Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

নানান অসুখের মিথ বাস্টার

নানান অসুখের মিথ বাস্টার
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল: আমাদের চারপাশে নানান অসুখ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা উড়ে বেড়াচ্ছে। এগুলির কোনওটার উৎস হল ইন্টারনেট, আর কোনওটার উৎস ওই বন্ধু বা পাড়া প্রতিবেশীর মুখের কথা। কিছু আছে গোপন টোটকা, যেটা কোনও ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপনে বা ময়দানে ছড়িয়ে থাকা লিফলেটে আপনারা দেখেছেন। অথবা রথের মেলায় কোনও বাবাজি আপনাকে কানে কানে বলে দিয়েছেন। কিন্তু এটা আপনার শরীরের ব্যাপার। এরকম উড়ন্ত কথার ওপর ভরসা করে তো আর রোগের উপশম হয় না। আরেকটা মুশকিল হল যে এইসব চালু টোটকা নিয়ে কেউ খোলাখুলি আলোচনা করেন না। ওপেন ফোরামে যে এই নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হবে, সেটা হয় না। বরং সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে এইসব ‘চিকিৎসা’ নিজের ওপর প্রয়োগ করেন এই আশায় যে হঠাৎ করেই ম্যাজিকের মতো অসুখ ভালো হয়ে যাবে আর সবাই চমকে যাবে। তাই এইসব ভাসা ভাসা কথাগুলো গোপন করে না রেখে আসুন দেখা যাক যে এদের মধ্যে কটার উপযোগিতা আছে, আর কটা একদম ফালতু। বেশ কিছু পরিচিত অসুখ সম্বন্ধে যে সব লোককথা চালু রয়েছে, সেগুলো নিয়েই এবারের আলোচনা। 
Advertisement
ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস হল সবথেকে পরিচিত ক্রনিক অসুখ। ফলে এই নিয়ে লোককথাও সবথেকে বেশি। কিন্তু তার মধ্যে সত্যি কতটুকু? 
 সুগার থাকলে চিনি খাওয়া যায় না, কিন্তু মধু বা গুড় খাওয়া যায়। এটা কি ঠিক?
না, একদম নয়। চিনিতে যে সুক্রোজ, গুড়েও তাই। মধুতে বরং ফ্রুকটোজ (Fructose) আছে। এটা খেলে রক্তে সুগারের মাত্রা তাড়াতাড়ি বাড়ে না। কিন্তু ক্যালোরি গ্রহণের দিক থেকে দেখলে সব সমান। মিষ্টি বন্ধ মানে সব বন্ধ। চিনি বাদ দিয়ে গুড় নয়। আসলে ডায়াবেটিস রোগীরা এই যে চিনি বাদ দিয়ে গুড় খান, এতে এক ধরনের বালিতে মুখ গুঁজে থাকা মনোবৃত্তি কাজ করে। এর মানে হল, আমার সুগারের জন্য চিনি দায়ী। চিনিকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। ব্যাস। আর চিন্তা নেই।
ডায়াবেটিস হলে শর্করার পরিমাণ কমাতে হয়। শুধু চিনি নয়, সব কিছু। আসলে মিষ্টি খাওয়া অনেকের নেশা থাকে। ফলে যখন সুগার ধরা পড়ল, তখন চিনি বাদ দিয়ে গুড় খেয়ে এরা নেশার নিবৃত্তির চেষ্টা করেন। কিন্তু সেটা হলে কোনও লাভ নেই। বরং চিনি বা গুড় যদি খেতেই হয়, তাহলে রুটি বা ওটস এর সঙ্গে খান। এটা করলে সবমিলিয়ে খাবারের গ্লাইসিমিক ইনডেক্স কমে যাবে। 
 বেশি করে তেতো খাবার খেলে কি সুগার কমে?
তেতো খাবারের সঙ্গে সুগার কমা বাড়ার প্রায় কোনও সম্বন্ধ নেই। আসলে আমাদের মুখে তেতো আর মিষ্টি স্বাদ দুটি উল্টো অনুভূতির সৃষ্টি করে বলে লৌকিক ধারণা হয়েছে যে মিষ্টির ওষুধ হল তেতো। কিন্তু এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। রক্তের সুগার কমা বাড়ার সঙ্গে নিমপাতা বা উচ্ছে জাতীয় তেতো খাবারের সম্পর্ক নেই। তেতো স্বাদের জন্য দায়ী কিছু স্যাপোনিন জাতীয় যৌগ। কেউ কেউ বলেন যে উচ্ছের মধ্যে যেসব যৌগ থাকে, সেগুলি নাকি ইনসুলিন ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। অনেকে আবার এইসব যৌগের একটা গালভরা নাম দিয়েছেন— প্ল্যান্ট ইনসুলিন! কিন্তু এইসব গবেষণা হয়েছে ইঁদুরের মধ্যে। মানুষের দেহে এর প্রভাব কী, সেই নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য রিসার্চ নেই। আজকে, এই ২০২৪ সালে বিজ্ঞানের গবেষণা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এই তেতো খাবারের ব্যবহারিক কার্যকারিতা প্রায় কিছু নেই। আর যদি ধরে নেওয়া হয় যে কিছুটা উপকার হবে, তাহলে তার প্রক্রিয়া কী? মানে রক্তের সুগারের মাত্রা কত হলে দিনে কটা করে উচ্ছে খেতে হবে বা কত গ্রাম নিমপাতা খেতে হবে? রোজ খেতে হবে না সপ্তাহে একদিন খেলেই হবে? সেই উত্তর কেউ জানে না। 
কোনও কোনও ব্যক্তি আবার একটা-দুটো নয়, পঞ্চতিক্ত রস খান। পঞ্চতিক্ত মানে জানেন? নিম, গুলঞ্চ, কণ্টিকারি, বাসক এবং পটল গাছের পাতা! এই সব মিশিয়ে রস বানিয়ে এরা খেয়ে থাকেন! এইসব পাতা খেলে কিছুটা ফাইবার শরীরে ঢুকবে, তাতে কিছুটা উপকার তো হবেই। কিন্তু সেটুকু ফাইবার এই বিকটগন্ধযুক্ত তেতো পাঁচন না খেয়েও ভদ্রভাবে পাওয়া সম্ভব। শুধু শুধু সকালে উঠে এই বিকট পাঁচন খেয়ে নিজের সারা দিন নষ্ট করবেন না। এককালে ওষুধ আবিষ্কারের আগে এইসব পাঁচন খেয়ে মানুষ মনকে প্রবোধ দিত। এখন আর এইসব কেন? 
 ইন্দ্রজবের বীজ খেলে কি সুগার কমায়?
এই হল আরেকটা ভেষজ বীজ, যেটা এখন অনেকের কাছেই খুব প্রিয়। এমনি ডাক্তারের কাছে গেলে টেস্ট দেবে, কতরকম ওষুধ দেবে, ইনসুলিন দেবে। আর এইসব ভেষজ বীজ খেলে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু মানুষের রোগ অত সহজ নয় যে একটা অচেনা গাছের বীজ খাবেন আর সুগার সঙ্গে সঙ্গে বাধ্য সার্কাসের বাঘের মতো খাঁচার মধ্যে ঢুকে যাবে। আজ থেকে এক হাজার বছর আগে, যখন মডার্ন ওষুধ ছিল না, তখন এইসব গাছপাতা খেয়ে চালানো হতো। কিন্তু এখন এত বিজ্ঞানী এত চেষ্টা করে ওষুধ আবিষ্কার করছেন, আর আপনারা সেসবের সুযোগ না নিয়ে এইসব উদ্ভট গাছের বীজ খাবেন? এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় যে এই প্রবন্ধের পাঠকের মধ্যে ৯৯.৯% ইন্দ্রজব গাছই চেনেন না। ফলে আপনাকে যে বীজ বেশি দামে বিক্রি করছে, সেটা ইন্দ্রজব কি না জানবেন কী করে? 
তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে ইন্দ্রজব খেলে সুগার কমে, তাহলে আপনারা আমায় উত্তর দিন যে কতটা খাবেন? কতদিন খাবেন? এটা কি এক গ্রাম দিনে একবার খেলেই সুগার কমে যাবে, নাকি ১০০ গ্রাম দিনে চারবার খেতে হবে? সেই উত্তর কে দেবে? যখন এই ইন্দ্রজব নিয়ে পুঁথি লেখা হয়েছিল, সেই হাজার বছর আগে রক্তের সুগারের মাত্রা দেখার টেস্ট ছিল না। ফলে কতটা বীজ খেলে সুগার কত কমবে, সেই বৈজ্ঞানিক ভাবনা থেকে এইসব পুঁথি লেখা হয়নি। আর যদি দাম দেখেন, তাহলে ১০০ গ্রাম ইন্দ্রজবের দাম প্রায় ২৫০ টাকা। খুব কম হল কি? 
 সুগার হলে মাটির নীচের সব সব্জি খাওয়া বন্ধ?
এটা আমাদের দেশে, বিশেষত গ্রামের দিকে, খুব চালু একটা কথা। এবং অন্যান্য বহু স্বাস্থ্য বিষয়ক লৌকিক গুজবের মতো এটাও ভুল। আসল কথা হল শর্করা কমানো। সেটা মাটির নীচে হোক বা মাটির ওপরে। যেমন আখ। যা থেকে চিনি তৈরি হয়। এটা তো মাটির ওপরের ফসল। তার মানে কী এটা বেশি করে খাওয়া যায়? একদম নয়। বা ময়দা। এটা গম থেকে তৈরি হয় যেটা মাটির ওপরের ফসল। ময়দা ডায়াবেটিসের জন্য ভালো নয়। আবার মাটির নীচে যে গাজর বা মুলো হয়, সেগুলো কিন্তু খুব ক্ষতিকর নয়। আলু একটু কম করে খাওয়া উচিত অবশ্যই। কিন্তু তাই বলে সব মাটির নীচের খাবার খারাপ নয়। 
 সুগার হলে সব খাওয়া কমিয়ে দিতে হয়?
ডায়াবেটিস হলে খাওয়া কমাতে হবে কি না, সেটা বড় কথা নয়। আসল হল কী খাচ্ছেন সেটা। যদি আটার রুটি খান, বা শশা খান বা ডালিয়া, তাহলে কেউ তো বারণ করেনি। কিন্তু যে পরিমাণ ডালিয়া খাচ্ছেন, যদি সেই পরিমাণ কেক খান বা ফ্রায়েড চিকেন, তাহলে তো মুশকিল। অনেকে এই পাগলামিটা করেন। রক্তের সুগার টেস্ট করে ৩৮০ এল। ব্যাস! পরদিন থেকে সব খাওয়া বন্ধ। সেই করে এক মাসে সুগার নেমে এল ১৩০। আপনি খুব খুশি। কিন্তু প্রশ্ন হল, কতদিন পারবেন এভাবে? নাহয় আজকে মিষ্টি খেলেন না। কিন্তু কালকে যে বন্ধুর বোনের বিয়েবাড়ির খাওয়া বা পরশু যে অফিসের পিকনিক, সেটা বাদ দিতে পারবেন তো? সুতরাং ওরকম ব্রহ্মচর্য পালনের মতো সব খাবার বন্ধ করে এক সপ্তাহ থাকা যায়। সারা জীবন থাকা যায় না। ফলে খাবার বন্ধ নয়, খাবারের উপাদান পরিবর্তন করুন। যেমন, অফিসের পিকনিকে গেলেন, কিন্তু কেক মিষ্টি বাদ দিলেন বা টমেটোর চাটনি, যেটা এক বস্তা চিনি দিয়ে তৈরি, সেটা বাদ দিলেন। নিজেকে শিক্ষিত করুন, জেদি নয়। খিদে পেলে খেতে তো হবেই। নইলে আর বেঁচে থাকা কেন? কিন্তু পেট ভর্তি করুন লো ক্যালোরি খাবার দিয়ে।  
 সুগার থাকলে মিষ্টি খাওয়া যায় না, কিন্তু সুগার ফ্রি সন্দেশ যত খুশি খাওয়া যায় কি?
সুগার ফ্রি সন্দেশে আর্টিফিশিয়াল সুইটনার যেমন সুক্রালোজ বা অ্যাসপারটেম থাকে। এগুলো এক ধরনের রাসায়নিক যেটাতে জিভের টেস্ট বাড উত্তেজিত হয়, কিন্তু চিনির ক্যালোরি এতে নেই। এগুলো ডায়াবেটিক রোগীরা খেতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে দশটা কুড়িটা নয়। এই ধরনের রাসায়নিক কিন্তু বেশি খাওয়া যায় না। দিনে কতটা খেতে পারবেন, তার একটা লিমিট আছে। ফলে সুগার ফ্রি সন্দেশ খেতে পারেন, কিন্তু কম পরিমাণে। এই কথাটা এমনি মিষ্টি সম্পর্কেও প্রযোজ্য। মানে, ডায়াবেটিক রোগীরা যে কোনওদিন একটাও মিষ্টি খেতে পারবেন না, এমন কিন্তু নয়। কালেভদ্রে একটা খেতেই পারেন। কিন্তু পরিমিতি নিজেকেই রাখতে হবে। মনে রাখবেন যে সিগারেট বা মদের মতো মিষ্টিও কিন্তু একটা নেশার বস্তু এবং সমান পরিমাণেই ক্ষতিকর। কলকাতায় রাস্তায় একাধিক মিষ্টির দোকান। ফলে রাস্তায় বেরিয়েই লোভ হচ্ছে আর না চাইতেও আপনি মিষ্টি খেয়ে নিচ্ছেন, এটা করলে কিন্তু মুশকিল। 
 রোজ সকালে হাঁটলে সুগার কমে যায়? 
হাঁটা খুব ভালো অভ্যাস। কিন্তু হেঁটে ডায়াবেটিস সারবে না। হয়তো রক্তের সুগারের পরিমাণ কিছুটা কমবে। মানে যে ফাস্টিং সুগার ছিল ৩৫০, সেটা হয়তো নেমে আসবে ২৫০-এ। কিন্তু ম্যাজিকের মতো ডায়াবেটিস সেরে যাবে না। ওষুধ আপনার লাগবেই।
আসলে, মর্নিং ওয়াক খুব একটা ভালো ব্যায়াম নয়। এটা ভালো অভ্যাস, মন ভালো থাকে। কিন্তু ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের দিক থেকে বিচার করলে মর্নিং ওয়াক খুব একটা কার্যকরী নয়। বরং শরীর ভালো রাখতে চাইলে কোনও একটা স্পোর্টস জয়েন করুন। যেমন সাঁতার বা ক্যারাটে। 
 কিটো ডায়েট সুগার পেশেন্টের জন্য ভালো?
কিটো ডায়েট মানে হল নিম্ন শর্করা, উচ্চ ফ্যাটযুক্ত খাবার প্ল্যান। এটা সেই প্রাচীন যুগে ব্যবহার হতো, যখন ডায়াবেটিসের ওষুধ বলতে কিছুই ছিল না। এছাড়া কিছু কিছু জায়গায় ক্যান্সার বা এপিলেপ্সিতেও এটা প্রয়োগ করা হয়েছে। আসলে সেই ৭০-এর দশক থেকেই নিম্ন শর্করা যুক্ত খাবার প্ল্যানের রমরমা বাজার। অ্যাটকিন্স ডায়েটের কথা সবাই জানেন। সেই গ্রুপেই আরেকটি সদস্য হল এই কিটো ডায়েট। প্রথম প্রথম কিছুটা উপকার হলেও এই ধরনের ডায়েট প্ল্যান খুব বেশি কাজে আসে না। সবচেয়ে বড় কথা যে এই ডায়েট করতে গেলে আপনার প্রিয় অনেক খাবার বাদ দিয়ে দিতে হবে। সেটা কী আপনি পারবেন? আর পারলেও কতদিনের জন্য সংযম রাখতে পারবেন? খুব বেশি বয়স্কদের এরকম ডায়েট দেওয়া যাবে কি না, সেটা নিয়ে প্রামাণ্য তথ্য খুব কম। এরকম ডায়েটে কিছুটা ওজন হ্রাস পায়, এটা ঠিক কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে ডায়াবেটিসে লাভ হয় কি না, বলা মুশকিল। 
 সুগার রোগীকে ইনসুলিন দেওয়া মানে শেষ অবস্থা?
এটাও আরেকটা ভুল ধারণা। এখন আধুনিক যা গাইডলাইন, তাতে অনেক সময়েই সুগারের রোগীকে একদম প্রথম থেকে ইনসুলিন দেওয়া হয়। এটা করা হয় যদি প্রাথমিক সুগার খুব বেশি থাকে বা যদি রোগীর খুব তাড়াতাড়ি অপারেশনের দরকার থাকে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ইনসুলিন দেওয়া হয়। সুগারের মাত্রা বাড়তে থাকলে একটা সময়ের পর কিডনি বা চোখ খারাপ হয়ে যায়। সেগুলো কিন্তু একবার খারাপ হলে সর্বনাশ। সেগুলো রক্ষা করার জন্য অনেক সময়ে ইনসুলিন দিয়ে রক্তের সুগারের মাত্রা তাড়াতাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। এর সঙ্গে ‘শেষ অবস্থা’র কোনও সম্পর্ক নেই।
আসল কথা হল সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেটা মুখের ওষুধে হোক বা ইনসুলিনে। বা অনেক সময়ে দুটো একসঙ্গে দিয়ে। সুগার খুব কমে গেলে ইনসুলিন পরে বন্ধ হয়ে যায়। শুধু মুখের ওষুধ চলে। আর যদি সুগার কোনওভাবেই কন্ট্রোল না হয়, তখন সারা জীবন ইনসুলিন ভরসা। তাই যদি আপনাকে ইনসুলিন প্রেসক্রাইব করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলুন। আমি এরকম অনেক রোগীকে চিনি যাঁরা ইনসুলিন নিয়ে চল্লিশ বছর চালাচ্ছেন, এর মধ্যে বিদেশ ঘুরে এসেছেন, জঙ্গল সাফারি করেছেন, টেনিস খেলছেন, সাঁতার কাটছেন বা গাড়ি চালাচ্ছেন। ইনসুলিন আপনার জীবনকে থামিয়ে দেবে না। বরং আরও বেশিদিন ভালোভাবে বাঁচতে পারবেন। 
 সুগার থাকলে প্রেগনেন্সিতে সমস্যা হয়?
এটা কিন্তু ঠিক। ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভাবস্থায় সমস্যা হয়। নানা সমস্যা হতে পারে, যেমন ভ্রূণের ওজন কম হওয়া, ভ্রূণের মৃত্যু, সময়ের আগে জন্ম ইত্যাদি। ফলে সুগার আগে কন্ট্রোল করে তবেই ফ্যামিলি প্ল্যানিং করা উচিত। আর গর্ভাবস্থায় সুগার বাড়লে অবশ্যই মেডিসিনের চিকিৎসক দেখিয়ে ইনসুলিন শুরু করতে হবে। এই লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এটাই বলে যে ইনসুলিন দিয়ে সুগার কন্ট্রোল করলে গর্ভাবস্থায় সব কিছু নিরাপদ। কিন্তু না করলে বিপদ। 
 সুগার থাকলে কোনও ফল খাওয়া যায় না
এটা ঠিক নয়। বেশিরভাগ ফলই ডায়াবেটিসে নিরাপদ। আর ফলের মধ্যে আছে কী? যে কোনও ফলের ওজনের বেশিরভাগটাই জল। আর কিছুটা শর্করা। তার মধ্যে আবার কিছুটা ফাইবার বা আঁশ। এই ফাইবার খেলে কিন্তু ডায়াবেটিসে উপকার হয়। সুতরাং সব ফল বাদ দিতে হবে না। কিছু ফল, যেমন পাকা আম বা আনারসে গ্লাইসিমিক ইনডেক্স বেশি। এগুলো বেশি খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু অ্যাপেল বা পেয়ারা খাওয়া যায়। আর কমলালেবু বা তরমুজে তো ওজনের ৯০ শতাংশ বা তার বেশি শুধু জল। এগুলো খেলে কিচ্ছু হয় না। আর শেষে মনে রাখবেন যে, ফ্রেশ ফল খেলে কিচ্ছু হয় না। ক্যানড ফল বা ফলের রস, যেটা প্যাকেটে বিক্রি হয়, সেটা খাবেন না। আর আরেক ধরনের ফল খারাপ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কিসমিস বা খেজুর। এগুলো বেশি খাওয়া উচিত নয়। 
 সুগার থাকলে ভাত খাওয়া যায় না, রুটি খেতে হয়?
ভাত বা রুটি, দুটোই সিরিয়াল। দুটোতেই শর্করা রয়েছে। সুতরাং টোটাল শর্করার পরিমাণে খুব একটা হেরফের হয় না। পার্থক্য হয় গ্লাইসিমিক ইনডেক্স-এ। আটার রুটির গ্লাইসিমিক ইনডেক্স কম। মানে, এটা খেলে চট করে রক্তের সুগারের মাত্রা বাড়বে না। আর ভাত খেলে রক্তের সুগারের মাত্রা তাড়াতাড়ি বাড়বে। তবে, এটাও মনে রাখবেন যে আটার রুটি বেশি খেলে, অর্থাৎ, খাবারে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে, আবার সেই ক্ষতি। ফলে ভাত খান বা রুটি, পরিমিতি বজায় রাখতে হবেই। 
আজকাল কিছু কিছু চালের ভ্যারাইটি বাজারে এসেছে, যেগুলো বলছে লো জি আই রাইস। মানে এমন চাল যাতে গ্লাইসিমিক ইনডেক্স কম। এর মধ্যে রয়েছে ব্রাউন রাইস, রেড রাইস বা ব্ল্যাক রাইস। এছাড়া ভারতের কিছু কিছু স্থানে এরকম গ্লাইসিমিক ইনডেক্স কম জাতের চাল পাওয়া যায়। যেমন মহারাষ্ট্রের ইন্দ্রায়নি চাল বা কেরালার কোলাম চাল। তবে বেশি ভেবে লাভ নেই। এরকম চাল আপনি পাবেন কোথায়? আর যা দাম, কতদিন কিনতে পারবেন? আসল কথা, আবার বলছি, কম পরিমাণে খাওয়া। বেশি দাম দিয়ে বিরল জাতের চাল খুঁজতে হবে না। আপনার লোকাল চালই যথেষ্ট, যদি আপনি কম পরিমাণে খান। 
 বার বার ইউরিনের বেগ সুগারের লক্ষণ?
কিছু ক্ষেত্রে এটা সত্যি। কিন্তু সবসময় নয়। বার বার ইউরিনের বেগ আসার অনেক কারণ রয়েছে, যেমন ইউরিনের ইনফেকশান, প্রস্টেটের সমস্যা, বয়সজনিত পেশির দৌর্বল্য ইত্যাদি। শীতকালে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এটা খুব বেশি হয়। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন এই ব্যাপারে। এছাড়া কিছু ওষুধ আছে, যেগুলি থেকে এই উপসর্গ শুরু হতে পারে। 
 পরিবারে কারও সুগার না থাকলে, আমারও কি সুগার হবে? 
ডায়াবেটিস কিছুটা জেনেটিক অসুখ হলেও পুরোটা নয়। অন্যান্য অনেক জানা এবং অজানা ফ্যাক্টর এর পেছনে রয়েছে। তাই পরিবারে সুগার আছে কি না, সেটা দেখে সবসময় আপনার ভবিষ্যতের অসুখের পূর্বাভাষ করা যায় না। এইজন্য নিয়মিত হেলথ চেক আপের কোনও বিকল্প নেই। পরিবারে কোনও সদস্যের ডায়াবেটিস থাকলে আরও আগে থেকে সুগার পরীক্ষা করাতে হবে, এই আর কী। কিন্তু সবাইকেই একটা সময়ের পর হেলথ চেক আপ করাতেই হবে। আর যদি ফ্যামিলিতে ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে ভয় না পেয়ে বরং আগে থেকে খাবারদাবার নিয়ন্ত্রণ করুন; নিজের ওজন কমিয়ে রাখার চেষ্টা করুন। ওজন বেড়ে গেলে সুগার হতেই পারে। তখন ভাগ্য বা পরিবারের ইতিহাসকে দোষ দিয়ে পার পাবেন না। 
 সুগার কমে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া যায়?
এটা সবসময় ঠিক নয়। মনে রাখবেন যে সুগার কমেছে ওষুধের জন্য। ফলে ওষুধ বন্ধ করলে আবার সেই আগের অবস্থায় ফিরে যাবেন। ওষুধ বন্ধ হবে না। বরং যেটা হতে পারে, সেটা হল রক্তে সুগারের মাত্রা কমে গেলে ডাক্তার আপনার ওষুধ কমিয়ে দেবেন। আবার যদি কোনওদিন সুগার বাড়তে থাকে, তখন আবার ওষুধ বাড়াতে হবে। 
আমাদের দেশে অনেকে ভেবে নেন যে সুগার হল জ্বরের মতো একটা অসুখ। মানে জ্বর যেমন কমে গেলে ওষুধ বন্ধ হয়, তেমন সুগার কমে গেলেও ওষুধ বন্ধ হবে। সেটা ঠিক নয়। সুগার হয়েছে মানে আপনার শরীরে কিছু কিছু মেটাবলিক ক্রিয়া চিরকালের জন্য পরিবর্তন হয়ে গেছে। ফলে ওষুধ চলবে সারাজীবন। 
 চামড়া কেটে গিয়ে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে গেলে, সুগার থাকতেই পারে না এটা কি ঠিক?
চামড়ায় কেটে গেলে সেই ক্ষত শুকানোর সময় কতটা, তার সঙ্গে সুগারের কোনও সম্পর্ক নেই। আসলে এগুলো ছিল আজ থেকে দুশো বছর আগেকার টোটকা। প্রস্রাব করার পর যদি পিঁপড়ে আসে, তাহলে বুঝতে হবে ডায়াবেটিস বা কেটে গেলে যদি না শুকায়, তাহলে বুঝতে হবে ডায়াবেটিস। এইসব ধারণা এখন অচল। কেটে গেলে না শুকানোর একশোটা কারণ রয়েছে। হতে পারে ইনফেকশান হয়েছে, হতে পারে লতাপাতার রস লাগিয়ে আপনি জায়গাটা আরও ক্ষতি করে দিয়েছেন। যদি সন্দেহ হয়, টেস্ট করান। 
 কিশোর-কিশোরীদের সুগার হয় না, ফলে পরীক্ষারও দরকার নেই?
এটাও ঠিক ধারণা নয়। যদিও ডায়াবেটিস বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশি হয়, কিন্তু কম বয়সেও হতে পারে। একটা প্রকার হল টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস, যেটা এই ১০-১২-১৪ বছর বয়সেই হয়। কিন্তু তা ছাড়াও অন্য অনেক প্রকারের ডায়াবেটিস আছে যেগুলো ১৫-১৬ বছরে হতে পারে। এগুলো হল জেনেটিক প্রকারের রোগ। 
আর সবচেয়ে বড় কথা হল, এখন শিশুদের মধ্যে স্থুলত্ব এত বেশি বাড়ছে যে টাইপ টু ডায়াবেটিসও এই বয়সে হতেই পারে। এটার একটা কারণ আছে। আমাদের দেশে এখনও অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে জয়েন্ট ফ্যামিলি। আর সেখানে সেই পুরনো দিনের দাদু-দিদারা শিশুদের খাবার ঠিক করেন। এই জেনারেশানের লোকেদের একটা বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে বাচ্ছাদের যত বেশি সম্ভব খাইয়ে যেতে হবে। পারলে দিনের মধ্যে দশবার জোর করে খাওয়াতে হবে। এর ফলেই আমাদের দেশে স্থুলত্ব বেড়ে যায়। এছাড়া আমাদের দেশে মা-বাবারা বাচ্চাদের হাতে চিপস বা পিতজা চট করে দিয়ে দেন। এটাও একটা কারণ। 
প্রেশার
 প্রেশারের সমস্যা থাকলে কি নুন খাওয়া বন্ধ?
এটা ঠিক যে রক্তচাপ বেশি থাকলে লবণ কম করে খেতে হয়। লবণের মধ্যে যে সোডিয়াম থাকে, সেটা রক্তনালী সঙ্কুচিত করে প্রেশার বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল, লবণ কম করবেন কী করে? আসলে ভারতীয় রান্নায় এমনিতেই লবণ অত্যন্ত বেশি থাকে। তার ওপর যদি কাঁচা নুন খাওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে কিন্তু মুশকিল। অনেকের ছোট থেকেই এত বেশি নুন দিয়ে ভাত খাওয়ার অভ্যাস হয়ে যায় যে এটুকু কাঁচা নুন বাদ দিলেও এদের মুখে সবকিছু বিস্বাদ লাগে। তবে নিজের স্বাস্থ্যের স্বার্থে এটা করতেই হবে। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হলেও পরে অভ্যাস হয়ে যাবে। আর আরেকটি খাদ্য বাদ দেবেন, সেটা হল প্যাকেটের চিপস। এইসব প্যাকেটে অত্যন্ত বেশি লবণ থাকে। সেইজন্যই এদের স্বাদ বেশি হয়; আর সেইজন্যই ক্ষতি।  
 প্রেশার থাকলে ভাজা নুন খাওয়া যায়?
না। খাওয়া যায় না। লবণ কম করে খেতে হবে। এটাই শেষ কথা। ভাজা নুন খেয়ে কোনও লাভ নেই। লবণ কড়াইতে ভাজলে তার রাসায়নিক কোনও পরিবর্তন হয় না। সেটা সোডিয়াম ক্লোরাইড-ই থাকে। তাতে সোডিয়াম-ই থাকে। এবং সেটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ফলে বেশি করে ভাজা লবণ খেয়ে নিজের বিপদ বাড়াবেন না। 
 যারা বেশি চেঁচামেচি করে বা রেগে যায়, তাদের প্রেশার বেশি বাড়ে?
সবসময় এটা হয় না। কোনও মানসিক চাপ, যেমন হঠাৎ করে রেগে যাওয়া বা কর্মক্ষেত্রে উদ্বেগ থেকে রক্তচাপ বেড়ে যেতেই পারে। কিন্তু চেঁচামেচি করছে মানেই প্রেশার বেশি এরকম নয়। এই লেখক ব্যক্তিগতভাবে এরকম অনেক রোগী দেখেছেন যাদের স্বভাব একদম শান্ত, জীবনে সেরকম সমস্যাও নেই যে দুঃখ বা চিন্তা থাকবে। কিন্তু তাদের রক্তচাপ ১৮০/১২০! মূল কথা এটাই যে কার যে কখন প্রেশার বাড়বে, সেটা আগে থেকে বোঝা সম্ভবই নয়। এই জন্য খুব রোগা কারওর প্রেশার বেশি ধরা পড়লে আশপাশের সবাই বলে যে ‘দেখে বোঝাই যায় না যে প্রেশার এত বেশি!’ প্রেশার ‘দেখা বোঝা’-র জিনিস নয়!
 বার বার মাথা ঘুরলে বুঝতে হবে কি প্রেশার বেড়েছে?
এটা ঠিক যে রক্তচাপ খুব বেশি বাড়লে মাথা ঘোরে। কিন্তু এ ছাড়াও মাথা ঘোরার আরও একশোটা কারণ আছে। সুতরাং মাথা ঘুরলেই প্রেশার বেশি ভাববেন না। প্রেশার চেক করান। তারপর ডাক্তারের কাছে যান। 
বৃদ্ধ বয়সে কানের ভেতরের নার্ভের নানা সমস্যায় মাথা ঘোরা হতে পারে। এর চিকিৎসা আলাদা। এছাড়া কিছু কিছু নার্ভের ওষুধ থেকেও মাথা ঘুরতে পারে। 
 মাথা ব্যথা হলে প্রেশারের ওষুধ খেতে হয়
প্রেশার বাড়লে মাথায় যন্ত্রণা হয়, এটা ঠিক। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে প্রেশার ছাড়াও আরও হাজারটা কারণে মাথা ব্যথা হয়। যেমন মাইগ্রেন বা ক্লাস্টার হেডেক। ফলে মাথা ব্যথা মানেই প্রেশার বেশি নয়। প্রেশার চেক করান। তারপর সিদ্ধান্ত হবে। মাথা ব্যথার অন্য যে সব কারণ, তারও অন্য চিকিৎসা আছে। সেগুলো চিকিৎসক বলে দেবেন। 
 প্রেশারের ওষুধ একবার চালু হলে কি সারাজীবন চলবে?
এই একটা ভয় আমাদের দেশে এমন ভাবে রয়েছে যে অনেকেই ভয়ে প্রেশার চেক করান না যে, প্রেশার বেশি এলেই ডাক্তার ওষুধ শুরু করে দেবে এবং আর বন্ধ হবে না। প্রেশার কিন্তু নানা কারণে বাড়ে। যেমন গর্ভাবস্থায় বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে শুধু প্রেগনেন্সির সময়েই প্রেশারের ওষুধ চলবে, তারপর আর নয়। আবার কোনও উত্তেজনা বা শারীরিক সমস্যার জন্য কিছুদিন প্রেশার বেড়ে যেতে পারে। তখন সেই সময়ের জন্য ওষুধ চলবে। এরপর মেপে যদি দেখা যায় যে প্রেশার কম, তখন আস্তে আস্তে ওষুধ বন্ধ হবে। 
কিন্তু বেশি বয়সে যে প্রেশারের ওষুধ শুরু হয়, সেটা সাধারণত আর বন্ধ হয় না। সেই সময়ে আস্তে আস্তে শরীরের রক্তবাহী ধমনীগুলি শক্ত হয়ে আসতে থাকে। ফলে তখন প্রেশারের ওষুধ বন্ধ করলে মুশকিল। আর যদি প্রেশারের ওষুধ খেতেও হয়, ভয় কীসের? এটা খেলে রক্তচাপ কম থাকবে। তাহলে অন্য সমস্যা হবে না। এটা তো ভালো, তাই না? নাকি রোজ ট্যাবলেট খেতে হবে, সেই ভয়ে প্রেশার লুকিয়ে বসে থেকে একদিন স্ট্রোক হওয়া ভালো? 
 থোড়ের রস খেলে প্রেশার কমে?
এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অন্তত এই লেখকের জানা নেই। থোড়ের রসে কী কী যৌগ আছে, সেটা কীভাবে কাজ করে, সেটা খুব ভালো করে জানা নেই। সুতরাং আমার কথা হল, আপনি ইচ্ছে হলে এটা খান। কিন্তু সেই সঙ্গে ওষুধ চালাবেন আর প্রেশার মাঝে মাঝেই চেক করবেন। মনে রাখবেন যে, প্রেশার বেড়ে থাকলে কিন্তু তার থেকে স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। সুতরাং শুধু এইসব ভেষজ টোটকার ওপর ভরসা রাখবেন না। বিপদ হলে সেটা কিন্তু আপনারই হবে। যদি থোড়ের রস খেয়ে আপনার মন শান্তি পায়, তাহলে সব কিছুর সঙ্গে সেটাও চালিয়ে যান। 
 প্রেশারের ওষুধ খেলে পা ফুলে যায়?
কিছু কিছু প্রেশারের ওষুধ আছে, যেমন অ্যামলোডিপিন, যেটা খেলে কিছু রোগীর মধ্যে মাঝে মাঝে সামান্য পা ফুলে যাওয়ার উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিন্তু এটা চিন্তার কিছু নয়। এটা জাস্ট এইসব ওষুধের একটা সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এই পা ফোলা ওষুধ বন্ধ করলেই কমে যায়। এর থেকে শরীরে আর কোনও ক্ষতি হয় না। অনেকের আবার এই গ্রুপের ওষুধ খেয়ে পা ফুললেও সেটা নিজে নিজেই কিছুদিন পর কমে যায়। দরকার হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। অন্য গ্রুপের ওষুধ দিলেই হবে। 
 প্রেশারের ওষুধ একটানা খেলে কি কিডনি নষ্ট হয়ে যায়?
একদম নয়। বরং না খেলে প্রেশার বেড়ে কিডনি নষ্ট হয়। প্রেশার বাড়লে কিডনি দিয়ে প্রোটিন বেরতে শুরু করে। এটা কিডনির ক্ষতি করে। অনেক প্রেশারের ওষুধ আছে, যেমন টেলমিসারটান, যেটা এই প্রোটিন ক্ষরণ কমিয়ে কিডনিকে ভালো রাখে। সুতরাং প্রেশারের ওষুধ আপনার কিডনির বন্ধু। 
 এক প্রেশারের ওষুধ বেশি দিন খেতে নেই
এটাও সম্পূর্ণ ভুল। যদি আপনার প্রেশার নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে এক ওষুধ এক বছর দুবছর নয়, তিরিশ চল্লিশ বছরও খেতে পারেন। এইসব ওষুধ বেশিদিন খেলে কোনও ক্ষতি হয় না। বরং না খেলেই ক্ষতি। 
প্রেশার যদি বেড়ে যায়, তাহলে কিডনি, হার্ট ইত্যাদিতে প্রভাব পড়বে। কিডনি খারাপ হয়ে যেতে পারে। হার্ট ফেলিয়র হতে পারে। সুতরাং প্রেশারের ওষুধ চলবেই। যদি কোনও সাইড এফেক্ট হয় বা যদি ওষুধে প্রেশার নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলেই একমাত্র ওষুধ পরিবর্তন করতে হয়। নইলে শুধুমাত্র এক ওষুধ দিনের পর দিন চলছে, এই যুক্তিতে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করার কোনও কারণ নেই। 
 যদি কারও গরম বোধ হয়, তার মানে প্রেশার বেড়েছে?
এটাও ঠিক ধারণা নয়। হঠাৎ গরম লাগার অনেক কারণ রয়েছে। মেনোপজের সময়ে মহিলাদের তো এটা খুব বেশি হয়। এছাড়া থাইরয়েড বা অন্য গ্রন্থির সমস্যাতেও এরকম হতে পারে। সুতরাং এরকম উপসর্গ হলে চিকিৎসকের কাছে যান। তাহলেই আসল কারণ বোঝা যাবে। 
 প্রেশার রোগীদের রোজ প্রেশার চেক করা উচিত
আজকাল ইলেকট্রনিক প্রেশার মাপার মেশিন খুব কম দামে পাওয়া যায় বলে অনেকেই সেগুলো কিনে নেন এবং তারপর সারাদিনে দশবার তাতে প্রেশার মেপে আশঙ্কায় ভোগেন। ওভাবে রোজ রোজ প্রেশার মাপার কোনও দরকার নেই। মানুষের শরীরের প্রেশার স্বাভাবিক অবস্থাতেই দিনের মধ্যে নানা সময়ে নানা মাত্রায় থাকে। কিন্তু যিনি এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব জানেন না, তিনি যদি দিনের মধ্যে বার বার প্রেশার চেক করেন, তবে তিনি দেখবেন যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রেশারের মান বিভিন্ন আসছে; এবং তিনি সেটাকে অসুখ বলে ধরে নিয়ে এমারজেন্সিতে দৌড়বেন। সুতরাং ডাক্তার যেভাবে বলছে, সেভাবেই সপ্তাহে একবার বা মাসে একবার প্রেশার চেক করে লিখে রাখুন। তাতে লাভ বেশি। আপনার কাছে মেশিন আছে বলেই বেশি বেশি পরীক্ষা করে নিজের এবং পরিবারের অন্যদের উদ্বেগ বাড়াবেন না। 
 আমার তো তেমন শরীর খারাপ লাগছে না। তার মানে আমার প্রেশার নর্মাল?
এই আরেকটি ভুল ধারণা আমাদের সমাজে রয়েছে, যে কারণে অনেক প্রেশারের রোগী বহুদিন অবধি ওষুধ ছাড়াই থেকে যান। লোকের ধারণা আছে যে রক্তচাপ বাড়লে কিছু উপসর্গ থাকবেই। এর ফলে যাদের এইসব লোকপ্রচলিত উপসর্গ নেই, তারা ডাক্তারের কাছেও যান না, আর চেকও করান না। এটা ভুল। খুব উচ্চ রক্তচাপ থাকা সত্ত্বেও কোনও উপসর্গ নাও থাকতে পারে। প্রেশার বেড়ে যায় নিঃশব্দে। সুতরাং এটা বোঝার একমাত্র উপায় হল মাঝে মাঝে চেক করা। উপসর্গের জন্য অপেক্ষা করা নয়। 
 স্থূলকায় ব্যক্তিদের প্রেশার বেশি হয়?
এটা ঠিক যে ওজন বাড়লে প্রেশার, সুগার ইত্যাদি সব কিছু বাড়ে। সেই জন্যই ওবেসিটিকে মহামারী বলা হচ্ছে। কিন্তু দুটোর মধ্যে সম্পর্ক এরকম সরল নয়। মানে, স্থূলকায় মানেই প্রেশার বেশি এরকম নয়। এই লেখক এরকম অনেক স্থূলকায় ব্যক্তি দেখেছেন যাদের ব্লাড প্রেশার একদম নর্মাল। আবার অনেক শীর্ণকায় ব্যক্তি রয়েছেন যাদের প্রেশার আকাশ ছুঁয়ে থাকে। আসলে রক্তচাপ বাড়ার পেছনে অনেক ফ্যাক্টর রয়েছে। একমাত্র ওজন বাড়াই এর কারণ নয়। 
লিভার
 লিভার ভালো রাখতে কী কী খাবার খাবেন?
লিভার ‘ভালো’ রাখার জন্য কিচ্ছু খেতে হয় না। লিভার নিজেই ভালো থাকে। উচ্ছে, নিমপাতা, করলা, সজনে ইত্যাদি যা যা লিভার ভালো রাখার টোটকা আপনারা শুনেছেন, সবকটাই ভুল। শুধু মদ্যপান কম করুন, তাহলেই হবে। আর ফাস্ট ফুড খাওয়া কমান। 
 তেতো খাবার খেলে লিভার ভালো থাকে?
এর আগে ডায়াবেটিস নিয়ে যা বলেছি, সেটাই আবার বলছি। কিচ্ছু হয় না। উচ্ছে খেলে আপনার মুখ ভালো থাকবে, আপনি খান অবশ্যই। কিন্তু লিভারের এতে কোনও উপকার নেই। 
 পেটে গ্যাসের সমস্যা হলে লিভারের টনিক খেতে হয়?
লিভারের টনিক বলে কিচ্ছু হয় না। বিশ্বাস করুন, আপনি যতই চারদিকে শুনুন যে লিভারের টনিক খেয়ে পেট ভালো হয়ে গেছে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক দিক থেকে দেখলে এরকম টনিক হয় না। লিভার নিজেই ভালো থাকে। আর টনিক জাতীয় ‘বলবর্ধক’ ওষুধ আজ থেকে ষাট-সত্তর বছর আগে লেখা হতো। কিন্তু আমরা এখন আর টনিক বলে কিছু লিখি না। বেশ কিছু দোকানে সামনের কাচের শোকেসে এরকম ‘টনিক’ সাজানো থাকে। অনেকেই সেটার গায়ে ছাপা লিভারের ছবি বা সুন্দর মুখের ছবি দেখে সেসব কিনে এনে খান। কিন্তু এতে কোনও লাভ নেই। ‘গ্যাস’ যদি হয়, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। বা বাড়িতে রাখা জোয়ান বা আদাকুঁচি খান। ‘টনিক’ খেয়ে নিজেকে মিথ্যে প্রবোধ দেবেন না। 
 জন্ডিস হলে হলুদ বাদ দিয়ে রান্না করতে হয়?
এই গুজবটা আমি প্রথম শুনেছিলাম কিছু প্রত্যন্ত গ্রামের লোকের কাছে। এইসব জায়গায় এটাই লোককথা যে জন্ডিস হলে যেহেতু শরীর হলুদ হয়ে যায়, তাই রান্নায় হলুদ বাদ দিতে হবে! এটা শুনে আমার খুব মজা লেগেছিল। এর মানে, বাংলায় লৌকিক ধারণা হল যে, খাবার থেকে শরীরে হলুদ রং হয়। কিন্তু এটা ঠিক নয়। জন্ডিস হলে বিলিরুবিন বাড়ে। এটা লিভারের তৈরি করা একটা যৌগ। এর সঙ্গে খাবারের হলুদের কোনও সম্পর্ক নেই। খাবারের হলুদ বরং কিছুটা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কাজ করে, যেটা জন্ডিস হলে উপকারে আসবে। তাই খাবারে হলুদ বাদ দিয়ে রান্না করতে হবে না। 
 জন্ডিস হলে রোদে বেরনো যায় না?
জন্ডিস হলে শরীর এমনিতেই দুর্বল থাকে। ফলে এই সময় রোদে বেরলে আরও ডিহাইড্রেশান হয়ে সমস্যা হতে পারে। লিভারের অসুখে ব্লাডপ্রেশার কমে যায়। তাই রোদে বেশি না বেরনোই ভালো। হঠাৎ মাথা ঘুরে বিপদ বাঁধতে পারে। 
 জন্ডিস হলে তেল বাদ দিয়ে রান্না করতে হয়?
এটাও ঠিক নয়। একটু তেল খাওয়া যায়। সমস্যা হল বেশি তেল হলে। সেটা খেলে অসুবিধা হবে, হজম হবে না। কিন্তু জন্ডিস মানে তেল বাদ দিয়ে সেদ্ধ রান্না নয়। এই ভুল ধারণাটা আমাদের সমাজে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে কোনও জন্ডিস রোগীকে যদি বলা হয় যে আপনি অল্প তেল খেতে পারেন, সে উল্টে ভাববে যে ডাক্তার কিছুই জানে না। কিন্তু একেই জন্ডিস হলে খিদে থাকে না। তার ওপর এইসব রোগীদের দিনের পর দিন ওইরকম বিস্বাদ সেদ্ধ খাবার খাইয়ে লাভ কী? 
এর একটা ব্যতিক্রম আছে। সেটা হল অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস। সেইরকম অসুখ হলে তেল বাদ দেওয়া ভালো। সেটা আপনার চিকিৎসক বলতে পারবেন। 
 ফ্যাটি লিভার থাকলে খাবারে তেল বাদ দিতে হয়?
খাবারে তেল বাদ দিতে হবে না। কিন্তু কম করতে অবশ্যই হবে। বেশি তৈলাক্ত খাবার খাওয়া মানেই কিন্তু সমস্যা। লিভারে ফ্যাট জমবে, হার্টের ধমনীতে ফ্যাট জমবে। ঘি, মাখন পুরো বাদ দিতে হবে। কারণ এতে যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, তাতে ক্ষতি বেশি। ঠিক সেরকম বনস্পতিও খাওয়া উচিত নয়। ভাজার জন্য যদি এক তেল বারবার ব্যবহার হয়, তাহলে সেই তেলে ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হয়। সেরকম খাবারও বাদ দেওয়া উচিত। 
 মাছের তেল খেলে গল ব্লাডারে পাথর হয়?
গল ব্লাডারে পাথর কেন হয়, সেই নিয়ে অনেক থিওরি আছে। শুধুমাত্র তৈলাক্ত খাবার খেলেই যে পাথর হয়, তা নয়। জেনেটিক ফ্যাক্টর রয়েছে, হরমোনের প্রভাব রয়েছে। এটা ঠিক যে মাছের তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি। কিন্তু সেটা খেলেই যে পাথর তৈরি হবে, সেরকম নয়। মাছের তেলের কিছু উপকার রয়েছে। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। সেটা আমাদের কাজে লাগে। সুতরাং একদম বাদ দিতে হবে না। 
 লিভারের সমস্যা হলে খিদে কমে যায়?
খিদে কমার হরেক কারণ আছে। কিন্তু লিভারের অসুখেও খিদে কমে যায়। সিরোসিস অফ লিভারে খিদে কমে। হেপাটাইটিস হলেও খিদে কমে। অনেক রোগী বলেন যে বিশেষ বিশেষ খাবারে নাকি গন্ধ লাগে আর সেই খাবার মুখে তুললেই বমি পায়। 
তবে এটা মনে রাখবেন যে বয়স হলে একটু খিদে কমে যায়। সেটা স্বাভাবিক। সেটা নিয়ে বেশি চিন্তার কিছু নেই। এরকম রোগী প?
Advertisement