সোমনাথ বসু: সেই মেটলাইফ স্টেডিয়াম। বড্ড চেনা। কিন্তু আজ যেন কেমন অন্যরকম। ১৬ বছর আগের এক আগস্টে এখানেই আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। তারপর আমাজন দিয়ে জল বয়েছে নিজস্ব ছন্দে। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ক্রমশ ডালপালা মেলে মহীরুহ হয়ে উঠেছেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারও। কিন্তু ফিফার ওই সোনালি ট্রফি তাঁর কাছে অধরাই। অতৃপ্তির স্বাদ নিয়েই তাই ব্রাজিলের জার্সিকে আলবিদা বলতে হল ৩৪ বছর বয়সিকে।
আমেরিকার রেফারি ইসমাইল এলফাথ খেলা শেষের বাঁশি বাজাতেই এক যুগের অবসান। নরওয়ের কাছে ১-২ গোলে হেরে অভিযান শেষ ব্রাজিলের। নেইমারেরও। কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। হাতে ধরা নীল বোতল থেকে মাথায়-ঘাড়ে জল ঢালতে দেখা গেল তাঁকে। না, ঘাম বা ক্লান্তি মোছার জন্য নয়। চোখের জলকে লুকিয়ে রাখতেই এই প্রচেষ্টা। ১৬ বছরের কেরিয়ারে শুধু ব্রাজিল নয়, বিশ্বব্যাপী অনুরাগীদের আনন্দ দিয়েছেন তিনি। পায়ের কাজ, কোমরের মোচড়ে মাটি ধরতে বাধ্য হয়েছে বিপক্ষ। জাল কাঁপানোর পর সাম্বা ডান্স মনে করিয়েছে রিওর রঙিন কার্নিভালকে। কিন্তু আজ সব শেষ। বিদায় ফুটবল। একে একে এগিয়ে এলেন ভিনিসিয়াস-মার্কুইনহোস-এনড্রিকরা। তবে তাঁদের সান্ত্বনায় এই হতাশা ঘোচার নয়। মাঠ ছাড়ার মুহূর্তে নেইমারের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনতা জলের বিন্দু। এই জলের রং নেই। কিন্তু মাঠের সবুজ ক্যানভাসে তো আরও ছবি আঁকতেই পারতেন তিনি। হাতে বাঁধা ক্রেপ ব্যান্ডেজ খুলে সাইড বেঞ্চের দিকে ছুড়ে ফেলার সময় নেইমারকে বিড়বিড় করে কিছু বলতে দেখা গেল। হয়তো ভাগ্যকেই দুষলেন। হয়তো নয়। কিন্তু রবিবারের পর আর কখনো হলুদ জার্সিতে দেখা যাবে না তাঁকে। গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে পৌঁছে কোমর দোলানো নাচ শুধুই আর্কাইভে।
ব্রাজিলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলার পর নেইমারের বক্তব্য, ‘চেষ্টা করেছি। অনেক চেষ্টা করেছি। এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ এখানেই শেষ হল সেই অভিযান। ইট ইজ নাও ওভার।’
দেশের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০টি গোল নেইমারের। জীবনের প্রথম এবং শেষ ম্যাচেও লক্ষ্যভেদ রয়েছে তাঁর। নরওয়ের কাছে হারলেও ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি তাঁরই। শুধু তাই নয়, বিপক্ষের গোলরক্ষক নাইল্যান্ড চেষ্টা করেছিলেন কথার জালে জড়িয়ে নেইমারের ফোকাস নড়িয়ে দিতে। কিন্তু পারেননি। জাল কাঁপিয়ে চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান তারকা তাঁকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে এই চালাকি চলবে না।’
এই ঔদ্ধত্য তো তাঁকেই মানায়। চলতি বিশ্বকাপই মেসি ও রোনাল্ডোর লাস্ট ডান্সের সাক্ষী। এরপর তো তিনিই হতে পারতেন বিশ্ব ফুটবলের নায়ক। এমবাপে, ভিনিসিয়াস, হালান্ডদের কথা মাথায় রেখেও বলা যায়, নেইমার এঁদের প্রত্যেকের থেকে এগিয়ে। কিন্তু কেন পূর্ণতা পাওয়ার আগেই থেমে যেতে হল তাঁকে? ২০১৭ সালে মেসির ছায়া থেকে বেরনোর জন্য বার্সেলোনা ছাড়েন নেইমার। আর তারপরই তাঁর ফোকাস নড়ে যায়। প্যারিসের মায়াবী রাতে ঘুরেছেন দিগভ্রষ্ট পথিকের মতো। খেলার ইচ্ছেও কমতে থাকে। বিশ্বকাপের আগে আঁতুড়ঘর স্যান্টোসে ফিরে চেষ্টা করেছিলেন শেষবারের মতো জ্বলে উঠতে। কিন্তু বিশ্ব ফুটবল খুব নির্দয়। পান থেকে চুন খসলেই পতন অনিবার্য। তা সত্ত্বেও নেইমারকে মনে রাখবে ফুটবল। ‘লাস্ট ক্রাই’য়ের মতো ভোলা যাবে না তাঁকেও। বিশ্বকাপ না পেলেও নেইমার অক্ষয়, অব্যয়।