


ভুবনেশ্বর: খালি গা। হাতে-পায়ে তখনও মাটি লেগে। বস্তায় মোড়া বোনের কঙ্কাল কাঁধে তুলে হেঁটে চলেছেন তিনি। নির্লিপ্তভাবে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছলেন ব্যাংকে। সোমবারের দুপুর। আর পাঁচটা দিনের মতোই স্বাভাবিক ছন্দে সেখানে কাজকর্ম চলছিল। এরইমধ্যে সামনের মেঝেতে কঙ্কালটি নামিয়ে রাখলেন জিতু মুন্ডা। পরনের একমাত্র পোশাক টেনে মুখের ঘাম মুছে মরিয়া গলায় বললেন, ‘স্যার, এই যে প্রমাণ এনেছি। কয়েকমাস হল বোনের মৃত্যু হয়েছে। এবার তো বিশ্বাস হল। দয়া করে ওর অ্যাকাউন্ট থেকে ১৯ হাজার ৩০০ টাকা তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’ ততক্ষণে ব্যাংক চত্বরে হইচই পড়ে গিয়েছে। ভয় পেয়ে কেউ চিৎকার জুড়ে দিয়েছেন। কেউ আবার চোখমুখ চেপে কাঁদতে শুরু করেছেন। ওড়িশার কেওনঝড় জেলার পাটানা ব্লকের দিয়ানালি গ্রামের এই ঘটনায় জোর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃত বোনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল হতদরিদ্র জিতুকে। ডেথ সার্টিফিকেটের মতো নথি জোগাড় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই মরিয়া হয়ে বোনের কংকাল কবর থেকে তুলে নিয়ে আসেন ওই আদিবাসী যুবক।
২০১৬ সালের আগস্ট মাস। স্ত্রীর দেহ গ্রামে ফিরিয়ে আনতে শববাহী গাড়ি মেলেনি। তাই কাঁধে স্ত্রীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন দরিদ্র কৃষক দানা মাঝি। সেই ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল ওড়িশা প্রশাসন। দশ বছর পেরিয়ে যেন একইরকম ঘটনার সাক্ষী থাকল ওড়িশাবাসী।
ওড়িশা গ্রামীণ ব্যাংকের স্থানীয় মালিপোসি শাখায় টাকা রেখেছিলেন জিতুর বোন কালরা মুন্ডা। ২৬ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর অ্যাকাউন্টে পড়েছিল ১৯ হাজার ৩০০ টাকা। আগেই স্বামী ও একমাত্র সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। তাই নমিনি বলতেও কেউ ছিল না। অভাব-অনটনে চলা সংসারে বোনের রাখা ১৯ হাজার ৩০০ টাকা তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেন জিতু। কিন্তু ব্যাংক ম্যানেজারের সাফ জবাব- টাকা তুলতে হলে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে উপস্থিত থাকতে হবে। নয়তো ডেথ সার্টিফিকেট সহ উত্তরাধিকারের আইনি নথিপত্র দেখাতে হবে। ‘নিরক্ষর’ জিতু কাগজপত্রের জটিলতা বুঝতে পারেননি। বারবার ব্যাংকে অনুরোধ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অগত্যা কবর থেকে বোনের কঙ্কাল তুলে ব্যাংকে পৌঁছে যান।
এই ঘটনায় বেজায় চটেছেন গ্রামবাসীরা। তাঁদের বক্তব্য, কর্তৃপক্ষের সহানুভূতি বলে কিছু নেই। মানুষের থেকেও কাগজপত্র বড়ো! ব্যাংক চাইলে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারত। প্রয়োজনে গ্রাম প্রধানের সঙ্গে কথা বলে খোঁজখবর নিত। বারবার ওই ব্যক্তিকে ফেরানো ঠিক হয়নি।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। ইতিমধ্যে ব্যাংকের কাছ থেকে জবাব চাওয়া হয়েছে। জিতুকে প্রয়োজনীয় সমস্ত সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে ওই কঙ্কালটি পুনরায় কবরও দেওয়া হয়। এনিয়ে বিডিও মানস দণ্ডপাট জানান, আজই বিষয়টি জানতে পেরেছি। দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।