Bartaman Logo
১১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

রহস্যময় গুহা

আমাদের এই পৃথিবী নানা আশ্চর্যে ভরা। যার অনেক কিছুর খবর আমরা রাখি না। এককথায় বিভিন্ন বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ আমাদের এই পৃথিবী। আদিম মানুষের কথা বললেই আমাদের মনে পড়ে যায় প্রাচীনকালের গুহার কথা।

রহস্যময় গুহা
  • ১৯ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কালীপদ চক্রবর্তী:

Advertisement

আমাদের এই পৃথিবী নানা আশ্চর্যে ভরা। যার অনেক কিছুর খবর আমরা রাখি না। এককথায় বিভিন্ন বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ আমাদের এই পৃথিবী। আদিম মানুষের কথা বললেই আমাদের মনে পড়ে যায় প্রাচীনকালের গুহার কথা। একসময় আদিম মানুষ পাহাড়ের গুহায় বসবাস করত। গুহা সম্পর্কে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়, যা সত্যিই খুব আকর্ষণীয়। কেনটাকির ম্যামথ গুহা পৃথিবীর দীর্ঘতম গুহা। এটি তিনশো মাইলেরও বেশি লম্বা।
নিউ মেক্সিকোর কাল্‌স ডাভ ক্রাউন আবিষ্কারের কাহিনি বেশ চমকপ্রদ। জিম হোয়াইট নামে এক রাখাল বালক একদিন সন্ধ্যায় হারানো গোরুর পাল খুঁজতে খুঁজতে দেখতে পেল দূরে পাহাড়ের চূড়া থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। সন্দেহ নিরসনের জন্য কাছে গিয়ে দেখল, ওগুলো ধোঁয়া নয়। লক্ষ লক্ষ বাদুড় গুহার ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। দূর থেকে বাদুড়ের সারিকে ধোঁয়া ভেবে ভুল করেছিল জিম। বিজ্ঞানীরা চীনের রাজধানী বেজিংয়ের কাছে এক গুহায় আদিম মানুষের কঙ্কাল আবিষ্কার করেন। ‘পিকিং মানব’ হিসেবে পরিচিত এই আদিম মানুষরা প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর আগে গুহায় বাস করত। জানা গিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পলাতক দাসরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে অনেক সময় গুহাকেই বেছে নিত। এরকম একটি গুহার নাম হল ম্যারামন্স ক্যাভেরন্স। এটি মিসৌরি রাজ্যে অবস্থিত।
প্রায় পনেরো হাজার বছর আগে ক্রোমাগনস নামে পরিচিত মানুষরা ফ্রান্স ও ইতালিতে বসবাস করত। তাদের আঁকা অনেক গুহাচিত্র এই দুই দেশে পাওয়া গিয়েছে। ফ্রান্সের লাসকক্স কেভ-ও এ ধরনের একটি গুহা। আমাদের দেশের অজন্তা, ইলোরার গুহাচিত্র আজও জগদ্বিখ্যাত। 
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কিছু কিছু গুহায় গ্লো-ওয়ার্ম দেখা যায়। গুহার ছাদ থেকে এরা সিল্কের মতো আঠালো সুতো ঝুলিয়ে দেয়। স্থির তারার মতো এইসব পোকা তাদের নরম আলো জ্বালিয়ে জ্বলতে থাকে গুহার ছাদে। আলোর আকর্ষণে পতঙ্গ উড়ে এসে আটকে যায় সেই সুতোয়। গ্লো-ওয়ার্ম সুতোয় আটক শিকার ধরে নিশ্চিন্তে খায়। গুহাতে যেহেতু সূর্যালোক পৌঁছয় না, তাই সেখানে এমন কোনও উদ্ভিদ পাওয়া যায় না, যা সূর্যের আলো ছাড়া বাঁচতে পারে। তবে ছত্রাক ভালোভাবেই বাঁচতে পারে। কোনও কোনও প্রাণী আবার সারা জীবনটাই গুহার ভেতরে কাটিয়ে দেয়। এদের ট্রাগলোবাইটস বলা হয়। এরা সাধারণত অন্ধ হয়। আবার কিছু প্রাণী আছে, যারা জীবনের কিছুটা অংশ গুহার ভিতরে কাটায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে বা ঘুমানোর জন্য এরা গুহায় আশ্রয় নেয়। বাদুড় হল এই ধরনের প্রাণী। এছাড়াও এই দলে আছে ভালুক, বুনোবিড়াল ইত্যাদি। 
যেসব প্রাণী আজীবন গুহার ভেতরে কাটিয়ে দেয় তাদের ট্রাগলোফাইলস বলে। টিকটিকি, ঝিঁঝিঁ পোকা আর গুবরে পোকা এই দলভুক্ত। 
মানুষখেকো গুহার কথা শুনেছ কখনও? প্রাচীন গ্রিসে নাকি ছিল এই ধরনের গুহা। শুধু মানুষই নয়, যেকোনও প্রাণী এর ভেতরে ঢুকলে নাকি আর জীবিত বেরিয়ে আসতে পারত না। গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্রাবোর মতে, প্রাচীন গ্রিক শহর হ্যারাপোলিসে অ্যাপোলো দেবতার একটি মন্দির ছিল। একসময় এটি নানা কারণে রহস্যময় মন্দির হিসেবে পরিচিতি পায়। এই মন্দিরের পাশেই ছিল একটি গুহা। এই গুহাটির বৈশিষ্ট্য ছিল, গুহার ভেতরে কোনও জন্তু-জানোয়ার ছুড়ে দিলে তা আর ফিরে আসত না। এমনকী, কোনও মানুষও যদি ওই গুহার প্রবেশদ্বার সামান্য অতিক্রম করে ভিতরে যেত, তবে সে আর ফিরে আসত না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে, পুরোহিতেরা এই গুহার ভিতরে নিরাপদে ঢুকতে এবং বেরতে পারত। তবে পুরোহিতেরা ফিরে এলে দেখা যেত তাদের মুখমণ্ডল ফুলে গিয়ে রক্তবর্ণ হয়ে গিয়েছে। প্রাচীন গ্রিসবাসীরা মনে করত, ওই গুহাটি পরলোকে যাওয়ার পথ এবং সেখানে অপদেবতারা রাজত্ব করে। স্ট্রাবো এই তথ্যগুলো তাঁর বইতে লিখে গিয়েছেন ২০০০ বছর আগে। 
স্ট্রাবোর পুঁথির সূত্র ধরে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক কলেজের অধ্যাপক শেলডেন এই বিষয়ে সবথেকে নির্ভরযোগ্য নতুন তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ওই গুহার নীচ থেকে প্রাকৃতিকভাবে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গত হতো। এর ফলে কোনও মানুষ বা জীবজন্তু গুহার ভেতরে প্রবেশ করলেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের প্রভাবে শ্বাসকষ্টে মারা যেত। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, পুরোহিতরা ভেতরে গেলে মারা যেতেন না কেন? তার উত্তর ও শেলডেন দিয়েছেন। তিনি বলেন, পুরোহিতরা শ্বাসকষ্টের বিষয়টা আগে থেকেই জানত। তাই তারা ওই গুহার ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ দম বন্ধ করে থাকত এবং বাইরে এসে তাদের শক্তি ক্ষমতার মহিমা প্রচার করত।
এই প্রাচীন শহরটি বর্তমানে পশ্চিম তুর্কিতে অবস্থিত। সেখানে আছে প্রচুর উষ্ণ প্রস্রবণ। তার মধ্যে আছে অধিক পরিমাণ ক্যালশিয়াম কার্বনেট। অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়ার ফলে এর থেকে প্রচুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়। বাষ্প ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড ফাটল দিয়ে ঢুকে যায় গুহার ভেতর। এর ফলে গুহার ভেতরে পা দিলেই নিশ্চিত মৃত্যু।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ