শুভদীপ রায়, কলকাতা: শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা উল্টোডাঙা। ব্যস্ত কারণ বিধাননগর রোড স্টেশন এখানেই। দূরদূরান্তের জেলা থেকে প্রতিদিন এই স্টেশনে নামে হাজার হাজার অফিসযাত্রী। পুজোর চারদিন অফিস ছুটি। তা বলে ভিড় মোটেও কম হবে না। কারণটি সহজেই অনুমেয়। এই চত্বরের বিখ্যাত কয়েকটি পুজোমণ্ডপের আকর্ষণই ভিড়ের কারণ। প্রথমেই দেখতে যেতে হবে উল্টোডাঙা সংগ্রামীর প্যান্ডেল। স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে মিনিট দু’য়েক মাত্র।
এ বার উল্টোডাঙা সংগ্রামীর মণ্ডপে পা রাখলে চোখে পড়বে এক অন্য লড়াইয়ের আখ্যান। ৬৪ তম বর্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’র শতবর্ষ স্মরণ করবে এই ক্লাব। মণ্ডপসজ্জা ও প্রতিমার দায়িত্বে অরিন্দম ও তনুশ্রী। থিম প্রসঙ্গে শিল্পী জানান, ‘১৯২৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় রক্তকরবী। এই নাটকে যক্ষপুরীর সোনার খনি ঘিরে যে লোভ, শোষণ ও যন্ত্রসভ্যতার অমানবিক আচরণের ছবি ফুটে উঠেছিল, তারই প্রতিধ্বনি আজকের বাংলার হারিয়ে যেতে বসা পাটকলগুলোতে ফুটে ওঠে। শ্রমের মর্যাদা আর মানুষের অস্তিত্ব মুনাফার কাছে উপেক্ষিত হয়, সেই গল্পই তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আর নাটকে নন্দিনীর মতো চরিত্র মুক্তির ডাক দিয়েছিল, আমাদের মণ্ডপে নন্দিনী স্বয়ং দেবীদুর্গা।’ অনান্যবারের মতো এবারও দর্শকদের মন জয় করবে এই নিবেদন, এমনই আশা উদ্যোক্তাদের। এর ঠিক পরের গন্তব্য উল্টোডাঙা বিধান সংঘ। ৫৮তম বর্ষে তাদের ভাবনা ‘অমূর্ত’। নাগরিক জীবনের যন্ত্রনির্ভর ব্যস্ততার আড়ালে হারিয়ে যেতে বসা ভালোবাসা, বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা ও মানসিক প্রশান্তির মতো অনুভূতিকেই শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছে এই ক্লাব। আলো-ছায়া, শব্দ ও বিমূর্ত স্থাপত্যের মেলবন্ধনে এখানে দুর্গা হয়ে উঠেছেন দৃশ্যমান জগতের বাইরের এক চিরন্তন আত্মিক সংযোগের প্রতীক। মণ্ডপ ও প্রতিমার শিল্পরূপ কৃশানু পালের।
মণ্ডপের বাহার তো হল, এ বার প্রতিমার চমক দেখার পালা। তার জন্য একটু হেঁটে পৌঁছতে হবে অরবিন্দ সেতু সর্বজনীনের মণ্ডপে। এ বার ৫০ বছরে পা দিয়েছে এই পুজো। সুবর্ণজয়ন্তীতে তাদের নিবেদন ‘সুবর্ণ রূপমালা’। মণ্ডপে ঢুকলে যে কেউ অবাক হবেন। কারণ এখানে একসঙ্গে দেখা মিলবে ৫০ রকমের দুর্গার। তবে দেবীর ৫০ রূপ নয়। বাংলার বিভিন্ন শিল্পভাবনায় ফুটে উঠবে দেবীর প্রতিকৃতি। কোথাও লোকশিল্পের ছোঁয়া, কোথাও ঐতিহ্যবাহী কাঠের কাজ, আবার কোথাও আধুনিক শিল্পের প্রকাশ। গোটা মন্ডপটাই যেন আর্ট গ্যালারি। যেখানে মূর্তি, ছবি সবই থাকছে। শিল্পী গৌরাঙ্গ দাসের হাত ধরে এক মণ্ডপেই মিলেছে পঞ্চাশ রকমের দুর্গা। রাস্তা পেরিয়ে একটু এগলেই উল্টোডাঙা যুববৃন্দ। এবারের ভাবনা চক্রাবৃত। মণ্ডপে ঢুকলেই মনে হবে গ্রামের মেলায় এসে পড়েছি। নাগরদোলা থেকে শুরু করে মেলার যাবতীয় উপকরণ এই মণ্ডপে চোখে পড়বে। শিল্পী অমিতকুমার বণিকের নির্দেশনায় তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। প্রতিমা সনাতনী ধাঁচের। গড়ছেন সনাতন পাল। ক্লাবের অন্যতম কর্মকর্তা নারায়ণ মণ্ডলের দাবি, ‘গ্রামের মেলা এর আগে এইভাবে দেখানো হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আশা করি দর্শকদের ভালো লাগবে।’ বাংলার বিখ্যাত লোকসংগীতটিতে তাঁরা আবহসংগীত হিসাবে ব্যবহার করছেন, ‘দাদা পায়ে পরি রে, মেলা থেকে বউ এনে দে...’



