Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

দুর্গা নয়, খেরওয়াল সাঁওতালদের আরাধ্য দেবতা মহিষাসুর উপাসনা

দুর্গা ছিলেন খলনায়িকা! তাঁদের চোখে মহিষাসুর দেবতা। তাই পুরুলিয়ার আদিবাসী সম্প্রদায়ের গোষ্ঠী অসুরেরই উপাসনা করেন।

দুর্গা নয়, খেরওয়াল সাঁওতালদের আরাধ্য দেবতা মহিষাসুর উপাসনা
  • ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, রঘুনাথপুর: দুর্গা ছিলেন খলনায়িকা! তাঁদের চোখে মহিষাসুর দেবতা। তাই পুরুলিয়ার আদিবাসী সম্প্রদায়ের গোষ্ঠী অসুরেরই উপাসনা করেন। যা হুদুড়দুর্গা নামেও পরিচিত। নবমীর দিন দাশাই নাচের মাধ্যমে আদিবাসীরা তাঁদের আরাধ্য দেবতা হুদুড়কে স্মরণ করেন। তাই অন্যান্য বছরের মতো এবছরও পুরুলিয়া জেলার কাশীপুর ব্লকের ভালাগোড়া গ্রামে স্মরণসভা হবে। সেখানে পুরুলিয়া সহ অন্য জেলা ও পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডের বহু মানুষ  অংশ নেবেন।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হুদুড় হল খেরওয়াল সাঁওতাল জনজাতির উপাস্য দেবতা। যাঁকে হিন্দু ধর্মের মহিষাসুর বলে দাবি করা হয়। তাই আদিবাসীরা দুর্গাকে খলনায়িকা আর মহিষাসুরকে দেবতা হিসেবেই পুজো করেন। তার পিছনে একটি লৌকিক কাহিনীও আছে। তবে তার সত্যতা নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। এক লৌকিক কাহিনী মতে, হুদুড় ছিলেন চাইচম্পা নামক এলাকার রাজা। আর্যরা ভারতে আসার পর সেই চাইচম্পা রাজ্য দখলের চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু আর্যরা কোনও মতেই রাজা হুদুড়কে পরাস্ত করতে পারছিল না। তখন তাঁকে পরাজিত করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। রাজার পিছনে গুপ্তচর লাগানো হয়। গুপ্তচরের মাধ্যমে আর্যরা জানতে পারে, রাজা অত্যন্ত নারী বৎসল। তাঁদের সমাজে নারীদের অত্যন্ত উঁচু চোখে দেখা হয়। বর্তমানেও আদিবাসী সমাজে পুরুষদের চেয়ে নারীদের উঁচু স্থানে রাখা হয়। আর্যরা রাজা হুদুড়কে হত্যা করার জন্য গুপ্তচর হিসেবে এক গৌরবর্ণা, রূপবতী নারীকে তার কাছে আশ্রয় নেওয়ার জন্য পাঠায়। নারীর ছলনায় রাজা মুগ্ধ হয়ে তাকে  আশ্রয় দেন। পরবর্তী সময়ে আশ্রিতা নারীর রূপে রাজা ধীরে ধীরে মুগ্ধ হয়ে পড়েন। তাঁকে বিয়েরও প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাবে গৌরবর্ণা ওই নারী রাজি হয়ে যায়। ধুমধাম করে রাজার বিয়ে হয়। কথিত আছে, বিয়ের সপ্তম দিনের মাথায় ছলনার আশ্রয় নিয়ে ওই নারীই রাজাকে হত্যা করেন। হত্যার খবর পৌছাতেই আর্যরা রাজ্য আক্রমণ করেন। রাজার মৃত্যুতে এবং আর্যদের আক্রমণে আদিবাসী প্রজারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। আদিবাসীদের ধর্মগুরু জানতে পারেন, আর্যরা নারীদের আক্রমণ করে না। তাই ধর্মগুরুর আদেশে প্রজারা প্রাণ বাঁচাতে ছলনার আশ্রয় নেন। সরস্বতী নদীতে স্নান করে সব পুরুষ নারীদের বেশ ধারণ করে নৃত্য করতে করতে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায়। রাজার মৃত্যু শোকে চাইচম্পা রাজ্য ছাড়ার সময় আদিবাসীরা যে নাচ করেছিলেন পরবর্তী সময়ে সেটাই দাসায় নাচ (শোকের নাচ) হিসেবে পরিচিত।
 এছাড়া ঝাড়খণ্ডের খেরওয়াল সাঁওতাল ও অসুর নামক আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতে, হুদুড় দুর্গা ছিল তাদের সহস্র বছরের পূর্বপুরুষ। হুদুড় শব্দের অর্থ পরাক্রমশালী তথা বজ্র সম সুঠাম দেহ। সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরী বিভাগের কর্মী বেল টুডু বলেন,  আদিবাসীরা অনার্য। এবছর তেলকুপি বারণী ঘাট উন্নয়ন সমিতির তরফে আগামী ২ অক্টোবর মধুকুণ্ডার তেলকুপিতে বারণী সমিতির উদ্যোগে দাশাই নাচের এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ২০১১ সালে পুরুলিয়ার কাশীপুরে সোনাইজুড়ি ভালাগড়া মাঠে প্রথম হুদুড় দুর্গার স্মরণ সভা হয়। দিশম খেরওয়াল বীর কালচার কমিটির পরিচালনায় এবং অজিত কুমার হেমব্রমের উদ্যোগে নবমীর দিন স্মরণসভাটি হয়। অজিতবাবু বলেন, আমরা সাঁওতাল খেরওয়াল জনজাতির শাখা। এই সম্প্রদায়ের মানুষজন অসুর উপাধি ব্যবহার করেন। আমাদের পূর্বপুরুষরা হুদুড় দুর্গাকে রাজা বলেই মান্যতা দিত। মৃত্যুর পর তাঁকে উপাস্য হিসেবে পুজো করা হয়। তাই আমাদের স্মরণ সভা হয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ