নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: নার্সিংহোমের বিল মেটানোর সময় সোনার দোকানে গিয়ে কমদামে গয়নাগাটি বিক্রি করছেন রোগীর পরিজন। তমলুক শহরে প্রায়ই এই ঘটনা ঘটছে। বুধবার শহরে শালগেছিয়ায় একটি হোটেলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্ক অফিসারদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছিল পুলিস। উৎসবের মুখে ব্যাঙ্ক, এটিএম ও সোনার দোকানে সুরক্ষা নিয়ে ওই মিটিং ছিল। সেখানে তমলুক মহকুমার বিভিন্ন জায়গা থেকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্ক অফিসাররা ওই মিটিংয়ে অংশ নেন। ডিএসপি(ডিইবি) শান্তব্রত চন্দ ওই মিটিংয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলেন, মুনাফার লোভে কম দামে সোনা কিনতে যাবেন না। সেটা চোরাই সোনা হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এক্ষেত্রে আমরা হয়তো তদন্ত করতে গিয়ে আপনাদেরই কোনও দোকানে পৌঁছে যাব। সেক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যয় সংহিতায় শাস্তির বিধান আছে।
এদিন ডিএসপি-র ওই বক্তব্য শেষ হতেই তমলুক শহরের বাদামতলার স্বর্ণ ব্যবসায়ী অতনু মণ্ডল এই শহরে কমদামে সোনা বিক্রির এক অজানা কাহিনি ফাঁস করে দেন। বঙ্গীয় স্বর্ণশিল্পী সমিতির তমলুক শাখার সদস্য অতনুবাবু বলেন, হাসপাতাল মোড় থেকে কিছুটা দূরে আমার দোকান। প্রায়ই লোকজন সোনার গয়না নিয়ে দোকানে চলে আসেন। তাঁরা এই শহরে বিভিন্ন নার্সিংহোম কিংবা হাসপাতালে রোগী খরচ মেটাতে গয়না নিয়ে টাকা জোগাড়ের জন্য ঘুরে বেড়ান। আমি দেখেছি, কিনতে রাজি না হলে হাতেপায়ে ধরে কান্নাকাটি করেন। অল্পস্বল্প দামে বিক্রি করে হাতে নগদ পেলেই হল। আমি কিনতে রাজি না হলেও অন্য দোকানদার সেই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। প্রতি সপ্তাহে এধরনের লোকজন আসেন। আমি এই সমস্যার কথা তুলে ধরার সুযোগ পাই না। আজ, এই মঞ্চে থাকার সুবাদে সকলের সামনে এটা তুলে ধরলাম।
অতনুবাবু একা নন, তাঁরমতো এই শহরের অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীরই একই অভিজ্ঞতা রয়েছে। তমলুকে ৮০টির বেশি নার্সিংহোম রয়েছে। তমলুক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থাকার পরেও নার্সিংহোম ব্যবসা রমরমিয়ে চলছে। কোয়াক ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভাররা মোটা কমিশনের লোভে রোগী নিয়ে হাজির হচ্ছেন নার্সিংহোমে। অনেক সময় রোগীর বাড়ির লোকজনের বিল সম্পর্কে ধারণা থাকছে না। ডিসচার্জের সময় বিল দেখে মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা হয়। তখন সঙ্গে থাকা গয়নাগাটি নিয়ে হাজির হচ্ছেন সোনার দোকানে। অনেক কম দামে বিক্রি করে রোগীকে নার্সিংহোম থেকে ছাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।
শহরের নিমতলা থেকে পদুমবসান হলদিয়া-মেচেদা রাজ্য সড়কের দু’ধারে প্রচুর নার্সিংহোম রয়েছে। এছাড়া স্টেশন রোডের দু’ধারে অজস্র নার্সিংহোম গড়ে উঠেছে। এমনকী, বসতবাড়িকেও নার্সিংহোম তৈরি করা হয়েছে। অধিকাংশ নার্সিংহোমের ফায়ার সেফ্টি লাইসেন্স নেই। এক-একজন ডাক্তার ১৫-২০টি নার্সিংহোমের সঙ্গে জড়িত। ক্লিনিক্ল্যাল এস্টব্লিসমেন্ট অ্যাক্ট ভেঙে প্র্যাক্টিস করছেন। এনিয়ে ২০২৪সালে ২২আগস্ট একসঙ্গে ৯৩জন ডাক্তারকে শোকজ করা হলেও পরবর্তীতে সবই ধামাচাপা পড়ে যায়। সবকিছু আবার সেই আগের মতো চলছে।
সভায় তমলুকের এসডিপিও আফজল আব্রার, তমলুক থানার আইসি সুভাষচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ ছিলেন। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শহর এলাকায় সোনার দোকানে কখনও কখনও পুলিস রাউন্ড দিলেও গ্রামাঞ্চলে একেবারে হয় না। ব্যাঙ্ক অফিসারদের একাংশের অভিযোগ, পুলিস অ্যাটেনডেন্স খাতা করতে বলেছিল। রোজ পুলিস রাউন্ড দেওয়ার সময় সেই খাতায় সই করবে। কিন্তু, গত ছ’মাসে সেই খাতায় কারও সই পড়েনি। এদিন পুলিস অফিসাররা অবশ্য এলাকায় ভিজিট বাড়ানো হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।