেক প্লেন নষ্ট হবে। এরপর এখানে আর যুদ্ধ হবে না। দেখা যায় সুভাষ বোসের ফৌজ ডিমাপুর পর্যন্ত এগিয়ে আসবে। শেষ অবধি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য রসদের ও অস্ত্রের অভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়বে। অবশেষে যৌথ শক্তির আক্রমণে জাপান একেবারে পরাস্ত হবে। ব্রিটিশের প্রয়োজনে বাড়িঘর ছেড়ে দিয়ে অন্য স্থানে গিয়ে যুদ্ধ কাল কাটান। যুদ্ধ থেমে গেলে পুনরায় সব পেয়ে যাবেন। কালাকাল যোগে ব্রিটিশও থাকবে না। আপনারা নির্ভয়ে থাকেন।’ রাম ঠাকুর নীরব হলেন। গুরুভাইরা সব ঠাকুরের মুখে আশ্বস্ত হয়ে বল ভরসা ফিরে উদ্যোগী হলেন বাড়িঘর ছাড়ার।
ধলহারা মেদিনীপুর শহর থেকে দশ কিলোমিটার দূরের অখ্যাত গ্রাম। সেখানে পাগলি মায়ের কাছে রোজ জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ। মায়ের শরীর থেকে সোনালি আভা বের হয়। এক ঢাল হাঁটু অবধি নামানো চুলও তাঁর সোনালি রঙের। কপালে বড় সিঁদুরের ফোঁটা, সিঁথিতে সিঁদুর, বেঁটেখাটো। নয় ইঞ্চির অষ্টধাতুর গৌরী মূর্তি তিনি পুজো করেন। পুজোর ধরন বড়ই অদ্ভুত। তামার একটা ছোট্ট বাটিতে ছটাকখানিক মধু নিয়ে তিনি মন্দিরে ঢোকেন দুপুর বারোটায়। ভক্তশিষ্যরা জড়ো হয়ে যান আগে থেকেই। নানান দূরবর্তী জায়গা — ত্রিপুরা, অসম, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, কলকাতা থেকেও মানুষ আসেন। মায়ের সামনে গিয়ে যিনিই দাঁড়ান, তাঁর নাম, কোথা থেকে এসেছেন, কী জন্য এসেছেন, কোন সমস্যায় পড়ে এসেছেন, প্রতিকার কী, গড়গড় করে সমস্ত বলে দেন।
মন্দিরে ঢুকে পাগলি মা ইষ্টদেবীকে গালাগাল করতে থাকেন, ‘কী লো! ...! সবাই জানে শিব তোর...! তাকেই তুই পায়ে দলছিস। ওলো ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ডোদরি, নে নে হাঁ কর, আগে তোর পেটের জ্বালা মেটাই’— বলেই তিনি আঙুলে করে মধু গৌরী মূর্তির ঠোঁটে ঠেকান। সঙ্গে সঙ্গে চুক করে আগুনের স্ফূলিঙ্গ বের হয়। মায়ের কাছে আসা সকলেই রোজ এ দৃশ্য দেখেন অপার বিস্ময়ে।
বাদাড় গ্রামের মতিন মাইতি বি.এ পাশ করে এম. এ পড়তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়। জমিজমা আছে, কৃষিজীবী পরিবার। থাকবে কোথায়? কলকাতায় ব্যবস্থা হচ্ছে না। পাড়ার একজন বললেন, ‘কলকাতায় পাগলি মায়ের অনেক শিষ্য আছে। মাকে গিয়ে ধরো। থাকার জায়গা তিনিই জুটিয়ে দেবেন।’
মতিন বাবা মাকে সঙ্গে করে গেল পাগলি মায়ের কাছে। দেখল বিশাল লাইন, শুধু মানুষ আর মানুষ। বাবা মাকে নিয়ে সেও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। চড়া রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মতিনের বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। মতিন জল এনে চোখে মুখে ঝাপটা দিচ্ছে, এর মধ্যে রব উঠছে পাগলি মা আসছেন। মায়ের সর্বক্ষণের সঙ্গী নগেন সাধু এসে বললেন, ‘বাদাড় থেকে আসা ঈশান মাইতি হাত তোলো।’ মতিন বাবার হয়ে হাত ওঠালে পাগলি মা এসে বললেন, ‘একে কোলে করে অশ্বত্থ গাছতলায় বসিয়ে দে। ভোগ এনে খাওয়া। এক্ষুনি এক্ষুনি। আগে এরা তিনজন খাবে তারপর গৌরী খাবে।’ মতিনের দিকে তাকিয়ে মা বললেন, ‘তোর এম.এ পড়া হবে না বাছা। তোর সন্ন্যাস বৃত্তি। ঝাড়েশ্বরের থানে, তমাল নদীর ধারে পড়ে থাকগে যা। ঝাড়েশ্বর লোক জুটিয়ে দেবেন।’
আশ্রমে ফিরে গেলেন পাগলি মা। নগেন সাধু বললেন, ‘তোমরা খাওয়া দাওয়া সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে বাড়ি ফিরে যাও। পাগলি আমাদের স্বয়ং ব্রহ্মময়ী। বেটি একবার যা বলে দিয়েছে তার আর রদবদল হবে না। আমি ছিলাম ডাকাত। বেটির পাল্লায় পড়ে সাধু বনে গেছি। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে মাকে দেখছি তো।’ মতিন বলল, ‘আপনার কথা মানতে পারলাম না। দৈবই সব নয়, পুরুষকার বলে একটা কথা আছে। আমি এম.এ তে ভর্তি হয়েই মার সঙ্গে এসে দেখা করব।’ মতিনের কথা শুনে সাধু অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। হাসতে হাসতে ছড়া কাটলেন — ‘কত গেল রথ রথী, শেওড়াতলায় চক্কোত্তি।’
ধলহারা থেকে হতাশ হয়ে বাদাড় ফিরছে মতিনরা। বাড়ি যেতে যেতে বাবা ছেলেকে বললেন, ‘মতি! তুই কিছু ভাবিসনি। তুই আমার একমাত্র ছেলে। আমার একশো বিঘা জমি আছে। জমি বেচে আমি তোর পড়ার খরচ চালাব, মেসের খরচা চালাব। তুই কয়েকদিন পর কলকাতা চলে যা। একটা মেসে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে এম.এ তে ভর্তি হয়ে যা।’
বাড়ি ফেরার তিনদিন পরে মতিন প্রবল জ্বরে পড়ল। গায়ে বসন্তের গুটি দেখা দিল। মায়ের স্নেহস্পর্শে সুস্থ হওয়ার পর মতিনের মা পড়লেন মারাত্মক বসন্ত রোগে। কবিরাজ বললেন, ‘রক্তচামদল বসন্ত।’ সারা শরীরে লাল লাল ঘামাচির মতন গুটি। তিন দিনের মাথায় মতিনের মা মারা গেলেন। বাবার শরীরে বসন্ত দেখা দিল। এগারো দিনে তিনিও চলে গেলেন। মতিনের সাধ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে বাড়ি ছেড়ে শ্মশানের পথে ঘুরতে ঘুরতে কালী মন্দিরে আশ্রয় নিল। মন্দিরের পেছনে নদী বয়ে যাচ্ছে। একজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কোন নদী?’ লোকটি উত্তর দিল, ‘তমাল নদী, আপনি ঝাড়েশ্বরের থান যাবেন তো?’ শোনা মাত্র মতিনের পাগলি মায়ের কথা মনে পড়ল। নদীতে স্নান করে সে গেল ঝাড়েশ্বরের থানে। এক সাধুর সঙ্গে চলে এল কাশীতে। সাধু তাঁকে মন্ত্র দিলেন। অঘোরী আশ্রমে থাকার পর মতিন এল প্রয়াগে কুম্ভমেলায়। দেখা হল নাগা সাধু নগেন্দ্র ভারতীর সঙ্গে। নাগা সাধু মতিনকে নিয়ে এলেন নর্মদার তটের সিদ্ধ মহাপুরুষ কমলভারতীজির গদিতে। তার সন্ন্যাসদীক্ষা হয়ে নামকরণ হল মতীন্দ্র ভারতী। সন্ন্যাস নেওয়ার পর খবর পেলেন বাসন্তী পুজোর দিন যোগাসনে বসে পাগলি মা মহাসমাধিতে প্রবেশ করেছেন। দেহ রাখার পনেরো দিন আগে শিষ্যদের বলে দিয়েছিলেন দেহান্তের তিথি, বার, ক্ষণ। হুবহু মিলে গিয়েছিল।
নিয়তির হাত থেকে কীভাবে মিলবে পরিত্রাণ
সমস্ত প্রজ্ঞাবানেরা সমস্বরে বলেছেন, বিপদে পড়লে বিষণ্ণ হয়ে পড় না। তাপিতও হয়ে ওঠ না। সন্তাপ নিয়ে এলে লাভ কিছু হবে না, দুঃখটা আরও বেড়ে যাবে। সন্তাপে ইন্দ্রিয়, মন একেবারে শুকিয়ে যায়। তাতে শরীরে দেখা দেবে রোগ। সেইজন্য দুঃখ, বিপদকালে আনন্দে থাকার চেষ্টা করতে হয়, এতে সময়মতো পরিস্থিতি ঠিক বদলাতে শুরু করে। ঘরে আরও জ্বাললে অন্ধকার আপনা থেকেই চলে যায়। সুখ এলে দুঃখ সরে যায়। অনেকেই অবস্থার বিপাকে সাধুসন্তের কাছে ছুটে যান। জিজ্ঞেস করেন, ‘অদৃষ্টের কিছু প্রতিকার আছে কি?’ অদৃষ্টের কিছু প্রতিকার নেই। কিন্তু অদৃষ্টের উপর মানুষ পুরোপুরিভাবে বসে থাকতে পারে না। অদৃষ্টের নিবারণ করবার জন্যে চেষ্টা করতে হবে— পুরুষকার প্রয়োগ করতে হবে। অদৃষ্ট, দৈব, নিয়তির ওপরে দায়ভার না চাপিয়ে কর্তব্যকর্ম করে যেতে হবে। পুরুষকার প্রয়োগ করেও যখন ফল পাওয়া যাবে না, তখন অদৃষ্টের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। না হলে জীবনে শান্তি, বিশ্রান্তি লাভ করা সম্ভব হবে না। অদৃষ্টে কী আছে, তা তো লোকে জানে না। সাধু মহাত্মারা বলেন, ‘অদৃষ্টের যদি প্রতিকার থাকত তাহলে নলরাজা, শ্রীরামচন্দ্র যুধিষ্ঠিরেরা কেন এত দুঃখ ভোগ করতে গেলেন? তাঁরা কি মূর্খ, নিরুপায়, বুদ্ধিহীন মানুষ ছিলেন? তা তো নয়, তাঁদেরও তো যথেষ্ট শক্তি, সামর্থ ও বুদ্ধি ছিল, তবু কিছু করতে পারলেন না। তাঁদের অদৃষ্টে যা ছিল তা ভোগ করতেই হল।’
মহর্ষি ব্যাসদেবের একটি সেবক ছিল— ব্যাসশ্চ দাসশ্চ। সেবকটি অনেকদিন ধরে ব্যাসদেবের সেবাযত্ন পরিচর্যা করছিল। একদিন সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রচণ্ড জ্বর, কিছুতেই সারে না। ব্যাসদেব খুব দুশ্চিন্তায় পড়লেন। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না, বুঝতে পারছেন না কীভাবে তার সেবকটিকে সুস্থ করা যাবে। অনেক ওষুধপত্র চিকিৎসা সব তো হল, কিন্তু কোনও উপকার হল না। ব্য?
জীবন শুধুমাত্র নিজের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের ওপরই নির্ভরশীল নয়, প্রাকৃতিক ও অন্যদের কাজের ওপরও কিছুটা নির্ভর করে। নানাপ্রকার বিরুদ্ধ অবস্থা প্রত্যেক মানুষের জীবনে কোনও না কোনও সময়ে আসবেই, কেউ যদি মনে করে এই সব অবস্থা একেবারেই আসবে না, তবে আমি শান্তি লাভ করব— সে কখনওই সেই শান্তি পাবে না। কারণ বিরুদ্ধ অবস্থা কিছু না কিছু আসতে থাকবেই। ধনী হোক আর দরিদ্র, সন্ন্যাসী হোক আর গৃহী, প্রত্যেকেই কোনও না কোনও ভাবে ওইরূপ অশান্তির কারণ— নানা বিরুদ্ধ অবস্থা আসবেই। কিন্তু যিনি এই সব বিরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে স্থির থেকে সমস্ত কিছুকেই সমানভাবে গ্রহণ করতে অভ্যাস করবেন এবং তাঁর যে পরিমাণে আয়ত্ত হয়, সেই পরিমাণে তিনি শান্তিলাভ করবেন। এটা সব সময়ের জন্য যাঁরা মাথাতে রাখতে সক্ষম হবেন— জীবনে আসা নানান বিরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে আমি আমার মনকে স্থির ও প্রসন্ন রাখতে অভ্যাস করব, আর মনকে চঞ্চল করলে বা অসন্তুষ্ট করলেই তো তার আসা বন্ধ হবে না অথচ এই চাঞ্চল্য ও অসন্তুষ্টির জন্য অশান্তি আরও বেড়ে যাবে তাঁরাই জীবনটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন। যে কোনও অবস্থাই আসুক স্থির থেকে নিজের সাধ্যমতো কর্তব্য করে যেতে চেষ্টা করতে হবে আমাদের, বিচলিত হলে চলবে না। যেমন পাহাড়ের উপরকার তীর্থস্থলে পৌঁছতে হলে কখনও উঁচু শিখরে উঠতে হয়, আবার কখনও বহু নীচে নামাতেও লক্ষ্যস্থানে এগিয়ে যাওয়াই হয়, মানুষের মনের গতিমুখ আর জীবনের গতিপথটা অনেকাংশে ঠিক তেমনই। মন কোনও কোনও পরিস্থিতিতে আশা-উদ্রেককারী যে সমস্ত ভাবনা, তা থেকে সরে এসে একেবারে হতাশার গহীনে তলিয়ে চলে যায়, জীবনের পথও ওইরকম ভাবেই মনের মতোই আমাদের অতি দুর্গম, উঁচু-নিচু অবস্থার মধ্যে দিয়েই চলে। ওই সব দিকে মোটেই ভ্রূক্ষেপ না করে যাঁরা নিজের সাধ্যমতো কাজ করে যান, চেষ্টা করতে করতে নিশ্চিত থাকার অভ্যাস করতে পারেন তাঁরাই একমাত্র বাধা বিপত্তিগুলোর মোকাবিলা করতে সক্ষম। সকল অবস্থায়— সুখ, দুঃখ, জয়, পরাজয়, লাভ, ক্ষতি ইত্যাদি সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস করাটাই একটা যোগ। সর্বাবস্থায় স্থির, ধীর ও শান্তচিত্তে যিনি থাকতে জানেন তাঁর থেকে বড় যোগী, সন্ন্যাসী আর দ্বিতীয় কেউ নন।
সিদ্ধাচার্য সরহপা মনস্থ করলেন পাহাড়ে গিয়ে তপস্যায় বসবেন। ঘরে নানাবিধ কোলাহল আর সাংসারিক বিপত্তির কারণে তাঁর সাধনা ঠিকমতো এগচ্ছে না। স্ত্রী বললেন, ‘নির্জনবাসেই শুধু সাধনা হয় না কি?’ সরহপা বললেন, ‘তবে? সাধনা কীভাবে হবে শুনি?’ স্ত্রী বললেন, ‘এই যে বারো বচ্ছর সমাধি-সাধন করলে, সমাধি ভাঙার পর তুমি বল্লে কী?’ সরহপা বললেন, ‘মূলোর তরকারি খাব।’ স্ত্রী বললেন, ‘তাহলেই ভেবে দেখ, এখনও তোমার খাওয়ার চিন্তা যায়নি। সামান্য জিনিস থেকেই তুমি মন সরাতে পারলে না, পাহাড়ে গিয়ে করবেটা কী শুনি?’ সরহপার চোখ খুলে গেল স্ত্রীর কথায়। তিনি উপলব্ধি করলেন নির্জন জায়গাতে গিয়ে থাকলেই মনকে কোলাহল আর কামনার বৃত্তি থেকে তো বের করা যাবে না। সংসারে থেকেই বৃত্তি ধ্বংস করতে হবে।
ধৈর্য ধরে কষ্ট সহ্য করে গেলে তার ফল ভালোই হয়। পাণ্ডবরা অত ক্লেশ সহ্য করেছিলেন বলেই তাঁরা সুখী হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধে পাণ্ডবরা জয়লাভ করেছেন বটে, কিন্তু তাঁদের আপন বলতে আজ আর কেউ নেই। পাণ্ডববংশ সমূলে ধ্বংস করবার জন্য অশ্বত্থামা অমানুষিক নিষ্ঠুরতায় দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রদের ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেছেন। এই অবস্থার মধ্যেও পাণ্ডবেরা কর্তব্যকর্মে অবিচল। পরলোকগত আত্মীয়দের জন্য তাঁরা পারলৌকিক কর্ম করতে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গঙ্গার তীরে এসেছেন। কাজ শেষ হলেই শ্রীকৃষ্ণ ফিরে যাবেন দ্বারকায়। এই সংবাদ পেয়ে পাণ্ডব জননী কুন্তী বললেন, ‘বলে শেষ করতে পারি না কতবার কত বিপদ থেকে তুমি রক্ষা করেছ আমাদের। কখনও বিষ থেকে, কখনও আগুন থেকে, কখনও শত্রুর হাত থেকে, বনবাসের কষ্ট থেকে, তারপর যুদ্ধের মধ্যে বারবার কত মহারথীদের অস্ত্র থেকে আমার ছেলেদের তুমি বাঁচিয়েছ। এখন তো বিপদ কেটে গেছে তাই এবার তুমি চলে যাচ্ছ। বিপদই আমার হোক ‘শশ্বৎ’— সর্বদা। নিরন্তর আমার বিপদ যেন লেগে থাকে, তাহলে ‘তত্র তত্র জগৎগুরু’, যেখানেই বিপদ সেখানেই তুমি জগৎগুরু আমার পাশে এসে দাঁড়াও। বিপদের মধ্যে তোমার সেই দর্শন আমি লাভ করেছি তাই আর ভবদর্শন করতে চাই না। আমি চাই এমনিভাবে বিপদ লেগে থাকুক সদাসর্বদা আমাদের, আর তোমাকে কাছে পাই দেখে প্রাণ জুড়োই, মুক্তি পাই।’
ভাগবতের মধ্যে রয়েছে ভগবানের প্রতি ভক্ত কুন্তীর এই স্তব। কুন্তীর মুখে এই প্রার্থনা শুনে তাঁর মনমতো অভিপ্রায় জেনে, শ্রীকৃষ্ণ মধুর হাসিতে সকলকে আনন্দে আপ্লুত করে রথ থেকে নেমে, অন্তঃপুরে গিয়ে প্রবেশ করলেন।
নারদপঞ্চরাত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মানুষের সুখ- দুঃখ, রোগ-শোক, শুভ-অশুভ আসছে প্রারব্ধ কর্ম থেকে। ‘প্রাক্তনাৎ সুখদুঃখঞ্চ রোগঃ শোকো ভয়ং পিত।’ প্রারব্ধ কর্মের ফেরে দুঃখাদি ভোগ আসে আমাদের জীবনে। আমরা এর নাম দিই— নিয়তি, অদৃষ্ট, ভাগ্য ইত্যাদি। এই প্রাক্তন ফলভোগ জ্ঞানী, যোগী, সাধক, সন্তদের পর্যন্ত করতে হয়। এতে বিচলিত হয়ে পড়লে ভোগকাল আরও বেড়ে যায়। ভোগকাল কেটে গেলে আপনা হতেই সব রোগশোকাদি দূর হয়ে যায়। অনুকূল অবস্থার মধ্যে মনকে প্রসন্ন ও শান্ত রাখতে সবাই পারে, কিন্তু একটু ক্লেশের অবস্থা তৈরি হলেই অত্যন্ত অসহায় ও বিপন্ন বোধ করতে থাকি আমরা নিজেদেরকে। যাঁরা বিপদ ও ক্লেশকে অকাতরে ধৈর্য সহকারে গ্রহণ করে তার মধ্যেও মনকে শান্ত রাখতে অভ্যাস করেন, বিপদ ও ক্লেশের অবস্থা আসলে তাঁরা তা ভগবৎ কৃপা বলে মনে করেন। কুন্তী এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের উৎকৃষ্ট শাস্ত্রসমূহের দিকেও যদি আমরা একটু ফিরে তাকাই তাহলে দেখব যে মহর্ষি বাল্মীকির মনে হঠাৎ করে দুঃখ হল শিকারি ব্যাধ ক্রৌঞ্চ— মিথুনের একটিকে তির দিয়ে মেরে ফেলবার কারণে। পাখিটি ছটফটিয়ে রক্তাক্ত হয়ে ডাল থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল বাল্মীকির চোখের সামনে। দুর্বৃত্ত দস্যু বাল্মীকির মনের অবস্থা এ দৃশ্যেই নিমেষে বদলে গেল। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল শ্লোক— রামায়ণের জন্ম হল এভাবেই। জীবন ঘুরে গেল তাঁর। দস্যু থেকে ঋষি হলেন তিনি। দুঃখের আতিশয্য, বিপরীত অবস্থাদি এভাবেই প্রেক্ষাপট বদল করে হঠাৎ করেই। মানুষের নিয়তি বদলে যায়।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় সমস্ত ভাই, বন্ধু, স্বজনদের মারতে হবে বলে অর্জুন বেঁকে বসলেন। তাঁর মনে অনুশোচনা এল, ‘প্রিয়জনদের হত্যা করে আমি সিংহাসন লাভ করব, দরকার নেই আমার রাজ্য লাভের। ছিঃ ছিঃ কত নিকৃষ্ট কীট হলে এরকম করা যায়!’ ত্রিকালজ্ঞ শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘আত্মীয় বিরোধ সর্বত্র। অবস্থার ফেরে জীবনে এ সমস্ত ঘটবেই। দমে গেলে চলবে না তো। স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে যুদ্ধ করতেই হবে।’ শ্রীকৃষ্ণ নিজেও তো কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধরথ চালনা করলেন। পাণ্ডবদের রক্ষা করলেন ঠিকই কিন্তু তাঁকেও চোখের সম্মুখে দেখতে হল যদুবংশের ধ্বংসলীলা। সমস্ত মানুষকেই বিরোধ, হিংসা, দ্বেষের ভেতর দিয়ে এগতেই হবে— জীবনের প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপটগুলো এমনই। এ সব অবস্থার হাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চোখের সামনে দেখলেন তাঁর বংশ ধ্বংস হয়ে গেল আর নিজের মৃত্যু ঘটল ব্যাধের হাত থেকে খসে যাওয়া সামান্য একটা তিরে। যিনি পরিস্থিতির নির্ণায়ক, কোনও না কোনও সময়ে তিনিই আবার ভীষণভাবে পরিস্থিতির শিকার। কিচ্ছু করবার থাকে না তখন। তখনই নিয়তি, অদৃষ্টের চিন্তাগুলো সব এসে ধাক্কা মারে আমাদের দুর্বল মনে।
পৌরাণিক ঋষিরা তাঁদের লেখায় এভাবেই অধ্যাত্মতত্ত্বের সম্মিলন ঘটালেন। সমস্ত কাহিনিমালাগুলো সেখানকার মানুষেরই নানারকম অবস্থার ফেরে। রাজা সুরথকে তাঁরই মন্ত্রীবর্গ রাজ্যচ্যুত করে তাড়িয়ে ছাড়ল। সমাধি নামের বিত্তশালী ব্যবসায়ী স্ত্রী-পুত্রের চক্রান্তে বনে চলে এলেন। সেখানে মেধস মুনির সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ ঘটল। মুনি তাঁদের বললেন, ‘মহামায়ার মায়ার গেরোতে মানুষের অবস্থান্তর ঘটে। দুঃখ-ক্লেশ ভোগ করে তারা।’ এভাবেই অবস্থার বিপাক নিয়েই জন্ম হল শাস্ত্রপুথি চণ্ডীর।
মহর্ষি ব্যাসদেবের মনে পর্যন্ত শান্তি নেই। বেদ বিভাগ করলেন তিনি, নানা পুঁথিটুথি লিখলেন— তাও তাঁর মনের ওঠা-পড়া যায় না। তিনি এবার শরণাপন্ন হলেন দেবর্ষি নারদের। মহামতি নারদ সবটা শুনে বললেন, ‘কলিকালে মানুষের আয়ু অত্যন্ত কম। যাগযজ্ঞ, যোগ, প্রাণায়াম সবরকম সাধনেই সিদ্ধ হতে সুদীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।’
মহর্ষি বেদব্যাসের এই বিষাদ ভাব থেকেই জন্ম হল ভাগবত শাস্ত্রের। সেখানে বলা হল, শরৎকালে যেমন সরোবরের জল আপনা আপনি পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনই শ্রীভগবানের মহিমা শ্রবণ করলে মানুষের মন আপনা থেকেই পবিত্র হয়ে যায়। দুঃখ-ক্লেশে, শোকে-তাপে জর্জরিত মানুষ অবস্থার বিপাকে পড়ে এখনও ছুটে যান সাধুসন্তদের কাছে ভাগবত কথা শুনতে। সকলকেই তাঁরা তখন বলেন, ‘পূর্বজন্মার্জিত কর্মের কারণে ভোগ আসলে কী আর করবেন? প্রারব্ধ ভোগ তো এড়ানো যায় না। ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষদেরও এটা ভোগ করতে হয়।’
শ্রীরামকৃষ্ণদেব, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর মতো মহাপুরুষেরাও অসহ্য রোগ যাতনা ভোগ করে গেছেন। ব্রজবিদেহী মোহন্ত সন্তদাস কাঠিয়া বাবাজি স্থূলদেহে শিবপুর আশ্রমে রোগ যাতনা ভোগ করতে করতে হাওড়া থেকে বৃন্দাবনে আর পৌঁছতে পারলেন না। ট্রেনের মধ্যেই তিনি দেহ ছেড়ে দিলেন। এজন্যই সন্তেরা বলছেন, ‘নানান বিপর্যয়ের মুখে হতাশ না হয়ে বরং এটাই মনে করো যে ভগবান তোমার প্রারব্ধের ভোগ ক্ষয় করে দিচ্ছেন। এই অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও মনে মনে সব সময় ইষ্টমন্ত্রটি জপ করতে চেষ্টা কর। ভোগের দ্বারা ভোগ ক্ষয় হয়েই অন্তরাত্মা পরিষ্কার হয়। এছাড়া আর দ্বিতীয় পথ নেই। জেনে রেখ, মরণের সঙ্গে যাবে কেবলমাত্র তোমার কৃতকর্ম। যা দেবে হাতে, ওহি যাবে সাথে। নিজে হাতে তুমি যাকে যেমন শুভকর্ম ও খারাপ কাজের যা কিছু ফলাফল দান করে যাবে, সেটাই তোমার সঙ্গে যাবে।’
য্যায়সা কে ত্যায়সা মিলে
মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের ওপর এসে পৌঁছয় নানান ধরনের আধিদৈবিক তাপ। হঠাৎ কোথাও কোনও বিদ্যুৎপাত হল— পরিবারের কেউ চলে গেল। ভূ-কম্পন, অতিবৃষ্টি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হল গোটা পরিবার। অতিবৃষ্টিতে কৃষকের সমস্ত জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেল। সুদে টাকা ধার নেওয়া ছিল। আর্থিক সঙ্কটে কেউ হয়তো আত্মহত্যা করে বসলেন। এই সমস্ত হঠাৎ আসা বিপদগুলোকে বলা হচ্ছে আধিদৈবিক তাপ। এই তাপ যে কোনও মানুষের জীবনে যখন-তখন লাগতে পারে। এর থেকে আর্থিক, মানসিক, শারীরিক, পারিবারিক সব ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সেখান থেকে জীবনে আসতে পারে দুর্যোগের বোঝা। শোক, দুঃখ-কষ্ট কত কী এসে ভালো অবস্থাকে একেবারে খারাপ করে দিতে পারে। পরিবার ছিল সচ্ছল— চলছিল ভালোই— বাড়িতে একদিন ডাকাত পড়ে লুট হল সর্বস্ব, পরিবারের কেউ ডাকাতি রুখতে গিয়ে খুন হয়ে গেল। দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ হারাল পরিবারের প্রধান। সমাজ বিরোধীরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিল বাড়ি। এই সব ডাকাতি-চুরি-ছিনতাই, খুন-রাহাজানি এগুলো হল মানুষের জীবনে আসা আধিভৌতিক তাপ। যে কোনও সময়ে আসা ঝড়ের মতো এগুলো ঢুকে গোটা পরিবারটাকে নষ্ট করে দিতে পারে। সুখ-শান্তি চিরতরে চলে যেতে পারে। সম্পর্ক ছিন্নের ব্যথা, অনেক দিনের যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, চূড়ান্ত অপমান, অসম্মানিত হওয়া, মামলা-মোকদ্দমা, বাপ- ঠাকুরদাদার আমলের জমি-বাড়ি-সম্পত্তি নিয়ে হট্টগোল— থানা-পুলিস, জেল-হাজত এই সমস্ত তাপ জীবনে যখন ঢুকে পড়ে বুঝতে হবে যে জীবনটা এবার আধিভৌতিক তাপের শিকার হল। শরীরে হুট করেই বড় ধরনের মারণব্যাধি এল, সমস্ত অর্থ বেরিয়ে গেল, ব্যাধি সারাতে জমি-বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হল কিংবা চরম দারিদ্রের মধ্যে চলে আসা একটি পরিবার, সেই পরিবারের ছেলেটা চাকরি পেল, একটু ঘর-বাড়ি স্বাচ্ছন্দ্য আসতেই একদিন ছেলেটা বাইক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেল। এই হঠাৎ আসা বিপদগুলো— পাহাড়ি ধসে তলিয়ে গেল বেড়াতে যাওয়া একটা সুখী পরিবার, বিয়ের কদিন আগে হবু বর-বউ কেনাকাটা করতে গিয়ে গাড়ির তলায় চাপা পড়ে চলে গেল— রোজই এমন মর্মান্তিক দুঃখ ও বিয়োগের তাপ এসে লাগে কোনও না কোনও পরিবারে। এগুলো হল আধ্যাত্মিক তাপ। এই তিন তাপে জর্জরিত মানুষের জীবন। কেউ বলতে পারে না, যে এই তিন তাপ থেকে সে মুক্ত। এগুলোই হল গিয়ে অদৃষ্ট, দৈব, ভাগ্য বা নসিব। অবশ্যম্ভাবী ঘটনা থেকে এই সমস্ত দুর্যোগ আসে মানুষের, জীবন একেবারে ছারখার করে দেয়। মানুষ এর নাম দিয়েছে নিয়তি। সাধকেরা বলছেন একে, ত্রিতাপ।
ত্রিতাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় কী?
এই তাপ থেকে মুক্ত হতে গেলে দরকার চেষ্টা। যাকে বলা হচ্ছে পুরুষকার প্রয়োগ। একমাত্র মানুষের পক্ষেই এটা সম্ভব। জীবন যুদ্ধে হারা-জেতা বড় কথা নয় এক্ষেত্রে। যুদ্ধটা করতেই হবে তোমাকে। এর হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই কারও। যদি পালিয়ে যাও, নিজেকে শেষ করে দাও— সেটাই হেরে যাওয়া। মানুষই একমাত্র যে কোনও পরিস্থিতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। মন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই— এ সবই তাই আমাদের শাস্ত্রে বর্ণিত। মা দুর্গা যুদ্ধ করছেন অসুরের সঙ্গে, কুরুক্ষেত্রে চলছে ধর্মযুদ্ধ, পিতৃসত্য পালনের জন্য রামচন্দ্রকে শিকার হতে হচ্ছে কত ক্লেশ ও দুর্ঘটনার। যা কিছু শাস্ত্র বর্ণিত ঋষি-মুনিদের লেখাতে ঘটেছে সমস্তটাই কিন্তু ওই আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক তাপ বা দুঃখেরই কলরব। জীবনটা আমাদের আদতে এমনই।
সাধকেরা বলছেন, ভালো খাওয়া-দাওয়া, আয়-উন্নতি, সম্পত্তি-সুখ বেড়ে যাওয়াটা মানুষের পুরুষকার নয়। পুরুষকার হল ত্রিতাপ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করাটা— ‘ত্রিভিস্তাপৈঃ নিবৃত্তি পুরুষার্থ।’ সন্তেরা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে রয়েছে তিনটি শ্রেণি— দেবশ্রেণি, মনুষ্যশ্রেণি ও পশু বা অসুরশ্রেণি।’
দেবশ্রেণির মানুষ যারা, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়, অপরের দুঃখে এদের প্রাণ কাঁদে, কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলে না, হাসিখুশি, পরিবেশকে আনন্দে রাখতে চায়, নিজেকে সবসময়ে আড়ালে রেখে চলে, প্রবল ঈশ্বরনির্ভরতা। এরা দৈবীগুণসম্পন্ন হয়। এদের মধ্যেই থাকে পূর্বজন্মের সংস্কারগুলো। পূর্বজন্মের সংস্কার অনুসারেই বিদ্যা, ধন, ভার্যা আগে-আগে ধাবমান হয়। বিনা চেষ্টাতেই এগুলি মিলে যায়। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অনেক সময় পূর্বজন্মের সংস্কারের চিহ্ন পর্যন্ত থাকে, তা দেখে মহাত্মারা তার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা বলে দিতে পারেন।
কাশীর সুমেরু মঠের মোহন্ত দণ্ডিস্বামী নিগমানন্দ তীর্থ মহারাজ তীর্থ পর্যটন উপলক্ষে কাশী ছেড়ে শ্রীক্ষেত্রে যাত্রা করেন। সেখান থেকে তারাপীঠ যাওয়ার পথে মৌড়েশ্বর গ্রামের পাশে জঙ্গুলে হাতায় একজন বালককে তিনি ঘুমিয়ে থাকতে দেখলেন। ঘুমন্ত বালকের মাথায় তখন একটি কৃষ্ণকায় কালসর্প ফণা ধরে রোদের হাত হতে তার মুখখানি বাঁচানোর চেষ্টা করছে। দণ্ডিস্বামী বুঝলেন বালকের মধ্যে রয়েছে রাজলক্ষণ অথচ সে কেন বনে-বাদাড়ে গোরু চরাচ্ছে! ঘুম ভাঙলে বালকের সঙ্গে কথা হল সন্ন্যাসীর। বাড়িও গেলেন তার। গিয়ে বুঝলেন এবার, বালক বসন্তের দীক্ষামন্ত্রখানিতে একখানি গুরুতর ভুল আছে। বসন্তের মাকে সঙ্গে করেই দণ্ডিস্বামী তাই গেলেন গুরুবাড়ি। গিয়ে বললেন বালকের মন্ত্রটি শুদ্ধ করে দিতে। গুরু তো রাজিই হলেন না। উল্টে বসন্তকে ‘অল্পায়ু হও’ বলে অভিশাপ দিয়ে বসলেন। সেদিনই সন্ন্যাসী বালক বসন্তকে সিদ্ধমন্ত্র দিয়ে সাত দিনের ভেতরে রাজা হওয়ার কথা বলে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে এও বলে গেলেন বসন্ত রাজা হলে তিনি এসে ওকে অভিষিক্ত করে যাবেন।
চারদিনের মাথায় সকালবেলায় হঠাৎ একটি বাজপাখি উড়ে এসে বসন্তের হাতে বসল। সে পাখিটি ঘরে এনে গোপনে রেখে দিল। পাখিটি ছিল ময়ূরাক্ষী নদীর কিনারায় তাঁবু করে থাকা নবাবের বেগমের। নবাবরা ফিরছেন শ্রীক্ষেত্র থেকে রাজধানী বাংলায়। বেগম মহলের তাঁবু থেকে প্রিয় বাজ উড়ে গেল সেদিন বেগম সাহেবার। পোষা বাজ হারানোর কান্নায় সাহেবা ভেঙে পড়লে নবাব খবর করলেন বাজ ধরে দিলেই পুরস্কার।
বসন্ত নবাবকে পাখি ফেরত দিয়ে পেলেন এখানকার ভূখণ্ডটি পুরস্কার। রাজা হলেন তিনি এলাকার। গুরু দণ্ডিস্বামীর আশিসে মৌড়েশ্বরে নবাবের প্রতিশ্রুত নিষ্কর রাজ্য স্থাপন হয়ে গেল। বাজের বদলে রাজ্য এল বলে মহারাজের নাম হল বাজবসন্ত। নিষ্কর রাজ্যসীমাই পরবর্তীতে লোকমুখে বদলে গেল নানকর রাজ্যে। নানকর তালুক বর্ণনার পরে এই কাহিনিই অন্তর্ভুক্ত হল বীরভূমের ইতিহাসে। রাজারা সব বিভিন্ন জায়গায় রাজধানী স্থাপনের শেষে বিশাল মল্লভূমের প্রান্তসীমায় জঙ্গল সাফা করে রাজধানী গড়ে তোলেন। রাজপরিবারের সঙ্গে কাশীর সুমেরু মঠের মোহন্ত-পরম্পরার যোগসূত্র। গুরুর কথামতো তাই রাজপরিবারের লোকেরা রাজধানীতে নিজেদের বসবাসের জন্য দালান কোঠা তৈরি না করিয়ে বংশানুক্রমে শতাধিক দেবদেবীর মন্দির বানিয়েছিলেন। কালের ক্ষয় বুকে নিয়ে ভগ্নাবশিষ্ট বেশ কিছু মন্দির তাঁদের অনুপম কীর্তির সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে। এ সমস্তটাই দেবশ্রেণির মানুষের কীর্তিকলাপ।
দেবশ্রেণির মানুষের সঙ্গে পশু বা অসুরশ্রেণির মানুষ যদি মিশতে চায়, তা তারা কখনও পারবে না। কিন্তু মানুষ রয়েছে মাঝখানে, তাই সে ইচ্ছে করলে দেবশ্রেণির সঙ্গে মিশতে পারে, আর পশু বা অসুরশ্রেণির সঙ্গেও মিশতে পারে। সেইজন্যই মানুষের উচিত আপন আপন স্বভাবের চেয়ে উচ্চকোটির মানুষের সঙ্গ করা। পশুশ্রেণির মানুষ যারা দিনরাত তারা নেশা আসক্তি ও খারাপ কর্মে মেতে আছে, আর মানুষশ্রেণিরা সক্কলে ইন্দ্রিয়বন্ধনে আটকে আছে। দেবশ্রেণির মধ্যে রয়েছে সত্ত্বগুণ, মানুষগণ রজগুণ প্রধান এবং পশুরা বা অসুরেরা তমগুণ প্রধান। মানুষ রয়েছে মাঝখানে। মানুষ চেষ্টা করলে দেবতা হতে পারে অর্থাৎ ঊর্ধ্বগতি লাভ করতে পারে অথবা নিম্নগতি হয়ে পশু বা অসুর পর্যায়ে চলে যেতে পারে। সাধারণত নীচের সঙ্গে নীচই মিলবে, জলের সঙ্গে মিলবে জল, আর পাঁকের সঙ্গে মিলবে পাঁক। তুমি যদি ভালোর সঙ্গ করতে চাও, তাহলে তোমাকে ভালো হতে হবে, নইলে তুমি ভালোর সঙ্গে মিশতে পারবে না। সন্তেরা বলেন—
‘য্যায়সা কে ত্যায়সা মিলে
নীচকে মিলে নীচ,
পানিমে পানি মিলে,
কীচড়সে মিলে কীচ।’
অদৃষ্ট, নিয়তি, দৈব
ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধের প্রয়োজনে বিমানঘাঁটি তৈরি করবার জন্য ফেণী শহরের চারদিকে ৩৫টি গ্রামের মানুষদের বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নোটিস জারি করেছে। ওই সকল গ্রামের সমস্ত পরিবার বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। মালাকার পরিবারও নোটিশপ্রাপ্ত হয়েছে। তাদের বাড়ির অতি সংলগ্ন উত্তর দিকে একটি বিরাট ধানি জমির মাঠ বিমানঘাঁটি তৈরির স্থানরূপে সরকার নির্ণয় করেছে। অতএব মালাকার পরিবারের মানসিক অবস্থা কী হতে পারে সহজে অনুমেয়। এই পরিবারের জ্যেষ্ঠভ্রাতা রায়সাহেব শচীন্দ্রকুমার মালাকার প্রথম দীক্ষা নিয়েছিলেন মহাত্মা রাম ঠাকুরের কাছে ১৯৩৩ সালে। ধীরে ধীরে এই পরিবারের সকলেই আজ ঠাকুরের আশ্রিত। আজ প্রায় দশ বছর পর যখন এই ঘোরতর বিপদ তখন রক্ষা একটাই মহাত্মা রাম ঠাকুর উপস্থিত আছেন মালাকার বাড়িতেই। তাই যা করতে হয় ঠাকুর করাবেন এই ভরসায় মালাকার বাড়ির সকলে শান্তিতে আছে। নোটিসপ্রাপ্ত লোকেরা দলে দলে এসে রাম ঠাকুরের পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘বাবা, এখন আমরা কী করব? বাড়িঘর ছেড়ে উঠে যাওয়ার জন্য সরকার থেকে দু’বার নোটিস পেয়েছি। সরকার এখানে বিমানঘাঁটি করবেই। আমরা বাড়িতে থেকেও অতি কষ্টে পরিবার পালন করছি। এমতাবস্থায় বাড়িঘর ছেড়ে স্ত্রী-পুত্র পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কী করব দিশা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা অসহায়, সম্বলহীন, অর্থহীন নিরুপায়। চোখে অন্ধকার দেখছি। আপনার শ্রীচরণে স্মরণ নিলাম। আমাদের কী গতি করবেন করে দেন।’ রাম ঠাকুর সহানুভূতিসূচক মৃদু মধুর গলাতে প্রবোধ দিলেন, ‘আপনারা অধৈর্য, অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন কেন? সংসার চালাতে গেলে কখনও সুখ, কখনও দুঃখ আসে। সুখের সময় সুখ, দুঃখের সময় দুঃখ ভোগ করে যেতে হয়। এইজন্য চঞ্চল হতে নেই। চঞ্চলতা বাড়লে কষ্ট ভোগ বেড়ে যায়। ভাগ্যকে মেনে ধৈর্য ধরে থাকেন। এই বিপদ সমষ্টিগত। প্রবল ঝঞ্ঝায় বাড়িঘর উড়িয়ে নিলে নিরাশ্রয় হয়ে কোথাও গিয়ে সাময়িক আশ্রয় নিয়ে কাল যাপন করতে হয়। পরে সময় সুযোগ আসলে পুনরায় বাড়িঘর করে বসতি করে। তেমনই যুদ্ধে যখন পড়েছেন, বাড়িঘর ছেড়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেন সরকারের। ক্ষতিপূরণ নিয়ে দূরবর্তী একটা আশ্রয় করে কিছুকাল বসতি করেন গিয়ে। যুদ্ধ বিপদ শেষে সরকার পুনরায় বাড়ির জায়গা, জমি সব দিয়ে দেবে। বিমানঘাঁটি সরকার ছাড়বে না। অতএব বিপদের সময়টা ধৈর্যের সঙ্গে কাটিয়ে দেওয়া সমীচীন। ধৈর্যহারা হবেন না। এই বিপদে ধৈর্যই একমাত্র সহায়। ভয়ের কী আছে? ভয়ের কিছু দেখি না।’ ঠাকুরের কাছ থেকে সান্ত্বনা বাক্য পেয়ে একদল তো ফিরে গেল, অপর দল এসে উপস্থিত হল পরদিন। সমস্ত গ্রাম থেকেই কেউ না কেউ রোজই তখন আসছে মালাকার বাড়িতে। সবাই ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘বাবা, এই বিপদে কোথায় যাব, কী করব, কিছু ঠিক করতে পারি না বলে আপনার পদপ্রান্তে ছুটে এসেছি।’ রাম ঠাকুর সকলকে বললেন, ‘আপনারা এত অধৈর্য হয়ে পড়ছেন কেন? বিপদ আসে পুনরায় চলে যায়। চিরস্থায়ী ভাবে থাকে না। সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হরিশচন্দ্রও একদা সর্বহারা হয়ে কাশীধামে ডোমের অধীনে আশ্রয় নিয়ে শবদাহের কাজ করেছিলেন। তিনি কী ছিলেন, কী হয়েছেন, কী করছেন এইজন্য কোনও অনুতাপ, অনুশোচনা ছিল না। বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে পড়েছিলেন। স্ত্রী-পুত্রহারা হয়েও ধৈর্যচ্যুত হননি। ভোগকাল অন্ত হওয়ার পর পুনঃ সব ফিরে পেয়েছিলেন। শ্রীবৎস, চিন্তা, নল, দয়মন্তী, সাবিত্রী, সত্যবান এই সকল দৃষ্টান্ত থেকে একই উপদেশ লাভ করা যায়। সকলে স্বীয় কপালকে ধৈর্য সহকারে মান্য করে, আপদকাল কর্তন করেছেন। জন্মের সঙ্গে কপাল নিয়ে জন্ম নিয়েছেন। যে কোনও স্থানে যান কপালখানা আপনার সঙ্গে যাবেই। কপালখানা রেখে কোথাও যেতে পারবেন না। সুতরাং ধৈর্য ধারণ করে কপালের লিখন মান্য করে নাম নিয়ে পড়ে থাকেন গিয়ে। এই কপালকেই ভাগ্য, অদৃষ্ট, নিয়তি, দৈব বলে। নামের অমোঘ, অসীম শক্তি। অতএব এদিক সেদিক ছোটাছুটি না করে ধৈর্য সহকারে নাম সহায় সম্বল করে থাকেন গিয়ে। গুরু বিনা নান্য পন্থা বিদ্যতে। ভয় কী?’
১৯৪২ সালের অক্টোবর মাসে আরও কয়েকজন গুরুভাই মালাকার বাড়ি এসে বিপদের কথা জানালে রাম ঠাকুর বললেন, ‘জীবনে চলার পথে উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ একত্র হয়। সেজন্য ভয় করলে চলবে কেন? যুদ্ধ আসন্ন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হবে। ফেণী শহরকে কেন্দ্র করে জাপান প্রবল এরোপ্লেন যুদ্ধ চালাবে। শেষ দিনের এরোপ্লেন যুদ্ধে জাপানের ও ব্রিটিশের অনেক প্লেন নষ্ট হবে। এরপর এখানে আর যুদ্ধ হবে না। দেখা যায় সুভাষ বোসের ফৌজ ডিমাপুর পর্যন্ত এগিয়ে আসবে। শেষ অবধি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য রসদের ও অস্ত্রের অভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়বে। অবশেষে যৌথ শক্তির আক্রমণে জাপান একেবারে পরাস্ত হবে। ব্রিটিশের প্রয়োজনে বাড়িঘর ছেড়ে দিয়ে অন্য স্থানে গিয়ে যুদ্ধ কাল কাটান। যুদ্ধ থেমে গেলে পুনরায় সব পেয়ে যাবেন। কালাকাল যোগে ব্রিটিশও থাকবে না। আপনারা নির্ভয়ে থাকেন।’ রাম ঠাকুর নীরব হলেন। গুরুভাইরা সব ঠাকুরের মুখে আশ্বস্ত হয়ে বল ভরসা ফিরে উদ্যোগী হলেন বাড়িঘর ছাড়ার।
ধলহারা মেদিনীপুর শহর থেকে দশ কিলোমিটার দূরের অখ্যাত গ্রাম। সেখানে পাগলি মায়ের কাছে রোজ জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ। মায়ের শরীর থেকে সোনালি আভা বের হয়। এক ঢাল হাঁটু অবধি নামানো চুলও তাঁর সোনালি রঙের। কপালে বড় সিঁদুরের ফোঁটা, সিঁথিতে সিঁদুর, বেঁটেখাটো। নয় ইঞ্চির অষ্টধাতুর গৌরী মূর্তি তিনি পুজো করেন। পুজোর ধরন বড়ই অদ্ভুত। তামার একটা ছোট্ট বাটিতে ছটাকখানিক মধু নিয়ে তিনি মন্দিরে ঢোকেন দুপুর বারোটায়। ভক্তশিষ্যরা জড়ো হয়ে যান আগে থেকেই। নানান দূরবর্তী জায়গা — ত্রিপুরা, অসম, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, কলকাতা থেকেও মানুষ আসেন। মায়ের সামনে গিয়ে যিনিই দাঁড়ান, তাঁর নাম, কোথা থেকে এসেছেন, কী জন্য এসেছেন, কোন সমস্যায় পড়ে এসেছেন, প্রতিকার কী, গড়গড় করে সমস্ত বলে দেন।
মন্দিরে ঢুকে পাগলি মা ইষ্টদেবীকে গালাগাল করতে থাকেন, ‘কী লো! ...! সবাই জানে শিব তোর...! তাকেই তুই পায়ে দলছিস। ওলো ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ডোদরি, নে নে হাঁ কর, আগে তোর পেটের জ্বালা মেটাই’— বলেই তিনি আঙুলে করে মধু গৌরী মূর্তির ঠোঁটে ঠেকান। সঙ্গে সঙ্গে চুক করে আগুনের স্ফূলিঙ্গ বের হয়। মায়ের কাছে আসা সকলেই রোজ এ দৃশ্য দেখেন অপার বিস্ময়ে।
বাদাড় গ্রামের মতিন মাইতি বি.এ পাশ করে এম. এ পড়তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়। জমিজমা আছে, কৃষিজীবী পরিবার। থাকবে কোথায়? কলকাতায় ব্যবস্থা হচ্ছে না। পাড়ার একজন বললেন, ‘কলকাতায় পাগলি মায়ের অনেক শিষ্য আছে। মাকে গিয়ে ধরো। থাকার জায়গা তিনিই জুটিয়ে দেবেন।’
মতিন বাবা মাকে সঙ্গে করে গেল পাগলি মায়ের কাছে। দেখল বিশাল লাইন, শুধু মানুষ আর মানুষ। বাবা মাকে নিয়ে সেও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। চড়া রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মতিনের বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। মতিন জল এনে চোখে মুখে ঝাপটা দিচ্ছে, এর মধ্যে রব উঠছে পাগলি মা আসছেন। মায়ের সর্বক্ষণের সঙ্গী নগেন সাধু এসে বললেন, ‘বাদাড় থেকে আসা ঈশান মাইতি হাত তোলো।’ মতিন বাবার হয়ে হাত ওঠালে পাগলি মা এসে বললেন, ‘একে কোলে করে অশ্বত্থ গাছতলায় বসিয়ে দে। ভোগ এনে খাওয়া। এক্ষুনি এক্ষুনি। আগে এরা তিনজন খাবে তারপর গৌরী খাবে।’ মতিনের দিকে তাকিয়ে মা বললেন, ‘তোর এম.এ পড়া হবে না বাছা। তোর সন্ন্যাস বৃত্তি। ঝাড়েশ্বরের থানে, তমাল নদীর ধারে পড়ে থাকগে যা। ঝাড়েশ্বর লোক জুটিয়ে দেবেন।’
আশ্রমে ফিরে গেলেন পাগলি মা। নগেন সাধু বললেন, ‘তোমরা খাওয়া দাওয়া সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে বাড়ি ফিরে যাও। পাগলি আমাদের স্বয়ং ব্রহ্মময়ী। বেটি একবার যা বলে দিয়েছে তার আর রদবদল হবে না। আমি ছিলাম ডাকাত। বেটির পাল্লায় পড়ে সাধু বনে গেছি। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে মাকে দেখছি তো।’ মতিন বলল, ‘আপনার কথা মানতে পারলাম না। দৈবই সব নয়, পুরুষকার বলে একটা কথা আছে। আমি এম.এ তে ভর্তি হয়েই মার সঙ্গে এসে দেখা করব।’ মতিনের কথা শুনে সাধু অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। হাসতে হাসতে ছড়া কাটলেন — ‘কত গেল রথ রথী, শেওড়াতলায় চক্কোত্তি।’
ধলহারা থেকে হতাশ হয়ে বাদাড় ফিরছে মতিনরা। বাড়ি যেতে যেতে বাবা ছেলেকে বললেন, ‘মতি! তুই কিছু ভাবিসনি। তুই আমার একমাত্র ছেলে। আমার একশো বিঘা জমি আছে। জমি বেচে আমি তোর পড়ার খরচ চালাব, মেসের খরচা চালাব। তুই কয়েকদিন পর কলকাতা চলে যা। একটা মেসে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে এম.এ তে ভর্তি হয়ে যা।’
বাড়ি ফেরার তিনদিন পরে মতিন প্রবল জ্বরে পড়ল। গায়ে বসন্তের গুটি দেখা দিল। মায়ের স্নেহস্পর্শে সুস্থ হওয়ার পর মতিনের মা পড়লেন মারাত্মক বসন্ত রোগে। কবিরাজ বললেন, ‘রক্তচামদল বসন্ত।’ সারা শরীরে লাল লাল ঘামাচির মতন গুটি। তিন দিনের মাথায় মতিনের মা মারা গেলেন। বাবার শরীরে বসন্ত দেখা দিল। এগারো দিনে তিনিও চলে গেলেন। মতিনের সাধ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে বাড়ি ছেড়ে শ্মশানের পথে ঘুরতে ঘুরতে কালী মন্দিরে আশ্রয় নিল। মন্দিরের পেছনে নদী বয়ে যাচ্ছে। একজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কোন নদী?’ লোকটি উত্তর দিল, ‘তমাল নদী, আপনি ঝাড়েশ্বরের থান যাবেন তো?’ শোনা মাত্র মতিনের পাগলি মায়ের কথা মনে পড়ল। নদীতে স্নান করে সে গেল ঝাড়েশ্বরের থানে। এক সাধুর সঙ্গে চলে এল কাশীতে। সাধু তাঁকে মন্ত্র দিলেন। অঘোরী আশ্রমে থাকার পর মতিন এল প্রয়াগে কুম্ভমেলায়। দেখা হল নাগা সাধু নগেন্দ্র ভারতীর সঙ্গে। নাগা সাধু মতিনকে নিয়ে এলেন নর্মদার তটের সিদ্ধ মহাপুরুষ কমলভারতীজির গদিতে। তার সন্ন্যাসদীক্ষা হয়ে নামকরণ হল মতীন্দ্র ভারতী। সন্ন্যাস নেওয়ার পর খবর পেলেন বাসন্তী পুজোর দিন যোগাসনে বসে পাগলি মা মহাসমাধিতে প্রবেশ করেছেন। দেহ রাখার পনেরো দিন আগে শিষ্যদের বলে দিয়েছিলেন দেহান্তের তিথি, বার, ক্ষণ। হুবহু মিলে গিয়েছিল।
নিয়তির হাত থেকে কীভাবে মিলবে পরিত্রাণ
সমস্ত প্রজ্ঞাবানেরা সমস্বরে বলেছেন, বিপদে পড়লে বিষণ্ণ হয়ে পড় না। তাপিতও হয়ে ওঠ না। সন্তাপ নিয়ে এলে লাভ কিছু হবে না, দুঃখটা আরও বেড়ে যাবে। সন্তাপে ইন্দ্রিয়, মন একেবারে শুকিয়ে যায়। তাতে শরীরে দেখা দেবে রোগ। সেইজন্য দুঃখ, বিপদকালে আনন্দে থাকার চেষ্টা করতে হয়, এতে সময়মতো পরিস্থিতি ঠিক বদলাতে শুরু করে। ঘরে আরও জ্বাললে অন্ধকার আপনা থেকেই চলে যায়। সুখ এলে দুঃখ সরে যায়। অনেকেই অবস্থার বিপাকে সাধুসন্তের কাছে ছুটে যান। জিজ্ঞেস করেন, ‘অদৃষ্টের কিছু প্রতিকার আছে কি?’ অদৃষ্টের কিছু প্রতিকার নেই। কিন্তু অদৃষ্টের উপর মানুষ পুরোপুরিভাবে বসে থাকতে পারে না। অদৃষ্টের নিবারণ করবার জন্যে চেষ্টা করতে হবে— পুরুষকার প্রয়োগ করতে হবে। অদৃষ্ট, দৈব, নিয়তির ওপরে দায়ভার না চাপিয়ে কর্তব্যকর্ম করে যেতে হবে। পুরুষকার প্রয়োগ করেও যখন ফল পাওয়া যাবে না, তখন অদৃষ্টের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। না হলে জীবনে শান্তি, বিশ্রান্তি লাভ করা সম্ভব হবে না। অদৃষ্টে কী আছে, তা তো লোকে জানে না। সাধু মহাত্মারা বলেন, ‘অদৃষ্টের যদি প্রতিকার থাকত তাহলে নলরাজা, শ্রীরামচন্দ্র যুধিষ্ঠিরেরা কেন এত দুঃখ ভোগ করতে গেলেন? তাঁরা কি মূর্খ, নিরুপায়, বুদ্ধিহীন মানুষ ছিলেন? তা তো নয়, তাঁদেরও তো যথেষ্ট শক্তি, সামর্থ ও বুদ্ধি ছিল, তবু কিছু করতে পারলেন না। তাঁদের অদৃষ্টে যা ছিল তা ভোগ করতেই হল।’
মহর্ষি ব্যাসদেবের একটি সেবক ছিল— ব্যাসশ্চ দাসশ্চ। সেবকটি অনেকদিন ধরে ব্যাসদেবের সেবাযত্ন পরিচর্যা করছিল। একদিন সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রচণ্ড জ্বর, কিছুতেই সারে না। ব্যাসদেব খুব দুশ্চিন্তায় পড়লেন। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না, বুঝতে পারছেন না কীভাবে তার সেবকটিকে সুস্থ করা যাবে। অনেক ওষুধপত্র চিকিৎসা সব তো হল, কিন্তু কোনও উপকার হল না। ব্য?



