নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ডিসপ্লে বোর্ডে সময় দেখাচ্ছে প্রায় পৌনে ৬টা। এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে তিন আরপিএফ কর্মী। আজকাল খুব ভিড় হচ্ছে না? এক যাত্রীর থেকে এমন নিরীহ প্রশ্ন আসতেই যেন কিছু বলার ফুরসত্ পেলেন আরপিএফ কর্মী। হাতের ডিজিটাল ঘড়িতে এক ঝলক দেখে নিয়ে বললেন, ‘এই সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৮টা। আমাদের দম ফেলার উপায় থাকে না। খুব ভিড় হয় এই সময়টায়।’ পাশ থেকে তাঁর এক সহকর্মী বলে উঠলেন, ‘এখন পুজোর শপিং চলছে না!’ পুজোর বাজার, অফিস, শিয়ালদহ, হাওড়া— সব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এসপ্ল্যানেড স্টেশনে! সন্ধ্যা নামলেই মেট্রোর ভিড় যেন এক নতুন বিভীষিকার নামান্তর হয়ে উঠেছে। কোনও দিন কম, কোনও দিন বাঁধনছাড়া!
যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশনে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ১৪ মিনিটের মেট্রো মিনিট দেড়েক লেট ছিল। তখনও মেট্রো মোটামুটি ফাঁকাই বলা চলে। রবীন্দ্র সদন, ময়দান, পার্ক স্ট্রিট—পরপর স্টেশনগুলিতে বহু যাত্রী ওঠায় ভিড় বাড়ছিল। তবে তা অসহনীয় হয়ে ওঠেনি তখনও। যদিও প্রায় প্রতিটি স্টেশনেই মেট্রো ছাড়তে কিছুটা দেরি হচ্ছিল। কারণ, কোনও না কোনও দরজায় যাত্রী আটকে পড়ছিলেন। বারবার দরজা খুলে বন্ধ করতে হচ্ছিল। পার্ক স্ট্রিট থেকে এসপ্ল্যানেডের দিকে মেট্রোর চাকা গড়াতেই এক যাত্রীর উক্তি, ‘ইচ্ছা করে ট্রেনটা লেট করাচ্ছে। প্রতিটা স্টেশনে দাঁড় করিয়ে রাখছে। মেট্রো তো নয়, যেন লোকাল ট্রেন!’ পাশ থেকে সহযাত্রীদের সমর্থনও পেলেন তিনি। ভিড় থেকে মন্তব্য উড়ে এল, ‘একটা ট্রেন ক্যানসেল করাবে বলে এসব করছে।’ তারপর আর কারও কিছু বলার অবকাশ ছিল না। কারণ, এসপ্ল্যানেড এসে গিয়েছে। এবার শুরু হল যাত্রীদের চুলোচুলি, যা আরও একবার মনে করিয়ে দেবে লোকাল ট্রেনের ঝগড়া আর যাত্রীদের রোজনামচাকে। ‘এভাবে কেউ দাঁড়ায়?’, ‘নতুন উঠছেন নাকি?’, ‘ব্যাগটা সামনে নিন’, ‘সামনে এগিয়ে চলুন’, ‘আপনি পারলে যান’—লোকাল ট্রেনের এসব পরিচিত বাক্যবাণ উড়ে আসছে ভিড়ে ঠাসা মেট্রোর রেকে। বসে থাকা এক যাত্রী কাচের জানালা দিয়ে প্ল্যাটফর্মের চেহারা দেখে বলে উঠলেন, ‘শিয়ালদহ সাউথে বালিগঞ্জ স্টেশনে এরকম ভিড় দেখি আমরা।’ শ্যামবাজার থেকে অবশ্য ধীরে ধীরে পাতলা হতে শুরু করে থিকথিকে ভিড়।
গড়িয়াগামী মেট্রো অপেক্ষাকৃত ফাঁকা থাকলেও ‘এসপ্ল্যানেড আতঙ্ক’ রয়েছে। সেই আতঙ্ক বেড়ে গেল পার্ক স্ট্রিটে। ঘোষণা হল, ‘এই গাড়ি টালিগঞ্জ পর্যন্ত যাবে। টালিগঞ্জে রেক খালি করে দেবেন।’ ঘোষণা হতেই একজন বলে উঠলেন, ‘আগের গাড়ির ভিড় আর এই গাড়ির ভিড়, সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হবে ভাবুন।’ বাঁশদ্রোণীর বাসিন্দা সঙ্কর্ষণ চক্রবর্তী বলছিলেন, ‘মেট্রোর ভিড় সত্যিই এখন লোকাল ট্রেনকে হার মানাবে।’ তারপর স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, ‘কত কিছুই তো আমরা মেনে নিই। রাস্তা খারাপ, বাস নেই। মেট্রোর ভিড়ও সেভাবেই মেনে নিয়েছি।’ তবে যাত্রীদের আশা, পুজোর বাজারের ভিড় না থাকলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হবে না। সন্ধ্যায় এসপ্ল্যানেড থেকে শিয়ালদহ কিংবা হাওড়াগামী মেট্রোতেও একইরকম ভিড় দেখা গিয়েছে। লোকালের সঙ্গে পার্থক্য বলতে শুধু ঠান্ডা বাতাস! তাও তীব্র ভিড়ে মাঝেমধ্যে টের পাওয়া যায় না!