Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নয়া এনপিএ

নয়া এনপিএ
  • ১৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
জাতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির উত্থান নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। একেবারে দেশের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিশ্চিত করেই সংসদ কক্ষে পা রেখেছিলেন তিনি। অর্থাৎ ২০১৪ সালে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার থেকে মোদি উঠে এসেছিলেন ভারতেশ্বরের রাজসিংহাসনে! এদেশের রাজনীতিতে এ এক বেনজির দৃষ্টান্ত। এই চমকই পরে পেয়ে বসেছে তাঁকে নেশার মতোই। তিনি একের পর এক চমক দিয়ে চলেছেন তাঁর প্রশাসন পরিচালনাতেও। তার মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে নোট বাতিল, করোনা খেদাতে থালা-বাটি বাজানোর দাওয়াই, তড়িঘড়ি জিএসটি চালু, দেশে তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদাহরণসহ সেখানকার রাজ্যের স্বীকৃতি বাতিল, পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে বিনানিমন্ত্রণে নওয়াজ শরিফের প্রাসাদে পৌঁছে যাওয়া, চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জি জিনপিংয়ের সঙ্গে দোলনায় দোল খাওয়া, মার্কিন মুলুকে গিয়ে নির্বাচনে সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ নেওয়া প্রভৃতি। কিন্তু এগুলির কোনটি দেশের জন্য কতটা ভালো হয়েছে—এই বিচার করতে বসলে এখনও পর্যন্ত ইতিবাচক উত্তর একটিও পাওয়া যায় না। 
Advertisement
প্রধানমন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য মোদি সবচেয়ে বড় যে চমকটি দিয়েছিলেন, তা হল—তিনি সরকার তৈরি করলে বছরে ২ কোটি নতুন চাকরি দেবেন! দেশবাসী তাঁর কথা বিশ্বাস করেছিল। ২০১৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে শুধু ওই একবারই নয়, উপর্যুপরি তিনবার প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে তাঁকে। বস্তুত তিনি এক বিরল সুযোগের অধিকারী। কিন্তু বিনিময়ে বেকার যুবসমাজের ভাগ্য কতটা ফিরেছে? বছরে ২ কোটি নতুন চাকরি দূর, হাজারে হাজারে মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছে মোদি জমানায়। করোনা পর্বের হিসেব সামনে রাখলে শিউরেই উঠতে হবে। সাড়ে চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে তো মোদির আমলেই। আর্থিক বৃদ্ধির হার ফের তলানিতে। ভারত সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগই সম্প্রতি অশনিসঙ্কেত দিয়েছে যে, চলতি অর্থবর্ষের জিডিপি বৃদ্ধির হার হবে মাত্র ৬.৪ শতাংশ, যা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রত্যাশার চেয়ে ২০ বেসিস পয়েন্ট কম। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি এগনোর পরিবর্তে চারবছর পিছনে হাঁটতে চলেছে! মান্য অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বারবার সতর্ক করেছেন। কিন্তু এই সরকার কোনও চেতাবনি গ্রহণের পাত্র নয়, পরিবর্তে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কৌশলেই চ্যাম্পিয়ন হতে চেয়েছে বরাবর। 
এই যেমন চাতুরি চলেছে কেন্দ্রীয় বাজেট নিয়ে। ঢাকঢোল পিটিয়ে বহু প্রকল্প ঘোষণা করার পরই সরকার ঘাপটি মেরে থাকে। বরাদ্দ অর্থ খরচ করা হয় না। এই মতলবের মূল লক্ষ্য বাজেট ঘাটতি কমানো। অর্থাৎ যে অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, সেটা করা হল না। সুতরাং স্বাভাবিক নিয়মেই আয়-ব্যয়ের ঘাটতি কমে এল। আর্থিক ঘাটতি হ্রাসের ‘সাফল‍্য’কে এভাবেই সামনে রেখে মোদির অর্থনীতির ‘সুস্বাস্থ্য’ তুলে ধরা হচ্ছে! মন্দার অর্থনীতিতে এই কৌশল সত্যিই অভিনব। ২০২৪ সালের বাজেটে মূলধনী ব্যয় খাতে ১১ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এই ‘রেকর্ড’ নিয়ে অর্থমন্ত্রক নিজেই নিজের জয়ধ্বনি দিয়েছিল। কিন্তু অর্থবর্ষের শেষাশেষি দেখা যাচ্ছে, বরাদ্দের ৪৫ শতাংশ টাকাও খরচ করা হয়নি। বাকি বিপুল অর্থ আগামী আড়াই মাসে খরচ করা অসম্ভব। এমনকী, যেসব প্রকল্পে সরকার ১ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করার বাজি রেখেছিল, সেসবও বস্তুত এতদিনে বাতিলের খাতায়। পরিতাপের বিষয় এই যে, এগুলির বেশিরভাগই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সংক্রান্ত। মানুষের হাতে হাতে কাজ পৌঁছে দেওয়ার দাবিসহ এই বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছিল। অথচ এগুলির কিছুই ‘ভূমিষ্ঠ’ হয়নি। সব মিলিয়ে এটাই নিশ্চিত করা হয়েছে যে, চলতি বাজেট বরাদ্দের একটি বড় অংশই ব্যাঙ্কের ‘এনপিএ’র (অনুৎপাদক সম্পদ) মতোই শোভা দিচ্ছে! তাতে এটাই নিশ্চিত হয়েছে যে, পরিকাঠামো থেকে শুরু করে চাকরি, শিক্ষা, গবেষণা প্রভৃতি বহু স্বপ্নই গোল্লায় আপাতত। 
সম্পর্কিত সংবাদ