Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

নুন, চিনি, ময়দা,  আজিনামোটো কতটা খাবেন?

নুন, চিনি, ময়দা,  আজিনামোটো কতটা খাবেন?
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
পুষ্টিবিদ মীনাক্ষী মজুমদার: চিনি কথায় আছে, ‘যে খায় চিনি তারে জোগায় চিন্তামণি’। চিনি তৈরি হয় আখের রস থেকে। খাবারে মিষ্টি স্বাদ আনতে চিনি ব্যবহার করা হয়। মাত্রাতিরিক্ত চিনি শরীরের পক্ষে মোটেই ভালো নয়। মুশকিল হল সুগার বললেই আমরা ভাবি বোধহয় চিনির কথা বলা হচ্ছে। আদপে বিষয়টা তা নয়।
Advertisement
চিনি হল সরল শর্করার একটি রূপ। এমন সরল শর্করা থাকতে পারে কুকিজ, কেক, ক্যান্ডি, চকোলেট, ডোনাট-এও।
ফলে সরাসরি আমরা চিনি না খেলেও, নানাভাবে শরীরে চিনি বা সরল শর্করা ঢুকতে পারে।
এই প্রসঙ্গে শর্করার ধরন নিয়ে দুটো কথা বলা প্রয়োজন। দেখুন, সব খাবারেই শর্করা থাকে। শর্করা দু’ধরনের হয়—সরল শর্করা ও জটিল শর্করা। যে শর্করা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তে সুগারের মাত্রা হু হু করে বাড়িয়ে দেয় সেগুলি সরল শর্করা। আর যে শর্করা খাওয়ার পরেও রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ায় সেগুলি হল জটিল শর্করা।
সরল শর্করা থাকে রসগোল্লা, সন্দেশ, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, ক্যান্ডি, চকোলেট, কেক, পেস্ট্রি, কোল্ড ড্রিংকস-এর মতো খাদ্য এবং পানীয়ে। 
অন্যদিকে জটিল শর্করা থাকে শাকসব্জি, আটার রুটি, নানা ফলে। শরীরের জন্য এই জটিল শর্করাযুক্ত খাদ্য খাওয়া ভালো। কারণ এই ধরনের খাদ্য থেকে সরল শর্করা খুব ধীরে ধীরে মুক্ত হয় ও শরীরে মেশে। প্রশ্ন হল, সরল শর্করা বা চিনি বেশি খেলে শরীরে কী কী পরিবর্তন হয়।
স্থূলত্ব
প্রথমত বেশি মাত্রায় শর্করা জাতীয় খাদ্য খেলে তা প্রথমে দেহের পেশি ও লিভারে গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা হয়। দৈহিক পরিশ্রমের সময় এই গ্লাইকোজেন ভেঙে শরীরকে এনার্জির জোগান দেয়। তার পরেও শর্করা উদ্বৃত্ত থাকলে তখন তা দেহে ফ্যাট হিসেবে জমা হতে থাকে। সেখান থেকেই বাড়তে থাকে দেহের ওজন। 
ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসুখ
রক্তে যত বেশি সুগারের মাত্রা বাড়ে তত বেশি করে দেহকে ইনসুলিন ক্ষরণ করতে হয়। ইনসুলিন হল সেই হরমোন যে রক্ত থেকে কোষে কোষে শর্করাকে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে মাত্রাতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। প্রথমত দীর্ঘদিন ধরে রক্তে বাড়তি সুগারকে সরানোর জন্য প্যাংক্রিয়াসকে বাড়তি চাপ নিয়ে বেশি মাত্রায় ইনসুলিন তৈরি করতে হয়। একসময় শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। অর্থাত্‍ শরীরে ইনসুলিন তৈরি হলেও শরীর আর ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীল থাকে না। এর ফলে প্যাংক্রিয়াসকে আরও বেশি করে ইনসুলিন তৈরি করতে হয়। এদিকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হওয়ার অর্থই হল টাইপ ২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়া।
ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও মাত্রাতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অন্যান্য বিপদও আছে। চিনি খুব দ্রুত রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এই শর্করা ইনসুলিনের কার্যকারিতার অভাবে কোষে কোষে প্রবেশ করতে পারে না এবং শরীরের অতি ক্ষুদ্র রক্তবাহী নালিতে জমা হতে থাকে ও প্রদাহ বাড়িয়ে তুলতে থাকে। শরীরের নানা অঙ্গ যেমন চোখ, কিডনি, ব্রেনে এমন অতিক্ষুদ্র রক্তজালিকা থাকে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও বেশি মাত্রায় শর্করা নির্ভর খাদ্য খেলে হার্ট অ্যাটাকের পাশাপাশি স্ট্রোক, ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথি, কিডনি ডিজিজ হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
কোলেস্টেরল, হার্ট ও অন্যান্য অসুখ
ডায়াবেটিসের মতো মেটাবলিক ডিজঅর্ডার হওয়ার অর্থই হল, তার সঙ্গে হাত ধরে আসে মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরল, হার্টের অসুখ, স্ট্রোকের মতো জটিলতা। তবে ডায়াবেটিস না হলেও নানাভাবে মাত্রাতিরিক্ত সরল শর্করা জাতীয় খাদ্য বা পানীয় সেবনে উপরিউক্ত অসুখগুলি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তা কীভাবে? 
চিনির মতো সরল শর্করা খাওয়ার অর্থই হল খুব দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এখন শারীরিক শ্রম না করলেই এই শর্করা মেদ রূপে শরীরে সঞ্চিত হবে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমা হবে চর্বি। দেখা দেবে ফ্যাটি লিভার। রক্তে বাড়বে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা। এলডিএল হার্টের আর্টারিতে ব্লকেজ তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। ফলে বাড়ে হার্টের অসুখ হওয়ার ঝুঁকি। আবার এলডিএল বাড়লে তখন এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমতে থাকে। এইচডিএল হার্টের সমস্যা প্রতিরোধ করতে কাজে আসে। বোঝাই যাচ্ছে, সরল শর্করা সেবনে শুধু ক্ষতি আর ক্ষতি।
অতিরিক্ত চিনি খাওয়া এড়াবেন কীভাবে:
অনেকেই আজকাল সতর্ক হয়ে চায়ে বেশি চিনি খান না। তবে বিষয়টা সামান্য চিনি ব্যবহার করা হচ্ছে কি হচ্ছে না তার উপর সবসময় নির্ভর করে না। মূল বিষয়টা হল, অনেকেই বাইরে কাজে বেরিয়ে ৮-১০ কাপ চা পান করেন। ফলে ওই সামান্য মাত্রাতে হলেও বারবার চা পানের কারণে শরীরে প্রচুর সরল শর্করা ঢোকে। সঠিক শরীরচর্চার অভাবে তাই ওজন বাড়তে থাকে। এই উদাহরণটা দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই, তা হল, অল্প পরিমাণে চিনি খেয়ে লাভ নেই। বরং চিনি ছেড়ে দেওয়াই উপযুক্ত কাজ। তাছাড়া একাধিক খাবারে নানা ভাবে প্রচুর পরিমাণে চিনি মেশানো থাকে। আমার না জেনেই সেই খাবার খাই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক চামচ স্যসেই থাকে ৪ গ্রাম মতো সুগার! 
আবার, সরল শর্করার নানা রূপ বাজারে বিদ্যমান। উদাহরণ হিসেবে ফ্রুক্টোজের কথা বলা যায়। বহু বাজার চলতি পানীয়ে সুগার মেশানো নেই বলে দাবি করা হলেও, আসলে সেগুলিতে মেশানো হয় ফ্রুক্টোজ। অর্থাত্‍ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই সরল শর্করাই মেশানো হয় শুধু নাম বদলে! ফ্রুক্টোজ এমন এক শর্করা যার বিপাক শুধু লিভারেই হয়। সুতরাং একজন ব্যক্তি শুধু ডায়েট কোল্ড ড্রিংকস পান করছেন ভেবে যদি রোজ নরম পানীয় সেবন করেন, সেক্ষেত্রে একসময় তাঁর লিভারকে মাত্রাতিরিক্ত হারে কাজ করতে হবে। এর ফলে তৈরি নানা প্রদাহজনক উপাদান। এই উপাদানগুলি আবার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স করতে পারে। আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, মধু এবং ফলের রসেও প্রচুর পরিমাণে ফ্রুক্টোজ থাকে। তাই মাত্রাতিরিক্ত মধু কখনওই শরীরের জন্য ভালো নয়। এছাড়া ফলের রসও শরীরের জন্য খুব একটা উপকারী নয়। সবসময় গোটা ফল খাওয়া উচিত। কারণ গোটা ফলে ফ্রুক্টোজ থাকলেও সঙ্গে শরীরে ফাইবারও ঢোকে যা ওই শর্করাকে ধীরে ধীরে শরীরে ছাড়ে। তাই দ্রুত সুগার বাড়ে না ও লিভারকে দ্রুত চাপ নিয়ে কাজ করতে হয় না। সুতরাং কোনও খাবার, বিশেষত বাইরে থেকে প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার আগে দেখে নিন চিনি কতখানি আছে।
ব্রেনে প্রভাব
এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, অনেকেই চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতে ভালোবাসেন। মিষ্টি খাওয়ার অভ্যেসে ক্যান্ডি, বাতাসাও খান কেউ কেউ। চলতি কথায় যাকে বলে স্যুইট টুথ! আগেই বলা হয়েছে, চিনি, বাতাসা, ক্যান্ডি আসলে সরল শর্করা। চিনি বা এই ধরনের সরল শর্করা খেতে ভালো লাগার একটা বড় কারণ রয়েছে। তা হল, চিনি খাওয়া মাত্র আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন এবং সেরেটোনিন নামে হরমোনের ক্ষরণ হয়। এই ধরনের হরমোন আমাদের দ্রুত মন ভালো হওয়ার মতো অনুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে বারংবার আমাদের ওই অনুভূতি পেতে ইচ্ছা করে। এই কারণে একজন মানুষ মিষ্টিজাতীয় খাদ্যের প্রতি আসক্ত হয়ে যান। বারংবার তিনি মিষ্টি খাবার খেতে থাকেন। তবে এক সময় আর সামান্য মিষ্টিতে তিনি আগের মতো আনন্দ পান না। তখন আরও বেশি মাত্রায় মিষ্টি খেতে হয়। এইভাবে মাত্রাতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাদ্য খাওয়ার অভ্যেস তৈরি হয়ে যায় তার মধ্যে।
মিষ্টি খাওয়ার প্রতি তীব্র আসক্তি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে এরপর যখনই রক্তে সুগারের মাত্রা কমে তখনই তিনি আনন্দ অনুভূতির অভাব বোধ করেন। সঙ্গে আসে ক্লান্তির অনুভূতি। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় কারও কারও। কোনও কিছুতে মনোযোগও দিতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ফের মিষ্টিজাতীয় খাদ্য খেলে আবার স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। মিষ্টি জাতীয় খাদ্যের প্রতি এই নির্ভরশীলতা কমাতে আমাদের উচিত ধীরে ধীরে মিষ্টিজাতীয় খাদ্য ত্যাগ করা।
সারাদিনে কতটা চিনি
শরীরে কোনও সমস্যা না থাকলে সারাদিনে দুই থেকে তিন চা চামচ চিনি খাওয়া যায়। আর যদি ডায়াবেটিস থাকে সেক্ষেত্রে কৃত্রিম মিষ্টি খাওয়া যায়। সেটা না খেতে পারলেই ভালো। তবে মনে রাখা দরকার যে ডায়াবেটিস এবং স্থূলত্ব থাকলে আরও বিপদ। ওজন ক্রমশ বাড়তেই থাকবে।
কী করবেন?
সরাসরি চিনি, মিষ্টি, ক্যান্ডি খাওয়া বন্ধ করুন। দেখবেন ওজন কমতে শুরু করেছে। মেজাজও থাকছে নিয়ন্ত্রণে। এনার্জি লেভেলও বাড়তে শুরু করবে একসময়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে, কোলেস্টেরল, হার্টের অসুখ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কাও কমতে থাকবে।  
নুন
কথায় আছে, যার নুন খাই তার গুণ গাই। যে আপনাকে বসিয়ে খাওয়াচ্ছে তার গুণ নিশ্চয় দিকে দিকে বলে বেড়াবেন! তাছাড়া নুন ছাড়া খাবার খাওয়া যায় নাকি! চিনি ছাড়া তাও বা চলে যেতে পারে, তাই বলে আলুনি খাবার! মুখ থেকে ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। 
নুন নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বিপদ হতে বাধ্য। কেন এমন প্রশ্ন উঠছে? কারণ একটা বিষয় প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার যে নুন কি স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী? 
সাধারণভাবে ওপর থেকে দেখে নুন বলতে যে বস্তুটিকে চিনি তার নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। শরীরের সোডিয়াম নামে খনিজের চাহিদাপূরণ করে নুন। সোডিয়ামের সঙ্গে সরাসরি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক আছে। স্নায়ুতন্ত্রকেও সহায়তা দেয় নুন।
সারা দিনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষ স্বাভাবিকভাবে ৬ গ্রাম মতো নুন খেতে পারেন। অবশ্য তার মানে এই নয় যে পাতে ৬ গ্রাম কাঁচা নুন খেতে বলা হচ্ছে! একটি পরিবারে মাথাপিছু ৬ গ্রাম নুন সারাদিনের রান্নার সঙ্গেই মেশাতে হবে। আর এভাবেই দৈনিক খেতে হবে খাবার।
এর বেশি নুন খেলে কী কী হতে পারে? রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়লে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। শরীরে ফ্লুইড জমতে থাকে। শরীর জল ধরে রাখে অনেক বেশি। প্লুরাল ইফিউশন, ইডিমা, অ্যাসাইটিস এমন নানা ধরনের জটিলতা দেখা যায়।
তবে সাধারণভাবে একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ ৬ গ্রাম নুন খেতে পারেন বলা হলেও, আমাদের মতো উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে কে কতটা নুন খেতে পারেন সেই বিষয়টা অনেকক্ষেত্রেই পরিবেশের উপরেও নির্ভর করে। অর্থাত্‍, একজন মানুষ যিনি সর্বক্ষণ এসিতে বসে আছেন, কোনওভাবেই ঘাম হয় না, তাঁর নুন খাওয়ার মাত্রা হবে নিঃসন্দেহে কম। অন্যদিকে যে ব্যক্তি কায়িক শ্রম করেন, তাঁর নুন খাওয়ার মাত্রা হবে আর এক রকম।
তবে সবসময়ই ভালো হয় কম নুন খেতে পারলে। 
আবার যাঁদের প্রেশার হাই বা কিডনির জটিলতা আছে, সোডিয়াম সমস্যা আছে, তাঁদের নুন গ্রহণের মাত্রা চিকিত্‍সকের পরামর্শ মতো কমাতে হবে। তারপরেও বলা দরকার, পাতে অতিরিক্ত নুন না নেওয়াই ভালো। অতিরিক্ত নুন দীর্ঘদিন ধরে খেলে ব্লাডপ্রেশার বাড়বেই। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।
মনে করুন আপনার দেহের রক্তবাহী নালী হল শান্ত নদীর মতো। রক্তবাহী নালী দিয়ে শান্তভাবে রক্ত বয়ে যাচ্ছে। বেশি নুন খেলে এই রক্তের চরিত্রে বদল ঘটতে থাকে যা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যার দিকে একজন ব্যক্তিকে ঠেলে দেয়। কারণ শরীরে সো়ডিয়ামের মাত্রা বাড়লেই তা অতিরিক্ত জল টেনে নেয় যা আবার ব্লাড ভলিউম বাড়ায়। হার্টকে আরও জোরে জোরে পাম্প করতে হয়। ফলে হার্টের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।
বেশি মাত্রায় নুন খেলে লোকসান হয় কিডনির। বেশি নুন খাওয়ার অর্থই হল কিডনিকে বেশি কাজ করতে বাধ্য করা। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে যা ক্ষতিকারক। কারণ একসময় কিডনি সোডিয়ামের মাত্রা সঠিক রাখার জন্য শরীরে বেশি মাত্রায় জল ধরে রাখার চেষ্টা করবে যা আবার রক্তচাপ বাড়াতে ইন্ধন জোগাবে।
এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, মাত্রাতিরিক্ত নুন খেলে আমাদের হাড়েও পড়ে কুপ্রভাব। মাত্রাতিরিক্ত নুন গ্রহণে ক্যালশিয়াম ক্ষয়ের মাত্রা যায় বেড়ে। আর ক্যালশিয়ামের ঘাটতি শুরু হলে হাড়ও দুর্বল হতে থাকে। মনে রাখবেন লো সোডিয়াম সল্ট খেয়েও বিশেষ উপকার নাও হতে পারে। শরীরে সোডিয়াম পটাশিয়ামের ব্যালেন্স থাকাটাই জরুরি। একটা কমলে আর একটা বাড়বেই। আবার অনেকের লো ব্লাড প্রেশার থাকে। সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মাত্রায় নুন খেতেই হবে।
ছোটদের ক্ষেত্রে
পাঁচ বছর বা দশ বছরের নীচে খুবই কম নুন খাওয়া দরকার। প্রথম ৬ মাস বাচ্চা শুধু ব্রেস্টফিড করবে। ৬-১২ মাস নুন কোনওভাবেই দেওয়া যাবে না। তবে নুন ছাড়া সম্পূর্ণভাবে খাবার খাওয়াও সম্ভব নয়, কারণ বাচ্চাদেরও টেস্ট বাড থাকে।
তবে অতিরিক্ত সল্ট খেলে বিপদ হয়। চিপস, বার্গারের মতো খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত নুন থাকে। এর ফলে কিডনির ফাংশন বা কার্যকারিতা বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে।
রান্নায় ৩ থেকে ৪ গ্রাম নুন দিয়ে খেতে পারেন ব্লাড প্রেশারের রোগী। তবে খাওয়া যাবে না আচার, পাঁপড়, ভুজিয়া, হজমি। কারণ এই ধরনের খাদ্য উপাদানে প্রচুর মাত্রায় নুন থাকে।
ময়দা
ময়দা হল আটার রিফাইনড বা পরিমার্জিত রূপ। অর্থাত্‍ আটায় যে ফাইবার বা চোকলা থাকে তা বের করে দিলেই মেলে মিহি ময়দা।
লুচি, পরোটা, নান, রুমালি রুটি, পিৎজা, কুলচা, বার্গার, নিমকি, বিস্কুট, কুকিজ, শিঙাড়া, মিল্ক ব্রেড, কেক তৈরির জন্য ময়দা সেরা উপাদান। ময়দার তৈরি নানা খাদ্য অত্যন্ত সুস্বাদু। তবে ময়দা দিয়ে তৈরি খাদ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় হল, ময়দার পাউরুটি। রাজ্যের প্রায় সব জায়গায় মেলে পাউরুটি। খেতেও সুস্বাদু। ফলে অনেক সময়েই মায়েরা সন্তানের টিফিনে দেন পাউরুটি। এছাড়া বহু লোকই টিফিনে পাঁউরুটি খেতে ভালোবাসেন। এছাড়া ঘরের রুটিকেও স্বাদু করতে বা আরও বেশি সাদা দেখাতে মেশানো হয় ময়দা! এই প্রসঙ্গে বলি কেন খাবেন না ময়দা। প্রথমত আটার তুলনায় ময়দায় খনিজের মাত্রা থাকে কম। তাহলে ময়দা হল ফাইবারহীন শর্করা। এই ফাইবারহীন শর্করা আসলে শরীরে এমটি ক্যালোরির প্রবেশ ঘটায়। রক্তে বাড়িয়ে তোলে সুগারের মাত্রা। 
এখন দেহে মাত্রাতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে শরীর তা ফ্যাটে রূপান্তরিত করে। সুতরাং বেশি ময়দা খাওয়ার পরে সঠিকমাত্রায় শারীরিক শ্রম না করলে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তেই থাকবে।
এখানেই শেষ নয়। নিয়মিত ময়দার তৈরি জিনিস বেশি খেলে অন্ত্রে থাকা ভালো ব্যাকটেরিয়ার যে কলোনি, তা নষ্ট হতে শুরু করে। কারণ এই ব্যাকটেরিয়ার খুব ভালো বংশবৃদ্ধি হয় উপযুক্ত মাত্রায় ফাইবারের উপস্থিতিতে। সেক্ষেত্রে খাবার হজম হতে যেমন সমস্যা দেখা দেবে তেমনই কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো জটিলতাও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এছা়ড়া রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডস এবং কোলেস্টেরলের মাত্রাও বাড়ে।
ময়দার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি। সুতরাং এককথায় বলা যায়, বেশি মাত্রায় ময়দা খাওয়ার অর্থই হল স্থূলত্বের সমস্যায় ভোগা ও অন্যান্য ডিজঅর্ডারকে ঘাড় ধরে টেনে আনা।
ছোটদের ক্ষেত্রেও ময়দা খাওয়ার অত্যন্ত কুপ্রভাব রয়েছে। আজকাল বাচ্চারা আটার রুটি খায় না। তারা খায় পিৎজ্জা, বার্গার, হটডগ, পাস্তা ইত্যাদি। কেউ কেউ লুচি, পরোটা খেতেও খুব ভালোবাসে। ওদিকে খেলাধুলো করার জন্য মাঠও অমিল। শরীরচর্চার কোনও অবকাশ নেই। তার ফলে ময়দার মতো সরল শর্করা জাতীয় খাদ্য খাওয়ার পর শারীরিক শ্রমও হচ্ছে না। শরীরে জমছে প্রচুর ফ্যাট। ছোট থেকেই শরীরে ফ্যাট জমার কারণে কম বয়স থেকেই তাদের রক্তবাহী নালীতেও পড়ছে কুপ্রভাব। খুদে বয়সে থেকেই ওদের মধ্যে কোলেস্টেরল, সুগার, হার্টের সমস্যায় ভোগার আশঙ্কা বাড়ছে।
ময়দাও খাওয়া যায়
বারবার ময়দাকে এত খারাপ বলা হচ্ছে ঠিকই, তবে ময়দাও একটু কায়দা করে খাওয়া যায়। তাতে রসনার তৃপ্তিও মেলে, আবার শরীরের ক্ষতিও কম হয়। প্রশ্ন হল তা কীভাবে সম্ভব?
যখনই কোনও ময়দা দিয়ে তৈরি খাদ্য খাবেন, সঙ্গে অবশ্যই ফাইবার জাতীয় খাবার রাখবেন। সেটা কেমন? ধরুন মিল্ক ব্রেড খাচ্ছেন। তাহলে স্যান্ডুইচ করে খান। সঙ্গে দুটি পাউরুটির মাঝে দিন লেটুস, শসা, গাজর, টম্যাটোর মতো সব্জি। সব্জিতে থাকে প্রচুর মাত্রায় খাদ্যতন্তু বা ফাইবার। এর ফলে ময়দার সঙ্গে অনেকখানি ফাইবার জাতীয় উপাদান ঢুকবে শরীরে। শুধু সাদা পাউরুটি কেন, যে কোনও ময়দার তৈরি খাবার খাওয়ার সময় তার মধ্যে শসা, টম্যাটো, লেটুস, পেঁপে বা যেসব সব্জি যোগ করা যায় তাই যোগ করে খান। লুচি বা পরোটা খাওয়ার সময় আলুর তরকারি নয়, বরং ছোলা বা কুমড়োর তরকারি নির্বাচন করুন। মোট কথা ময়দায় যে ফাইবার অনুপস্থিত থাকে তাকে এভাবে আলাদা করে ফাইবার যোগ করে পূরণ করুন। তাতেই অনেকখানি সমস্যার সমাধান হবে।
আজিনামোটো
এমএসজি ওরফে আজিনমোটো বা মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট নিয়ে একটা জনপ্রিয় গল্প চালু আছে।
১৯৬৮ সালের কথা। দি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন নামে চিকিত্‍সা সংক্রান্ত পত্রিকায় এক চিকিত্‍সকের চিঠি প্রকাশিত হল। তিনি লিখেছিলেন এক চীনে রেস্তরাঁয় খাবার খাওয়ার পরেই অত্যন্ত অসুস্থ বোধ করেন। হাত-পা অবশ হতে শুরু করে ইত্যাদি...। তাঁর সন্দেহ হচ্ছিল, সম্ভবত কুকিং ওয়াইন কিংবা উচ্চ মাত্রার নুন অথবা মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট বা এমএসজি ওরফে আজিনমোটো খাওয়ার কারণেই তাঁর এমন শরীর খারাপ হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে গবেষণার অভাব রয়েছে বলেও তিনি জানান। চিঠির ফলাফল হয়েছিল ভয়াবহ! লোকে সোজা আজিনামোটোকে কালপ্রিট বলে দেগে দেয়। একইসঙ্গে চাইনিজ রেস্তরাঁয় খাওয়াও বন্ধ করে দেয়। চাইনিজ রেস্তরাঁগুলি ‘আমাদের রেস্তরাঁয় আজিনামোটো ব্যবহার করা হয় না’ বলে সাইনবোর্ডও ঝোলায়! সত্যিই কি আজিনামোটো এত খারাপ! 
এমএসজি-এর দুটো অংশ। এক, সোডিয়াম। দুই, গ্লুটামেট নামে অতিপরিচিত অ্যামাইনো অ্যাসিড। গ্লুটামেট আমাদের পরিপাকক্রিয়া এবং পেশির কার্যকারিতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বিশেষ প্রভাব ফেলে। তবে আমরা যে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য গ্রহণ করি তার মধ্যেই পর্যাপ্ত মাত্রায় গ্লুটামেট থাকে। মাশরুম, চিজ, টম্যাটো, ব্রথের মতো খাদ্যে যথেষ্ট মাত্রায় গ্লুটামেট থাকে। ফলে গ্লুটামেট যে সবসময় খারাপ তা নয়। তবে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেটের মধ্যে সোডিয়ামের মাত্রা যথেষ্ট বেশিই থাকে। ফলে যাঁদের ব্লাড প্রেশারের সমস্যা রয়েছে তাঁদের প্রতিদিন আজিনামোটো খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। খাবারে মুখরোচক স্বাদ আনতে আজিনামোটো মেশানো হয়। বিশেষত চাইনিজ খাবারে আজিনমোটো দেওয়ার চল রয়েছে।
বাড়িতেও খাদ্যের স্বাদ বাড়াতে আজিনামোটো দেওয়া হয় কোনও কোনও ক্ষেত্রে। তবে একবার নুন দেওয়ার পর ফের আজিনামোটোর ব্যবহার না করাই উচিত। তবে বহু রেস্তরাঁয় আজিনামোটো দিয়ে খাদ্য তৈরির চল রয়েছে। সেক্ষেত্রে মাসে একবার বা দু’বারের বেশি রেস্তরাঁয় না খাওয়াই ভালো।
আর একটা বিষয় অবশ্যই বলা দরকার, তা হল, সম্পূর্ণ প্রমাণিত বিষয় না হলেও, আজিনামোটোর একটা কার্সিনোজেনিক প্রভাব আছে বলে নানা গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সুতরাং মাঝেমধ্যে খেলেও নিয়মিত আজিনামোটো দেওয়া খাবার কোনওভাবেই খাওয়া যাবে না। লেখক: ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের চিফ ডায়েটিশিয়ান
অনুলিখন: সুপ্রিয় নায়েক
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ