নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শহর কৃষ্ণনগর। মৃৎশিল্প, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, গোপাল ভাঁড়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রামপ্রসাদ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সরপুরিয়া ও সরভাজার শহর কৃষ্ণনগর। এখানে উৎসব ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ইতিহাস। যা এই কৃষ্ণনগরকে বিশিষ্ট স্থান দিয়েছে। ঊমার আগমনের সঙ্গেই উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ে এই শহরে। সেই আমেজ বজায় থাকে জগদ্ধাত্রী পুজো পর্যন্ত। যা এই শহরের প্রধান উৎসব। জগদ্ধাত্রী পুজোর আমেজ দুর্গাপুজোকেও ছাপিয়ে যায়। এবার সেই উৎসবকেই ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার জন্য শহরের পুজো কমিটিগুলোকে নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে একাধিক মঞ্চ। থাকবে শৃঙ্খলা মঞ্চ, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি মঞ্চ, প্রচার-প্রসার মঞ্চ, উদ্যোক্তা-গবেষণা মঞ্চ, শোভাযাত্রা মঞ্চ। সেইসঙ্গে উৎসব ব্র্যান্ডিংয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তার জন্য একটি পরিচালনা কমিটিও বানানো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে এই নিয়ে সদর্থক বৈঠক হয়েছে পুজো কমিটিগুলোর।
কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার ডিএসপি শিল্পী পাল বলেন, আমরা পুজো কমিটিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছি। কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো বিখ্যাত। তাই উৎসবের ব্র্যান্ডিংয়ে আমাদের জগদ্ধাত্রী পুজোর উপর বিশেষ ফোকাস রয়েছে। এটা আগেই হওয়া উচিত ছিল। এই প্রক্রিয়া যাতে এইবছর দুর্গাপুজো থেকেই শুরু করা যায় সেইরকম ভাবনাচিন্তা রয়েছে।
নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহরে উৎসবের আমেজের ধাঁচ কলকাতা কেন্দ্রিক পুজোর থেকে বেশ খানিকটা আলাদা। এখানে দুর্গাপুজোর জাঁকজমক সেভাবে থাকে না। তবে দুর্গাপুজো দিয়েই শহরে মূল উৎসবের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যায়। ধীরে ধীরে কালীপুজো এবং বিশেষ করে জগদ্ধাত্রী পুজোয় বদলে যায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের শহরের ছবি। একটা শহরের মধ্যেই কয়েকশো জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর সঙ্গে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর একটা ঠান্ডা লড়াই বরাবরই চলে। সেটাকেই কাজে লাগিয়ে উৎসবকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ কৃষ্ণনগরের উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং মানুষের মিলনমেলা, শিল্পকলার এক বিরাট উৎসব এবং স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই পুজোকে স্থানীয় সীমা ছাড়িয়ে রাজ্য, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে প্রশাসন।
প্রথমেই থাকছে শৃঙ্খলা মঞ্চ। যার মূল উদ্দেশ্য পুজো চলাকালীন ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা। আলাদা ভলান্টিয়ার দল, ডিজিটাল ম্যাপ, হেল্প ডেস্ক এবং জরুরি চিকিৎসা বুথের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের পরিষেবা দেওয়া হবে। বিশেষ ভিড়ের দিনে টাইম স্লটের ব্যবস্থা এবং হোয়াটসঅ্যাপে ভিড়ের লাইভ আপডেট দেওয়া হবে। ঐতিহ্য-সংস্কৃতি মঞ্চ কৃষ্ণনগরের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি, মৃৎশিল্প, ডাকের সাজ এবং রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঐতিহ্যকে তুলে ধরবে। এখানে প্রতিদিন বাউল, কবিগান, যাত্রা, লোকনৃত্য সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। পাশাপাশি মাটির পুতুল এবং ডাকের সাজের প্রদর্শনী এবং রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও জগদ্ধাত্রী পুজোর ইতিহাসভিত্তিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।
উৎসবকে তুলে ধরার লক্ষ্যে থাকবে প্রচার-প্রসার মঞ্চ। উৎসবের অফিসিয়াল লোগো, স্লোগান এবং হ্যাশট্যাগ চালু হবে। প্রতিদিনের অনুষ্ঠান ইউটিউব ও ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিম করা হবে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের সহযোগিতায় বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজও চালু করা হবে। স্থানীয় অর্থনীতি ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে গড়ে উঠবে উদ্যোক্তা-গবেষণা মঞ্চ। এখানে হস্তশিল্প, কৃষ্ণনগরের খ্যাতনামা মিষ্টি, তাঁত শিল্প এবং স্থানীয় স্টার্ট আপ ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর প্রদর্শনী হবে। পাশাপাশি জগদ্ধাত্রী পুজোর ইতিহাস এবং অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও সেমিনারের আয়োজন করা হবে। সবশেষে থাকবে শোভাযাত্রা মঞ্চ, যা পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। প্রতিটি ক্লাবকে নির্দিষ্ট থিমে শোভাযাত্রা সাজাতে হবে এবং বিচারকমণ্ডলী সেরা শোভাযাত্রা নির্বাচন করবেন। ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা রুট ম্যাপ এবং শৃঙ্খলা গাইডলাইন থাকবে। মঞ্চ থেকে প্রতিটি শোভাযাত্রা লাইভ সম্প্রচার করা হবে।