সুমন মুখোপাধ্যায় দুবরাজপুর
সুমন মুখোপাধ্যায় দুবরাজপুর
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর নানা রীতিনীতি মানা হয়। বীরভূম জেলার বিভিন্ন ক্লাব তথা সর্বজনীন পুজোর থিমের দাপাদাপির মধ্যেও নিজস্ব রীতি মেনে পুজোর আয়োজন করে বনেদি বাড়িগুলি। দুবরাজপুর ব্লকের হেতমপুর গ্রামে প্রায় ২০০বছরের বেশি পুরনো মুন্সিবাড়িতে প্রথমদিকে পটে আঁকা দুর্গাপুজো হতো। কালের বিবর্তনে এখন নিমকাঠের তৈরি দুর্গার মূর্তিতে পুজো করা হয়। রীতি মেনে এখনও হলুদ মুড়ি, আটরকম কলাই ভাজা দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। ব্যতিক্রমী হিসেবে পুজো শেষে অষ্টমঙ্গলার দিন হয় কুমারী পুজো। এই পুজো পরিবারের লোকজনের পাশাপাশি ভিড় জমান আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা।
এই পরিবারে নিম কাঠের তৈরি একচালার এই দুর্গাপ্রতিমা পুজিত হয়। দশমীতে ঘট বিসর্জনের মাধ্যমে পুজো সমাপ্ত হয়। নিম কাঠের তৈরি দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। সারা বছর ধরে নিত্যপুজো করা হয়। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, হেতমপুরের সেন পরিবার যা মুন্সিবাড়ির পুজো নামে খ্যাত। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কুচিলচন্দ্র সেন ওরফে ঈশান মুন্সী রাজনগরের রাজা বদরুজ্জামানের মুন্সেফ ছিলেন। সেকারণে মুন্সিবাড়ির দুর্গাপুজো নামে খ্যাত হয়ে ওঠে। একদিন খাজনা আদায় করে ফিরে আসার সময় গাছতলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। সেসময় তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন স্বয়ং মা দুর্গা। পুজো করার নির্দেশ পান তিনি। যদিও আর্থিক দুরবস্থার কারণে তিনি প্রথমে রাজি হননি। কিন্তু মায়ের ইচ্ছে ছিল, সাধ্যমতো তাঁর পুজো করতে হবে। তারপর পূর্ব বর্ধমানের ভেদিয়া ও গুসকরার কাছ থেকে মাটি নিয়ে এসে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজোর সূচনা করেন তিনি। প্রথমে মূর্তি ছাড়াই পটে এঁকে দুর্গাপুজো হতো। পরে ২০০৯ সাল নাগাদ পটশিল্পীর অভাবে নিমকাঠের মূর্তি তৈরি করে পুজো শুরু হয়। দশমীতে ঘট বিসর্জন হয়ে গেলেও নিম কাঠের তৈরি মূর্তিটি থেকে যায়। যা সারা বছর ধরে নিত্যপুজো করা হয়। পুজোর আগে অঙ্গরাগ করা হয়।
বাড়ির প্রবীণ সদস্য শ্যামাপ্রসাদ সেন বলেন, এই পুজো প্রায় ২০২বছরে বেশি পুরনো। যা হেতমপুর গ্রামের মুন্সিবাড়ির সেন পরিবারের পুজো নামে মানুষজনের কাছে পরিচিত। বংশ পরম্পরায় এখনও আমাদের পরিবারে বেশকিছু রীতি মানা হয়ে আসছে। আজও যা মেনে চলা হয়। সপ্তমীর দিন চালকুমড়ো বলি, অষ্টমীর দিন সাদা পাঁঠা বলি, এছাড়াও মা দুর্গাকে হলুদ মুড়ি, আটরকম কলাই ভাজা সহ অন্যান্য ভোগ নিবেদন করা হয়। এছাড়াও নবমীতে একটি পাঁঠা বলি ও দু’টি চালকুমড়ো বলির রীতি রয়েছে। দশমী তিথিতে নবপত্রিকা ও ঘট বিসর্জন করা হয়। নিম কাঠের তৈরি মূর্তিটি থেকে যায়। বিজয়ার সাতদিন পর অষ্টমঙ্গলার দিন একটু ব্যতিক্রমী ভাবেই আমাদের বাড়িতে কুমারী পুজোর চল রয়েছে। যা আজও নিষ্ঠা সহকারে হয়ে আসছে। এই পুজোকে কেন্দ্র করে বাড়ির মহিলা পুরুষ সহ আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারাও মেতে ওঠেন। • নিজস্ব চিত্র